সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই অবশেষে স্বস্তির খবর ভারতের জ্বালানি বাজারে। দীর্ঘ টানাপড়েনের পর এলপিজি বোঝাই ভারতীয় ট্যাঙ্কার ‘শিবালিক’ (Shivalik LPG tanke) গুজরাতের মুন্দ্রা বন্দরে পৌঁছেছে। সোমবার এই জাহাজটি নিরাপদে বন্দরে পৌঁছনোর খবর প্রকাশ্যে আসে। একই সঙ্গে জানা গিয়েছে, এলপিজি বোঝাই আর একটি ভারতীয় জাহাজ ‘নন্দাদেবী’ও হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে ভারতের দিকে এগিয়ে আসছে এবং মঙ্গলবারের মধ্যেই মুম্বই বন্দরে পৌঁছতে পারে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই জাহাজের আগমন ভারতের এলপিজি সরবরাহ নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে। কারণ পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের জেরে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে তেল এবং গ্যাস সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল ভারত-সহ একাধিক দেশের মধ্যে।
‘শিবালিক’ এবং ‘নন্দাদেবী’ এই দুই জাহাজই ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা Shipping Corporation of India-এর মালিকানাধীন। সূত্রের খবর, ‘শিবালিক’ জাহাজে প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি বোঝাই ছিল। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সোমবার সেটি গুজরাতের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর Mundra Port-এ পৌঁছেছে। অন্যদিকে ‘নন্দাদেবী’ জাহাজেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলপিজি রয়েছে এবং সেটি ভারতের পশ্চিম উপকূলের দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে। এই দুই জাহাজের যাত্রা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কারণ তারা কয়েক দিন আগেই অতিক্রম করেছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ Strait of Hormuz। আন্তর্জাতিক রাজনীতির টানাপড়েনের কারণে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল।
পরিস্থিতির সূত্রপাত ঘটে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন পশ্চিম এশিয়ায় সামরিক উত্তেজনা তীব্র হয়ে ওঠে যখন Israel এবং United States যৌথভাবে Iran-এর উপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। তার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় তেহরান কঠোর পদক্ষেপ নেয় এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়া ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য এই জলপথ ব্যবহার করা হয়। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব যথেষ্ট গুরুতর হতে পারত। কারণ দেশের দৈনিক গ্যাস ব্যবহারের একটি বড় অংশই আমদানির উপর নির্ভরশীল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারত প্রতিদিন প্রায় ১৯.১ কোটি আদর্শ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করে এবং তার প্রায় অর্ধেকই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। পশ্চিম এশিয়া সেই আমদানির একটি প্রধান উৎস।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পশ্চিম এশিয়া থেকে তেল ও এলপিজি সরবরাহ কার্যত ব্যাহত হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে নয়াদিল্লি। সূত্রের খবর, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ভারতের বিদেশমন্ত্রী Subrahmanyam Jaishankar একাধিকবার ইরানের বিদেশমন্ত্রী Abbas Araghchi-এর সঙ্গে আলোচনা করেন। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের এই ধারাবাহিকতা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও সরাসরি যোগাযোগ করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট Masoud Pezeshkian-এর সঙ্গে। গত মঙ্গলবার তাঁদের মধ্যে ফোনে আলোচনা হয় বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গিয়েছে। এই আলোচনার পরই পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করে। ভারতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত Mohammad Fathali-ও আশ্বাস দেন যে ভারতের বাণিজ্যিক জাহাজগুলির চলাচলে কোনও বাধা দেওয়া হবে না। তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘ভারত এবং ইরান বহুদিনের বন্ধু। সেই সম্পর্কের উপর আমাদের বিশ্বাস রয়েছে।’
এই আশ্বাসের পরই ধীরে ধীরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে সীমিত সংখ্যক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল শুরু করে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র তিনটি জাহাজ ওই পথ ব্যবহার করতে পেরেছে। তার মধ্যে প্রথমটি ছিল লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার। আর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় জাহাজ হল ভারতের ‘শিবালিক’ এবং ‘নন্দাদেবী’। ভারতের জ্বালানি বাজারের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই জাহাজের নিরাপদে পৌঁছনো দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এলপিজি শুধু গৃহস্থালির রান্নার জ্বালানি হিসেবেই নয়, শিল্পক্ষেত্রেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ফলে সরবরাহে দীর্ঘদিন ব্যাঘাত ঘটলে তার প্রভাব পড়তে পারত দেশের অর্থনীতিতেও। উল্লেখ্য, হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে এলপিজি বোঝাই ভারতীয় জাহাজগুলির আগমন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে। আগামী দিনে যদি একই ভাবে সরবরাহ বজায় থাকে, তবে সাম্প্রতিক উদ্বেগ অনেকটাই কাটবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Jaishankar Anita Anand Munich meeting India Canada relations | মিউনিখে কূটনৈতিক বার্তা: জয়শঙ্কর-অনিতা বৈঠকে ভারত-কানাডা সম্পর্কের নতুন গতি, কার্নের ভারত সফর ঘিরে জোর প্রস্তুতি




