সাশ্রয় নিউজ ★ নতুন দিল্লি : পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভারতের রান্নার গ্যাস বা এলপিজি সরবরাহ ও দামের উপর। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় মঙ্গলবার জরুরি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হরদীপ সিংহ পুরী (Hardeep Singh Puri) এবং বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর (S. Jaishankar)। মূলত দেশের এলপিজি সরবরাহ পরিস্থিতি, বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি এবং গৃহস্থালি ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কৌশল নিয়েই এই বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে উল্লেখ। বর্তমান সঙ্কটের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা। ইরান (Iran) এবং আমেরিকা (United States) ও ইজ়রায়েল (Israel) -এর মধ্যে চলা সংঘাতের জেরে ইরান গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালীতে (Strait of Hormuz) জাহাজ চলাচলের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এই প্রণালী দিয়েই বিশ্ব জুড়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহণ হয়। ভারতের ক্ষেত্রেও এই পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের আমদানিকৃত জ্বালানির বড় অংশ এই পথ দিয়ে আসে।
সরকারি সূত্রে খবর, ভারতের মোট পেট্রোপণ্যের প্রায় ৮৮ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তার মধ্যে প্রায় অর্ধেকই আসে হরমুজ় প্রণালী হয়ে। ইরাক (Iraq), সৌদি আরব (Saudi Arabia), সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (United Arab Emirates) এবং কুয়েত (Kuwait) -এর মতো দেশ থেকে আমদানিকৃত জ্বালানি এই পথেই ভারতে পৌঁছায়। শুধু তেল নয়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি (Liquefied Natural Gas বা LNG) আমদানির ক্ষেত্রেও এই প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের এলএনজি আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশ এই পথ দিয়েই আসে। বিশেষ করে কাতার (Qatar) এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে এই পথই প্রধান। এই পরিস্থিতিতে রান্নার গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহেও চাপ পড়েছে। ইতিমধ্যেই দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইতে (Mumbai) হোটেল ও রেস্তোরাঁ শিল্পে তার প্রভাব দেখা দিতে শুরু করেছে। হোটেল ও রেস্তোরাঁ মালিকদের সংগঠন আহার (Aahar) জানিয়েছে, গ্যাস সঙ্কটের কারণে মুম্বাইয়ের প্রায় ২০ শতাংশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শুধু মুম্বাই নয়, দেশের অন্য বড় শহরগুলিতেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাণিজ্যিক গ্যাসের উপর নির্ভরশীল হোটেল ও রেস্তরাঁ ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যেই সঙ্কটের কথা জানিয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় সরকার গৃহস্থালি গ্রাহকদের সুরক্ষা দিতে বিশেষ কৌশল গ্রহণ করছে। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন (Indian Oil Corporation বা IOC) জানিয়েছে, দেশের গৃহস্থালি ক্ষেত্রের রান্নার গ্যাস সরবরাহকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আইওসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ‘গৃহস্থালি গ্রাহকদের পাশাপাশি হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো জরুরি পরিষেবাগুলিকেও গ্যাস সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’ একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে কোনও কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রকে এলপিজি সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে তা পর্যালোচনা করার জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে। তেল বিপণন সংস্থাগুলির তিন জন এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরকে নিয়ে এই কমিটি তৈরি করা হয়েছে।
এই কমিটি হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের আবেদন খতিয়ে দেখবে। তাদের প্রয়োজন, যোগ্যতা এবং বাজারে গ্যাসের প্রাপ্যতার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। সরকারি সূত্রে আরও খবর, শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত এলএনজি আংশিকভাবে গৃহস্থালি ক্ষেত্রে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে। মূল লক্ষ্য হল সাধারণ মানুষের রান্নার গ্যাস সরবরাহ যেন কোনওভাবেই ব্যাহত না হয়। এই সঙ্কটের মোকাবিলায় দেশীয় তেল সংস্থাগুলি বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি আমদানির চেষ্টা শুরু করেছে। রাশিয়া (Russia), আমেরিকা (United States) ছাড়াও দক্ষিণ আমেরিকা (South America) এবং পশ্চিম আফ্রিকা (West Africa) -এর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে উল্লেখ। এর পাশাপাশি দেশের শোধনাগারগুলিকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদন কমিয়ে এলপিজি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য। সরকারের মতে, এই পদক্ষেপ সাময়িকভাবে হলেও গ্যাস সরবরাহের চাপ কিছুটা কমাতে সাহায্য করবে।
সরকার মজুতদারি ও কালোবাজারি রোধ করতেও কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। গৃহস্থালি গ্রাহকদের জন্য এলপিজি রিফিল বুকিংয়ের সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে একটি সিলিন্ডার বুকিংয়ের পর পুনরায় বুক করতে ২১ দিন অপেক্ষা করতে হত, এখন তা বাড়িয়ে ২৫ দিন করা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড (Hindustan Petroleum Corporation Limited বা HPCL) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হলেও উৎপাদন বাড়ানোর জন্য একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’ প্রসঙ্গত, ভারতে বছরে প্রায় ৩ কোটি ১৩ লক্ষ টন এলপিজি ব্যবহার হয়। এর মধ্যে প্রায় ৮৭ শতাংশ গৃহস্থালি খাতে ব্যবহৃত হয় এবং বাকি ১৩ শতাংশ ব্যবহার হয় বাণিজ্যিক ক্ষেত্র যেমন হোটেল, রেস্তরাঁ এবং বিভিন্ন শিল্পে। এই কারণেই সরকার আপাতত গৃহস্থালি ব্যবহারকারীদের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে এর ফলে বাজারদর নির্ভর বাণিজ্যিক গ্যাসের উপর নির্ভরশীল ব্যবসাগুলি সমস্যায় পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এদিকে ইন্ডিয়া হোটেলস অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (India Hotels and Restaurant Association) এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনের মতে, দীর্ঘদিন গ্যাস সঙ্কট চললে হোটেল ও রেস্তোরাঁ শিল্প বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে ভারতের মতো আমদানিনির্ভর দেশের উপর চাপ আরও বাড়তে পারে। তবে সরকারের বিকল্প উৎসের সন্ধান এবং উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছুটা সহায়ক হতে পারে।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Study in India 2026, Dharmendra Pradhan | স্টাডি ইন ইন্ডিয়া কনক্লেভ ২০২৬: নতুন দিল্লিতে ৫০ দেশের কূটনীতিকদের সামনে বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষায় বড় আহ্বান ভারতের




