সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : রাজ্যে কর্মসংস্থানের সঙ্কটের আবহে নতুন করে আলোচনায় ‘যুব সাথী’ (Yuva Sathi) প্রকল্প। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে তরুণ প্রজন্মের কর্মহীন অংশকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে রাজ্য সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা কার্যকর হতেই জেলায় জেলায় ভিড়ের চিত্র স্পষ্ট। মাধ্যমিক পাশ করা দিনমজুর থেকে পিএইচডি-ধারী গবেষক, সন্তান কোলে মা থেকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত যুবক সবাই দাঁড়িয়েছেন একই লাইনে। বক্তব্য একটাই ‘চাকরি না মিললে অন্তত ভাতা তো মিলুক।’
রাজ্য প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, আগামী ১ এপ্রিল থেকে যোগ্য প্রাপকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে মাসিক ১৫০০ টাকা করে ভাতা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বিধানসভা কেন্দ্রভিত্তিক শিবির শুরু হয়েছে। প্রথম দিনেই ‘অভূতপূর্ব সাড়া’ মিলেছে বলে দাবি প্রশাসনের। হুগলির চুঁচুড়ায় (Chinsurah) রবীন্দ্র ভবনে আয়োজিত শিবিরে সকাল থেকেই দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে। উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় বিধায়ক অসিত মজুমদার (Asit Mazumdar)। তাঁর কথায়, ‘চুঁচুড়া বিধানসভা এলাকায় চারটি শিবির হয়েছে। ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সিদের বিপুল সাড়া মিলেছে।’ লাইনে দাঁড়ানো বহু আবেদনকারীর মুখে একই সুর, ‘বেকার বলে বাড়িতে কথা শুনতে হয়। যদি কিছু টাকা হাতে আসে, অন্তত নিজের খরচটা চালানো যাবে।’ কেউ আবার স্পষ্ট করে বলছেন, ‘চাকরির ফর্ম কিনব। পরীক্ষার ফি এত বেশি, ভাতার টাকা দিয়ে সেটাই আগে মেটাব।’ কলেজ পড়ুয়াদের একাংশ জানিয়েছেন, ভাতার অর্থ যাতায়াত ও প্রস্তুতির খরচে কাজে লাগবে।
চুঁচুড়ার শিবিরে দেখা গেল তুহিনকুমার নাথকে (Tuhin Kumar Nath)। তিনি বিশ্বভারতী (Visva-Bharati University) থেকে পিএইচডি করছেন। ভাতা নিয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া, ‘সরকার যদি সাহায্য করে, সেটা তো ভালই। চাকরির চেষ্টা যাঁরা করছেন, তাঁরা ভাতা পেলেও করবেন, না পেলেও করবেন। কিন্তু চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত সামান্য আর্থিক সহায়তা অনেকেরই দরকার হয়।’ তাঁর পাশেই দাঁড়ানো আর এক যুবক বলেন, ‘প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। ফর্মের দামই হাজার হাজার টাকা। এই ভাতা পেলে অন্তত আবেদন করতে পারব।’ এই ভিড় শুধু হুগলিতে সীমাবদ্ধ নয়। কোচবিহার (Cooch Behar) -এর ন’টি বিধানসভা কেন্দ্রে মোট ৩৪টি সহায়তাকেন্দ্র খোলা হয়েছে। উৎসব অডিটোরিয়াম, ঠাকুর পঞ্চানন ভবন ও রবীন্দ্র ভবনে সকাল থেকে লম্বা লাইন দেখা যায়। জেলা প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, সাধারণ মানুষের সুবিধার কথা মাথায় রেখে শিবিরের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। পঞ্চানন ভবনের শিবিরের উদ্বোধন করেন জেলাশাসক রাজু মিশ্র (Raju Mishra)। আবেদনকারীদের একজন বলেন, ‘চাকরি যখন নেই, ভাতা-ই ভরসা। সময়টা কঠিন, যা পাওয়া যায় তাই গ্রহণ করছি।’
কিন্তু সব জায়গায় পরিস্থিতি মসৃণ ছিল না। মালদহের চাঁচল-১ ব্লকের পাঞ্চালী মাঠে আয়োজিত শিবিরে বিশৃঙ্খলার অভিযোগ ওঠে। দীর্ঘ লাইনে ধাক্কাধাক্কি শুরু হলে পুলিশ হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি সামাল দেয়। অভিযোগ, পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা লাইনের ব্যবস্থা ছিল না। স্থানীয় বিধায়ক নিহাররঞ্জন ঘোষ (Nihar Ranjan Ghosh) স্বীকার করেন, ‘পরিকল্পনায় কিছু ঘাটতি ছিল।’ মালদহের জেলাশাসক প্রীতি গোয়েল (Priti Goel) জানান, ‘পুলিশ বিষয়টি দেখছে। পরবর্তী শিবিরগুলিতে যেন আর বিশৃঙ্খলা না হয়, সে দিকে নজর রাখা হচ্ছে।’ উল্লেখ্য যে, এই প্রকল্পে ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সি মাধ্যমিক উত্তীর্ণ কর্মহীন যুবক-যুবতীরা আবেদন করতে পারবেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) ঘোষণা করেছেন, ‘পাঁচ বছর পর্যন্ত এই সুবিধা দেওয়া হবে। পরে পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ আবেদনপত্রের সঙ্গে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের নথি বা বাতিল চেক এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণপত্র জমা দিতে হচ্ছে। আবেদনকারীকে অঙ্গীকারপত্রে জানাতে হচ্ছে যে তিনি বর্তমানে বেকার এবং অন্য কোনও সরকারি ভাতার আওতায় নেই। তথ্য অসত্য প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার শর্তও রয়েছে।
রাজনৈতিক মহলে এই প্রকল্প নিয়ে বিতর্কও কম নয়। বিরোধীদের অভিযোগ, ‘সরকারি চাকরি নেই, ডিএ বকেয়া। তার বদলে সামান্য ভাতা দিয়ে ভোটের আগে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।’ যদিও শাসকদলের দাবি, ‘এটি সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্প। কর্মসংস্থানের প্রচেষ্টা চলছেই, পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।’ সমাজবিদদের একাংশের মতে, ‘এই ভিড় রাজ্যের কর্মসংস্থানের বাস্তব চিত্র তুলে ধরছে। উচ্চশিক্ষিত গবেষক থেকে দিনমজুর, সবাই একই লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। এটা শুধু ভাতার লাইন নয়, এটা কর্মসংস্থানের সংকটের প্রতিচ্ছবি।’ অর্থনীতিবিদদেরও প্রশ্ন, দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান না বাড়লে শুধু ভাতা কতটা কার্যকর হবে? তবে আবেদনকারীদের কাছে আপাতত তাত্ত্বিক বিতর্কের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। তিন মাসের সন্তান কোলে দাঁড়ানো তুহিনা খাতুন (Tuhina Khatun) বলেন, ‘গ্র্যাজুয়েশন করেছি। চাকরি পাইনি। এখন যদি কিছু টাকা পাই, অন্তত সন্তানের জন্য খরচ করতে পারব।’ উল্লেখ্য যে, ‘যুব সাথী’ প্রকল্প তাই এখন শুধু একটি সরকারি স্কিম নয়; এটি হয়ে উঠেছে বেকারত্ব, প্রত্যাশা, হতাশা ও আশার সম্মিলিত প্রতীক। আগামী দিনে এই প্রকল্প কতটা স্বচ্ছ ভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং প্রকৃত কর্মসংস্থানের সুযোগ কতটা বাড়ে, তার দিকেই তাকিয়ে রাজ্যের তরুণ প্রজন্ম।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee DA controversy, Suvendu Adhikari on DA | ডিএ ইস্যুতে মমতাকে নিশানা শুভেন্দুর; ক্ষমা চাইতে বললেন ভূপেন্দ্র যাদব


