সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে কলকাতার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভোটের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আশ্বাস দিলেন শহরের নবনিযুক্ত পুলিশ কমিশনার অজয়কুমার নন্দ (Ajay Kumar Nand)। দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিলেন, ‘প্রত্যেক বারের মতোই কলকাতায় অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে।’ একই সঙ্গে পুলিশ বাহিনীকেও কঠোর বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি ব্যর্থ হতে পারি না।’ উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে সোমবার সকালে কলকাতা পুলিশের নগরপাল পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় সুপ্রতিম সরকারকে (Supratim Sarkar)। তাঁর পরিবর্তে নতুন পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পান অজয়কুমার নন্দ। সোমবার দুপুরেই তিনি কলকাতা পুলিশের সদর দপ্তর লালবাজারে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা শুরু করেন এবং নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর লালবাজার থেকে সরাসরি ধর্মতলার ডোরিনা ক্রসিং এলাকায় যান নতুন নগরপাল। ওই দিন সেখানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) -এর একটি রাজনৈতিক কর্মসূচী ছিল। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে মিছিলের পর ধর্মতলায় একটি জনসভা করেন তিনি। সেই কর্মসূচীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পুলিশি প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান অজয়কুমার নন্দ। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পরই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষিতে তাঁর প্রথম বার্তা দেন। নতুন পুলিশ কমিশনারের কথায়, ‘প্রত্যেক বারের মতোই কলকাতায় অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে। কলকাতা পুলিশ সেই লক্ষ্যেই প্রস্তুত।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগেও বহু নির্বাচন হয়েছে। আমাদের নিজস্ব ফোর্স রয়েছে, পাশাপাশি আরও বাহিনী শহরে মোতায়েন করা হবে। ফলে ভোটের সময় যাতে কোনও অশান্তি না ঘটে, সে বিষয়ে আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।’ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচনের আগে কলকাতায় সাম্প্রতিক কিছু উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে গত শনিবার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) -এর সভাকে ঘিরে শহরের কিছু এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। সেই সময় গিরিশ পার্ক এলাকায় রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজা (Shashi Panja) -এর বাড়িতে হামলার অভিযোগ ওঠে বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে। পাল্টা বিজেপির পক্ষ থেকেও মারধরের অভিযোগ তোলা হয়।
এই ঘটনার পর থেকেই কলকাতার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে রাজনৈতিক মহলে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে নতুন পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘গিরিশ পার্কে যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত খারাপ ঘটনা। পুলিশ বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং আমি ব্যক্তিগতভাবে পুরো ঘটনার খোঁজখবর রাখছি।’ তিনি আরও জানান, নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা পুলিশের কাছে সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর কথায়, ‘প্রত্যেক নির্বাচনই চ্যালেঞ্জিং। সাধারণ মানুষ যেমন পুলিশের কাছে নিরাপত্তা আশা করেন, তেমনই রাজনৈতিক দলগুলিও চায় পুলিশ নিরপেক্ষভাবে কাজ করুক। কিছু সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে, কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ করাই পুলিশের মূল লক্ষ্য।’ কলকাতা পুলিশের আধিকারিক ও কর্মীদের উদ্দেশ্যে নতুন কমিশনারের বার্তা ছিল স্পষ্ট এবং দৃঢ়। তিনি বলেন, ‘কলকাতা পুলিশের প্রত্যেক সদস্যের কাছে আমার বার্তা, আমরা কলকাতাবাসীর নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য দায়বদ্ধ। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমাদের কোনও ভাবেই ব্যর্থ হওয়া চলবে না। নগরপাল হিসেবে আমি আমার সহকর্মী ও অফিসারদের বলতে চাই, এখানে ব্যর্থতার কোনও জায়গা নেই।’
অজয়কুমার নন্দের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও যথেষ্ট দীর্ঘ এবং গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ১৯৯৬ ব্যাচের ভারতীয় পুলিশ পরিষেবা (IPS) আধিকারিক। কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পুলিশ সুপার হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি এবং মাওবাদী দমন অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে প্রশাসনিক মহলে তাঁর পরিচিতি রয়েছে। পরবর্তীতে তিনি আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময় শিল্পাঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। এছাড়াও কলকাতা পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেও কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গ স্পেশাল টাস্ক ফোর্স বা এসটিএফ (STF) -এর প্রথম আইজি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন অজয়কুমার নন্দ। সেই পদে থাকাকালীন তিনি সংগঠিত অপরাধ দমন এবং সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক মহলের মতে, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে এমন একজন অভিজ্ঞ আধিকারিককে কলকাতা পুলিশের শীর্ষ পদে বসানো নির্বাচন কমিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ নির্বাচন চলাকালীন কলকাতার মতো বড় শহরে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন পুলিশ কমিশনারের বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি শুরু থেকেই কঠোর অবস্থান নিতে চান। তাঁর কথায়, ‘আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা।’ কলকাতাবাসীর উদ্দেশ্যে তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘ভোটের সময় যাতে কোনও সমস্যা না হয়, তার জন্য কলকাতা পুলিশ সম্পূর্ণ প্রস্তুত। শহরে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Cabinet Meeting, Mamata Banerjee Nabanna Recruitment Decision | Assembly Election 2026-এর আগে নবান্নে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় -এর মন্ত্রিসভা বৈঠক, নিয়োগ ও বিনিয়োগে বড় সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত




