সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ পশ্চিম বর্ধমান : ভালবাসার দিনে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখেছিলেন দু’জন। এক জন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী, অন্য জন চাকরিপ্রার্থী যুবক। দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা শেষ, পরের দিন ছুটি- সেই সুযোগেই রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে বৈধ বিয়ে সেরে নেওয়ার পরিকল্পনা। কিন্তু ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’-র দুপুরে বর্ধমান (Bardhaman) -এর রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে ঘটে গেল নাটকীয় মোড়। পুলিশ আটক করল যুগলকে। তবে কারণ বিয়ে নয়, তাঁদের স্কুটারের বুট থেকে উদ্ধার হল একটি ছ’ঘড়ার রিভলভার! পুলিশ সূত্রে খবর, ঘটনাটি ঘটেছে বর্ধমান শহরের গোলাপবাগ মোড় সংলগ্ন এলাকায়। তরুণী শহরেরই এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রী এবং এ বছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছেন। দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পর শনিবার কোনও পরীক্ষা ছিল না। সেই ফাঁকেই প্রেমিকের সঙ্গে বিবাহ নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। প্রেমিকের বাড়ি বাঁকুড়া (Bankura) জেলায়। দু’জনের মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল বলে পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, তাঁদের রেজিস্ট্রি অফিসে যাওয়ার জন্য আটক করা হয়নি। আগে থেকেই পুলিশের কাছে গোপন সূত্রে খবর ছিল যে, একটি নির্দিষ্ট নম্বরের স্কুটারের বুটে আগ্নেয়াস্ত্র রাখা রয়েছে এবং সেটি বর্ধমান শহরে ঘুরছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই নজরদারি চালাচ্ছিল পুলিশ। শনিবার দুপুরে সন্দেহভাজন স্কুটারটি গোলাপবাগের দিকে যেতে দেখা যায়। কিছু ক্ষণের মধ্যেই সেটি রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে দাঁড়ায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, যুগল স্কুটার রেখে অফিসে ঢোকেন। কাগজপত্রের কাজ সেরে বাইরে বেরিয়ে স্কুটারের দিকে এগোতেই পুলিশ তাঁদের ঘিরে ফেলে। পুলিশি নির্দেশে স্কুটারের বুট খুলতে বলা হয়। তরুণী নিজেই বুট খুললে ভিতরে একটি ছ’ঘড়ার রিভলভার দেখতে পান পুলিশকর্মীরা। সঙ্গে সঙ্গেই দু’জনকে আটক করা হয়। পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃত যুগল পুলিশের কাছে দাবি করেছেন, আগ্নেয়াস্ত্র সম্পর্কে তাঁদের কোনও ধারণাই নেই। তাঁদের বক্তব্য, ‘আমরা শুধু বিয়ের রেজিস্ট্রি করতে এসেছিলাম। স্কুটারের বুটে কী ভাবে রিভলভার এল, জানি না।’ পুলিশ অবশ্য ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। উদ্ধার হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত কি না, সেটি কার, এবং কী ভাবে স্কুটারের ভিতরে এল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
খবর পেয়ে থানায় পৌঁছন তরুণীর দিদিমা। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার নাতনি রোজ স্কুটার চালায়। নাচের স্কুল, টিউশন, পরীক্ষার সেন্টার সব জায়গায় যায়। বাড়ির লোকও স্কুটারটি ব্যবহার করে। কোনও দিন এমন কিছু ঘটেনি। আজ হঠাৎ পুলিশ কী করে জানল বুটে রিভলভার আছে? আমার সন্দেহ, কেউ ওকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।’ নাতনির রেজিস্ট্রি অফিসে যাওয়ার বিষয়েও তিনি নাকি আগে কিছু জানতেন না। উল্লেখ্য, এই ঘটনার পর শহরে নানা জল্পনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, গোপন সূত্রে পাওয়া তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল? পুলিশ কি আগে থেকেই নির্দিষ্ট সূত্র ধরে নজর রাখছিল? নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে অন্য কোনও চক্রান্ত? তদন্তকারী আধিকারিকরা জানিয়েছেন, ‘অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। আমরা সমস্ত দিক খতিয়ে দেখছি। স্কুটারটি কার নামে নথিভুক্ত, কে কে ব্যবহার করতেন, সাম্প্রতিক কালে কোথায় কোথায় গিয়েছে, সব কিছু খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈধ লাইসেন্স ছাড়া আগ্নেয়াস্ত্র রাখা ভারতীয় অস্ত্র আইনে গুরুতর অপরাধ। তবে অভিযুক্তদের বক্তব্য ও পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তদন্তের ফলাফলের উপরই নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপ। যদি প্রমাণ হয় যে অস্ত্রটি তাঁদের অজান্তে রাখা হয়েছিল, তবে ষড়যন্ত্রের ধারাও যুক্ত হতে পারে। এ দিকে ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’-তে বিয়ে করতে গিয়ে এমন ঘটনায় সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘এক জন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী কেন পরীক্ষার মাঝেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন?’ আবার অন্য অংশের বক্তব্য, ‘প্রাপ্তবয়স্ক হলে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে।’ তবে মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারই।
পুলিশ সূত্রে আরও খবর, উদ্ধার হওয়া রিভলভারটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হতে পারে। অস্ত্রটির সঙ্গে কোনও অপরাধমূলক ঘটনার যোগ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি, গোপন সূত্রে যে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল, তার উৎস নিয়েও অনুসন্ধান চলছে। ঘটনাটি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অবৈধ অস্ত্র চক্রের সক্রিয়তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষত, একটি ছাত্রীর ব্যবহৃত স্কুটারে কী ভাবে আগ্নেয়াস্ত্র এল, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। তদন্তের অগ্রগতি ও পুলিশের আনুষ্ঠানিক বিবৃতির দিকে তাকিয়ে রয়েছে পরিবার ও শহরবাসী। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ভালবাসার দিনকে স্মরণীয় করে রাখার স্বপ্ন যে এমন নাটকীয় মোড় নেবে, তা ভাবেননি কেউই। এখন দেখার, বর্ধমানের এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার তদন্ত কোন দিকে মোড় নেয় এবং আটক যুগলের ভবিষ্যৎ কী হয়।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Purba Bardhaman murder, extramarital affair murder | বন্ধুর স্ত্রীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক, পরিকল্পিত খুন! বর্ধমানের সেচখাল থেকে উদ্ধার রক্তাক্ত দেহ, গ্রেফতার প্রেমিক-প্রেমিকা




