সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : সন্ত্রাসবাদের প্রশ্নে কোনও আপস নয়, স্পষ্ট ও কড়া বার্তা দিল ভারত। পাকিস্তানের নাম সরাসরি উচ্চারণ না করেও সীমান্ত-সন্ত্রাসের ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মহলকে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানালেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর (S Jaishankar)। সোমবার দিল্লিতে পোল্যান্ডের বিদেশমন্ত্রী র্যাডোস্ল সিকোরস্কি-এর (Radosław Sikorski) সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের আগে একটি যৌথ উপস্থিতিতে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে নিজের অবস্থান তিনি পরিষ্কার করেন। পাশাপাশি আলোচনায় উঠে আসে আন্তর্জাতিক রাজনীতির আর একটি সংবেদনশীল বিষয়, শুল্ক ও রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত।
দিল্লিতে আয়োজিত বৈঠকের শুরুতেই জয়শঙ্কর বলেন, সন্ত্রাসবাদ কোনও একটি দেশের সমস্যা নয়, এটি আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘস্থায়ী হুমকি। তাঁর কথায়, ‘আমি মনে করি, সন্ত্রাসবাদের প্রশ্নে পোল্যান্ডেরও উচিত ‘জ়িরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা। আমাদের প্রতিবেশী অঞ্চলে এমন কিছু শক্তি রয়েছে, যারা সন্ত্রাসী পরিকাঠামোকে সক্রিয় ভাবে মদত দেয়। তা কোনও ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ যদিও এই বক্তব্যে তিনি সরাসরি পাকিস্তানের নাম নেননি, তবু কূটনৈতিক মহলের মতে, তাঁর ইঙ্গিত যে কোন দেশের দিকে, তা স্পষ্ট। দেশের বিদেশমন্ত্রী আরও জানান, দক্ষিণ এশিয়ায় সীমান্ত-সন্ত্রাস দীর্ঘদিনের সমস্যা। তিনি বলেন, সিকোরস্কি এই অঞ্চলের বাস্তবতা সম্পর্কে অবগত বলেই তাঁর বিশ্বাস। জয়শঙ্করের মতে, ‘সন্ত্রাসবাদকে কখনওই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। যে দেশ বা শক্তি এ ধরনের কাজকে প্রশ্রয় দেয়, তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক স্তরে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান জরুরি।’ উল্লেখ্য যে, এই বক্তব্যে সহমত প্রকাশ করেন পোল্যান্ডের বিদেশমন্ত্রী র্যাডোস্ল সিকোরস্কি। তিনি জানান, ইউরোপও সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়। সিকোরস্কির কথায়, পোল্যান্ড নিজেও সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ডের শিকার হয়েছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘২০২৫ সালে ইউক্রেনের সঙ্গে পোল্যান্ডকে সংযুক্ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু উড়িয়ে দেওয়া হয়। এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে, সন্ত্রাসবাদ শুধু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্যা নয়।’ সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা বাড়ানোর উপর জোর দেন তিনি।
দুই বিদেশমন্ত্রীর বৈঠকে শুধু নিরাপত্তা নয়, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও কূটনীতির নানা দিকও উঠে আসে। বিশেষভাবে আলোচিত হয় শুল্ক প্রসঙ্গ। জয়শঙ্কর বলেন, ‘ইউক্রেন সংঘাত নিয়ে ভারত বার বার তার অবস্থান জানিয়েছে। আমরা শান্তির পক্ষে এবং যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছি। কিন্তু সেই কারণ দেখিয়ে ভারতকে লক্ষ্যবস্তু করা অন্যায্য এবং অযৌক্তিক।’ তিনি আরও বলেন, ভারতের বিরুদ্ধে যে ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই প্রসঙ্গে সিকোরস্কিও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য, ভারতের উপর যে ‘আক্রমণ’ চলছে, তা শুধু শুল্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তার প্রভাব আরও বিস্তৃত। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি আমেরিকার সাম্প্রতিক অবস্থানের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।
উল্লেখ্য, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সংঘাত এখনও অব্যাহত। এই সংঘাত বন্ধে আমেরিকা একাধিক বার উদ্যোগ নিলেও এখনও কোনও স্থায়ী সমাধান সূত্র মেলেনি। ইউক্রেনের উপর রাশিয়ার হামলার পর পশ্চিমী বিশ্বের বহু দেশ মস্কোর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছে। কিন্তু ভারত বরাবরই এই সংঘাতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে। নয়াদিল্লি যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে, আবার একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের কৌশলগত সহযোগী রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও বজায় রেখেছে। ২০২২ সাল থেকে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে ভারত। এই সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)। আমেরিকা ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করে। সেই সিদ্ধান্তের জেরেই আমেরিকা-ভারত সম্পর্কের মধ্যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। এই প্রেক্ষাপটে পোল্যান্ডের বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে শুল্ক প্রসঙ্গ উঠে আসা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কূটনৈতিক সূত্রের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য দেশ পোল্যান্ডের সঙ্গে ভারতের এই আলোচনা ভবিষ্যতে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের পথ খুলে দিতে পারে। কিন্তু, সন্ত্রাসবাদ থেকে শুরু করে শুল্ক ও যুদ্ধ, তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ভারতের অবস্থান ফের একবার স্পষ্ট করলেন এস জয়শঙ্কর। কূটনৈতিক ভাষায় হলেও তাঁর বার্তায় পরিষ্কার, সন্ত্রাসে মদত নয়, অন্যায্য চাপ নয়, এবং শান্তির প্রশ্নে দ্বিচারিতা নয়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : S. Jaishankar | ভারত পশ্চিমা দেশগুলোর নৈতিক শিক্ষা প্রত্যাখ্যান করছে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর




