বৈজয়ন্তী চট্টোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ নতুন দিল্লি: ভারতে মোবাইল ফোন এখন দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে শুরু হলেও আজ তা শিক্ষা, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্য পরিষেবা, সরকারি সুবিধা ও দৈনন্দিন লেনদেনের অন্যতম ভরসা হয়ে উঠেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মোবাইল রিচার্জের মূল্য বৃদ্ধির বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের সংসার খরচে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলির ক্ষেত্রে এই ব্যয় অনেক সময় বড় সমস্যার রূপ নিচ্ছে। মোবাইল রিচার্জ খরচ বৃদ্ধি নিয়ে দেশে আলোচনাও বাড়ছে এবং প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের দাবি উঠছে।
একসময় মোবাইল ফোনকে বিলাসবহুল প্রযুক্তি হিসেবে দেখা হত। এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গিয়েছে। আধার যাচাই, ব্যাংকিং লেনদেন, অনলাইন ফর্ম পূরণ, ট্রেন বা বাসের টিকিট বুকিং, স্বাস্থ্য পরিষেবার তথ্য– প্রায় সব ক্ষেত্রেই মোবাইল নম্বর ও ইন্টারনেট সংযোগ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ফলে রিচার্জ না থাকলে বহু প্রয়োজনীয় পরিষেবা ব্যবহার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, সাধারণ একটি পরিবারের মাসিক খরচের তালিকায় মোবাইল রিচার্জ এখন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করেছে। একটি পরিবারের গড় উদাহরণ ধরলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। ধরুন একটি পরিবারে চারজন প্রাপ্তবয়স্ক সদস্য আছেন এবং প্রত্যেকের হাতে একটি করে স্মার্টফোন রয়েছে। বর্তমানে ন্যূনতম ব্যবহারের জন্যও মাসে প্রায় ৩৫০ টাকা করে রিচার্জ প্রয়োজন হয়। সে ক্ষেত্রে চারজনের জন্য মাসিক খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১,৪০০ টাকা। বছরে সেই অঙ্ক গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৬,৮০০ টাকা। এই ব্যয়ের তুলনায় অনেক পরিবারের আয় খুব বেশি নয়। বহু পরিবারে একজন বা দু’জন সদস্য উপার্জন করেন। আবার কিছু পরিবারে নিয়মিত আয়ও থাকে না। ফলে খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি ব্যয়ের পাশাপাশি মোবাইল রিচার্জের খরচ সংসারের হিসেবকে আরও কঠিন করে তুলছে।
এদিকে দেশের অধিকাংশ পরিষেবা এখন ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। যেকোনও সরকারি প্রকল্পে আবেদন করা, ব্যাংকের কাজ সম্পন্ন করা কিংবা অনলাইন লেনদেন করতে গেলে ফোনে আসা ওটিপি (OTP) অত্যন্ত জরুরি। এছাড়াও বিভিন্ন পেমেন্ট অ্যাপ, নেট ব্যাঙ্কিং ও ডিজিটাল পরিষেবার জন্য নিয়মিত ইন্টারনেট সংযোগ প্রয়োজন হয়। ফলে মোবাইল রিচার্জ বন্ধ হয়ে গেলে পরিবারগুলি কার্যত বহু পরিষেবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ড. সৌমেন দত্ত বলেন, ‘বর্তমান সময়ে মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু রিচার্জের খরচ ক্রমাগত বাড়তে থাকলে তা সাধারণ মানুষের মাসিক বাজেটে বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কেন্দ্রীয় রাজ্য সরকারগুলির উচিত এই পরিস্থিতির দিকে নজর দেওয়া।’
অন্যদিকে, সমাজকর্মী অনিন্দিতা সেন বিষয়টিকে সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখার কথা বলছেন। তাঁর কথায়, ‘এখন মোবাইল ব্যবহার না করলে বহু পরিষেবা পাওয়া যায় না। ফলে রিচার্জ করা এক ধরনের বাধ্যতামূলক খরচে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এটি মানুষের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করছে।’ টেলিকম সংস্থাগুলির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সংস্থা একাধিকবার তাদের রিচার্জ প্ল্যানের দাম বাড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আগের তুলনায় ডেটা বা সুবিধার পরিমাণও কমানো হয়েছে বলে অভিযোগ ব্যবহারকারীদের একাংশের। এতে গ্রাহকদের বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, গ্রাহকের সংখ্যা বৃদ্ধি ও মুনাফা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে টেলিকম সংস্থাগুলি দ্রুত এগোলেও গ্রাহকের ব্যয়ের চাপের বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়নি। ফলে এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। আরও একটি দিক উঠে এসেছে সামাজিক পর্যবেক্ষণে। সস্তা ইন্টারনেটের কারণে গত কয়েক বছরে সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন বিনোদনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। অনেকেই দিনের বড় সময় কাটাচ্ছেন মোবাইলের পর্দায়। কিন্তু রিচার্জের খরচ বাড়ার ফলে অনেক পরিবারে সেই ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
মনোবিজ্ঞানী প্রফেসর অরুণাভ মুখার্জী বলেন, ‘ডিজিটাল ব্যবহারের প্রবণতা এখন অনেক অনেক বেশি। একদিকে যোগাযোগ ও কাজের জন্য মানুষ মোবাইলের ওপর নির্ভর করছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত খরচ অনেক সময় মানসিক চাপ তৈরি করছে।’ গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। যদি ১০০টি সাধারণ পরিবারের হিসেব ধরা হয়, তাহলে বছরে শুধু মোবাইল রিচার্জ বাবদ মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১৬,৮০,০০০ টাকা। দেশের কোটি কোটি পরিবার একইভাবে রিচার্জ খরচ বহন করলে সেই অঙ্ক কত বড় হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়! এই বিপুল অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন করের মাধ্যমেও রাজস্ব হিসেবে জমা হয়। ফলে মোবাইল পরিষেবা আজ শুধু যোগাযোগের ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত হয়ে গিয়েছে।
সামাজিক সংগঠনগুলির একাংশের দাবি, মোবাইল যোগাযোগ পরিষেবাকে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় পরিষেবার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে এর মূল্য নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে ভাবনা শুরু করা উচিত। এতে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলি কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকের মতে, মোবাইল রিচার্জ আর কেবল প্রযুক্তিগত খরচ নয়। এটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। তাই বিষয়টি নিয়ে নীতি নির্ধারকদের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিভিন্ন মহলের মানুষ।
ছবি : প্রতিনিধিত্বমূলক




