সাশ্রয় নিউজ ★ কলকাতা: রাজ্য সরকারি কর্মীদের বকেয়া ডিএ (Dearness Allowance বা DA) ইস্যুতে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে তাপমাত্রা বাড়াল বিরোধী দল ও কেন্দ্র। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) ডিএ মামলাকে ‘বিচারাধীন’ বললেও, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) দাবি করেছেন, ‘এটা আর সাবজুডিস নয়, সুপ্রিম কোর্টে ক্লোজড চ্যাপ্টার।’ একই সুরে রাজ্য সরকারকে তোপ দাগলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব (Bhupender Yadav)। তাঁর বক্তব্য, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী, যিনি নিজের সরকারি কর্মীদের বিরুদ্ধেই সুপ্রিম কোর্টে যান।’ সল্টলেকে সাংবাদিক বৈঠকে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন ডিএ মামলা এখনও বিচারাধীন। আমি বলতে চাই, সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যেই মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে। কীভাবে এরিয়ার-সহ ২৫ শতাংশ ডিএ মেটাতে হবে, তার রূপরেখাও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।’ তাঁর আরও মন্তব্য, ‘মার্চের মধ্যে টাকা না দিলে আইনি পদক্ষেপের সুযোগ রয়েছে।’ বিরোধী দলনেতার অভিযোগ, ‘বারবার বিচার ব্যবস্থাকে অসম্মান করা হচ্ছে।’
প্রসঙ্গত, গত ৫ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সঞ্জয় করোল (Justice Sanjay Karol) ও বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র (Justice Prashant Kumar Mishra)-এর বেঞ্চ রাজ্য সরকারি কর্মীদের বকেয়া ডিএ মেটানোর নির্দেশ দেয়। আদালত জানায়, ২০০৮ সাল থেকে যে এরিয়ার বকেয়া রয়েছে, তা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। পাশাপাশি, অল ইন্ডিয়া কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স (AICPI) অনুযায়ী ডিএ নির্ধারণের কথাও উল্লেখ করা হয়। রাজ্যের যুক্তি ছিল, পঞ্চম বেতন কমিশনের ‘রিভিশন অফ পে অ্যান্ড অ্যালাউয়েন্স রুল’-এর ভিত্তিতে ডিএ নির্ধারণ করা উচিত। তবে সর্বোচ্চ আদালত কেন্দ্রীয় সূচক মানার পক্ষে মত দেয়। এদিকে, মুখ্যমন্ত্রী নবান্নে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘ম্যাটার ইজ সাবজুডিস, আমি এই বিষয়ে মন্তব্য করব না।’ এই মন্তব্যকেই হাতিয়ার করে বিরোধীরা সরব হয়েছে। শুভেন্দুর কথায়, ‘সাবজুডিস বলে আর দায় এড়ানো যাবে না। সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কার নির্দেশ দিয়েছে।’
বুধবার বিজেপির সদর দফতরে সাংবাদিক বৈঠক করেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব। তিনি বলেন, ‘রাজ্যের সরকারি কর্মীদের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। ডিএ-র ন্যায্য দাবি নিয়ে যারা আন্দোলন করেছেন, তাঁদের সঙ্গে সরকারের আচরণ দুঃখজনক।’ তাঁর আরও মন্তব্য, ‘এসআইআর-এর জন্য সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার সময় ছিল, কিন্তু ডিএ-র জন্য কেন নয়?’ ভূপেন্দ্র যাদবের দাবি, ডিএ-বঞ্চনার হতাশাই বহু কর্মীর মানসিক চাপ বাড়িয়েছে। উল্লেখ্য, ডিএ ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে সংগ্রামী যৌথ মঞ্চ। সংগঠনের আহ্বায়ক ভাস্কর ঘোষ (Bhaskar Ghosh) বলেন, ‘সাবজুডিস আর জুডিশিয়ারির পার্থক্য বোঝা উচিত। আর্থিক সংকটের কথা বলা হচ্ছে, অথচ একের পর এক প্রকল্প ঘোষণা হচ্ছে।’ নবান্নে স্মারকলিপি জমা দিতে গেলে অনুমতি না মেলায় তাঁরা ট্রাফিক গার্ডের কাছেই স্মারকলিপি জমা দেন।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২৫ শতাংশ ডিএ এবং ২০০৮ সাল থেকে বকেয়া এরিয়ার মেটাতে রাজ্যের উপর বড় আর্থিক চাপ পড়বে। তবে কর্মীদের যুক্তি, ‘ডিএ কোনও দয়া নয়, এটি সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার।’ সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণেও মৌলিক অধিকারের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে বলে দাবি বিরোধীদের। রাজ্য সরকারের অবস্থান, কেন্দ্র ও রাজ্যের আর্থিক কাঠামোয় পার্থক্য রয়েছে। সেই কারণেই ডিএ-এর হার নির্ধারণে পার্থক্য স্বাভাবিক। কিন্তু আদালতের নির্দেশের পর রাজনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে। মার্চের মধ্যে অর্থপ্রদানের সময়সীমা ঘিরে জল্পনা তুঙ্গে। প্রশাসনিক মহলে প্রশ্ন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কি রাজ্য সরকার অর্থ জোগাড় করতে পারবে?
ডিএ মামলা এখন শুধু প্রশাসনিক ইস্যু নয়, রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে। বিরোধীরা এটিকে কর্মীবান্ধব অবস্থানের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, আর শাসকদল বিষয়টিকে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে। তবে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ কার্যকর হলে রাজ্যের কয়েক লক্ষ সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগী সরাসরি উপকৃত হবেন। তবে ডিএ নিয়ে এই টানাপোড়েন যে আগামী দিনে আরও রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করবে, তা বলাই যায়। কর্মীদের প্রত্যাশা, দ্রুত নিষ্পত্তি ও প্রাপ্য অর্থপ্রদান। এখন নজর মার্চের দিকে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal SIR Controversy, Suvendu Mamata Clash | মমতার সুপ্রিম কোর্ট যাত্রা নিয়ে বিস্ফোরক শুভেন্দু, মাইক্রো অবজারভার থেকে অডিয়ো ফাঁসের দাবি




