সাশ্রয় নিউজ ★ মিউনিখ : জার্মানির মিউনিখে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা সম্মেলনের ফাঁকে গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্ববৈঠকে বসলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর (S. Jaishankar) এবং কানাডার বিদেশমন্ত্রী অনিতা আনন্দ (Anita Anand)। কূটনৈতিক মহলের মতে, সাম্প্রতিক অতীতের টানাপোড়েন পেরিয়ে ভারত-কানাডা সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেওয়ার লক্ষ্যে এই বৈঠক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কানাডার বিদেশ দফতর জানিয়েছে, আগামী মাসে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নে (Mark Carney) -এর সম্ভাব্য ভারত সফরের খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করতেই এই আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কানাডার তরফে প্রকাশিত বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ‘দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও গভীর করা এবং নতুন অংশীদারির সুযোগ খুঁজে বের করতেই দুই বিদেশমন্ত্রী মতবিনিময় করেছেন।’ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সহযোগিতা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, বহু ক্ষেত্রেই যৌথ উদ্যোগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে খবর।
বৈঠকের পর সমাজমাধ্যমে জয়শঙ্কর লেখেন, ‘কানাডার বিদেশমন্ত্রী অনিতা আনন্দের সঙ্গে দেখা করে আনন্দিত। আমাদের আলোচনা ভারত-কানাডা সম্পর্কের ধারাবাহিক অগ্রগতির প্রতিফলন।’ অন্য দিকে অনিতা জানান, ‘শক্তি, প্রযুক্তি ও বাণিজ্য-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে গঠনমূলক সহযোগিতা বাড়াতে কানাডা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই প্রচেষ্টা এগিয়ে নিয়ে যেতে আমি আগ্রহী।’ উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে এটি ভারত-কানাডা মন্ত্রীস্তরের পঞ্চম বৈঠক। অর্থাৎ দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগে যে ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘দু’দেশই এখন বাস্তববাদী অবস্থান নিচ্ছে। মতপার্থক্য থাকলেও বাণিজ্য ও কৌশলগত স্বার্থে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা জরুরি।’ গত বছর মে মাসে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নে অনিতা আনন্দকে কানাডার বিদেশমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। তার আগে তিনি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও শিল্প দফতরের দায়িত্ব সামলেছেন। কার্নের পূর্বসূরি জাস্টিন ট্রুডো (Justin Trudeau) -এর আমলে খলিস্তানি ইস্যু ঘিরে নয়াদিল্লি ও অটোয়ার সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় বংশোদ্ভূত অনিতার বিদেশমন্ত্রিত্বকে অনেক কূটনীতিকই ‘ইতিবাচক বার্তা’ হিসেবে দেখেছিলেন।
অনিতা আনন্দের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক যাত্রাপথও আলোচনায় রয়েছে। ১৯৬৭ সালের ২০ মে নোভা স্কোশিয়ার কেন্টভিলে জন্ম তাঁর। বাবা-মা সরোজ ডি রাম ও এস ভি আনন্দ ষাটের দশকের গোড়ায় ভারত থেকে কানাডায় পাড়ি দেন। তামিল পরিবারে জন্ম হলেও তাঁর মায়ের পৈতৃক সূত্র পঞ্জাবের সঙ্গে যুক্ত। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Oxford) প্রাক্তনী অনিতা ২০১৯ সালে প্রথমবার হাউস অব কমন্সে নির্বাচিত হন ওকভিল কেন্দ্র থেকে। অতিমারির সময়ে টিকা ও সুরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ পরিচিতি দেয়। তিনি কানাডার প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এবং ট্রেজ়ারি বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। লিবারেল পার্টির অন্দরে নেতৃত্বের পালাবদলের সময় অনিতার নাম সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীর দাবিদার হিসেবে উঠে এসেছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত দল বেছে নেয় মার্ক কার্নেকে। তবু পররাষ্ট্র দফতরের দায়িত্ব পেয়ে তিনি যে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠেছেন, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। মিউনিখ সম্মেলনের প্রেক্ষাপটে এই বৈঠক আরও তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, ইউক্রেন যুদ্ধ, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এবং জ্বালানি সরবরাহ, বিশ্ব রাজনীতির একাধিক অস্থির ইস্যুর মাঝে ভারত ও কানাডা নিজেদের কৌশলগত অবস্থান সুদৃঢ় করতে চাইছে। বিশেষ করে জ্বালানি রূপান্তর, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ ও প্রযুক্তি সহযোগিতার ক্ষেত্রে দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতার সম্ভাবনা রয়েছে। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ‘কার্নের সম্ভাব্য ভারত সফর যদি সফল হয়, তা হলে গত কয়েক বছরের অচলাবস্থা কাটিয়ে সম্পর্ক নতুন দিশা পেতে পারে।’ বাণিজ্য চুক্তি, ছাত্র ভিসা নীতি, প্রবাসী ভারতীয়দের সুরক্ষা এবং সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সহযোগিতা, এই বিষয়গুলি সফরের আলোচ্যসূচিতে থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
ভারতীয় কূটনৈতিক মহলও এই বৈঠককে ইতিবাচক বলেই মনে করছে। নয়াদিল্লির এক প্রাক্তন কূটনীতিকের কথায়, ‘দু’দেশের সম্পর্কের ভিত্তি বহুমাত্রিক শিক্ষা, প্রবাসী সম্প্রদায়, বাণিজ্য, প্রযুক্তি। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও যোগাযোগের পথ খোলা রাখা কৌশলগত ভাবে জরুরি।’ উল্লেখ্য, মিউনিখে জয়শঙ্কর-অনিতা বৈঠক শুধু একটি আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ নয়; বরং ভারত-কানাডা সম্পর্কের পুনর্গঠনের ইঙ্গিতবাহী। আগামী মাসে কার্নের ভারত সফর চূড়ান্ত হলে দুই দেশের কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন অধ্যায় সূচিত হতে পারে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল প্রেক্ষাপটে এই সংলাপ যে ভবিষ্যতের সহযোগিতার ভিত্তি মজবুত করবে, এমনটাই আশা কূটনৈতিক মহলের একাংশের।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Jaishankar Zero Tolerance on Terrorism | ‘সন্ত্রাসবাদে মদত নয়, জ়িরো টলারেন্স চাই’, পাকিস্তানের নাম না করে পোল্যান্ডকে কড়া বার্তা এস জয়শঙ্করের


