সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারতে খাদ্যশস্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা আধুনিক ও শক্তিশালী করতে কেন্দ্রীয় সরকার বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। কৃষক, সমবায় সমিতি এবং সরকারি বিপণন সংস্থাগুলিকে যুক্ত করে শুরু হয়েছে ‘ওয়ার্ল্ডস লার্জেস্ট গ্রেইন স্টোরেজ প্ল্যান ইন দ্য কোঅপারেটিভ সেক্টর (World’s Largest Grain Storage Plan in the Cooperative Sector)’। এই প্রকল্পের লক্ষ্য গ্রামীণ স্তরে আধুনিক খাদ্যশস্য গুদাম গড়ে তোলা এবং কৃষকদের উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণ ও বিপণনের সুযোগ বাড়ানো। সম্প্রতি রাজ্যসভায় লিখিত উত্তরে এই পরিকল্পনার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সমবায় মন্ত্রী ‘অমিত শাহ (Amit Shah)’। তিনি জানান, ‘সমবায় খাতের মাধ্যমে বিশ্বের বৃহত্তম খাদ্যশস্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।’ সরকারের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে কৃষকদের ফসল সংরক্ষণে বড় সুবিধা হবে এবং কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কেন্দ্রীয় সমবায় মন্ত্রীর কথায়, এই পরিকল্পনার আওতায় গ্রামীণ সমবায় সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করে খাদ্যশস্য সংরক্ষণের আধুনিক গুদাম তৈরি করা হবে। বিশেষ করে ‘প্রাইমারি এগ্রিকালচারাল ক্রেডিট সোসাইটিকে (Primary Agricultural Credit Societies বা PACS)’ এই প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে রাখা হয়েছে। কারণ গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও আর্থিক পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে এই সমবায় সংস্থাগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রকল্পে কোন PACS নির্বাচন করা হবে তার জন্য কিছু নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট জেলা স্তরের ‘ডিস্ট্রিক্ট কোঅপারেটিভ ডেভেলপমেন্ট কমিটি (District Cooperative Development Committee বা DCDC)’ PACS নির্বাচন ও অনুমোদনের কাজ করবে। এই কমিটি স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনা করে উপযুক্ত সমবায় সংস্থা নির্বাচন করবে। সরকারি তথ্য বলছে, PACS নির্বাচন করার সময় সেই এলাকায় খাদ্যশস্য সংরক্ষণের প্রকৃত চাহিদা আছে কি না তা বিশেষভাবে দেখা হবে। এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও মূল্যায়ন প্রদান করবে কয়েকটি জাতীয় সংস্থা। যেমন ‘ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (Food Corporation of India বা FCI)’, সংক্ষেপে ‘ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল কোঅপারেটিভ মার্কেটিং ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (National Agricultural Cooperative Marketing Federation of India বা NAFED)’ এবং ‘ন্যাশনাল কোঅপারেটিভ কনজিউমার্স ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (National Cooperative Consumers’ Federation of India বা NCCF)’।
এই সংস্থাগুলি এমন অঞ্চল চিহ্নিত করবে যেখানে খাদ্যশস্য সংরক্ষণের ঘাটতি রয়েছে বা ভবিষ্যতে গুদামের প্রয়োজন হবে। সেই অনুযায়ী সেখানে সমবায় সংস্থার মাধ্যমে গুদাম নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হবে। PACS নির্বাচনের ক্ষেত্রে আর্থিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট PACS-এর গত দুই অর্থবছরে নিট সম্পদের পরিমাণ ইতিবাচক হতে হবে। পাশাপাশি সেই সমবায় সংস্থা কোনও ব্যাঙ্ক ঋণখেলাপি হতে পারবে না। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল, গত তিন অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে লাভ করতে হবে এবং মোট লাভ আনুমানিক পাঁচ লক্ষ টাকার বেশি হওয়া উচিত। এছাড়া যে গুদাম নির্মাণ করা হবে তার সংরক্ষণ ক্ষমতাও নির্দিষ্ট মানের হতে হবে। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত গুদামের ধারণক্ষমতা কমপক্ষে ৫০০ মেট্রিক টন হওয়া উচিত। এতে বড় পরিসরে খাদ্যশস্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এই বৃহৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক প্রকল্পকে একত্রিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘অ্যাগ্রিকালচার ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ড (Agriculture Infrastructure Fund বা AIF)’, ‘অ্যাগ্রিকালচারাল মার্কেটিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার স্কিম (Agricultural Marketing Infrastructure Scheme বা AMI)’, ‘সাব মিশন অন অ্যাগ্রিকালচারাল মেকানাইজেশন (Sub Mission on Agricultural Mechanization বা SMAM)’ এবং ‘প্রধানমন্ত্রী ফর্মালাইজেশন অফ মাইক্রো ফুড প্রসেসিং এন্টারপ্রাইজেস স্কিম (Pradhan Mantri Formalization of Micro Food Processing Enterprises Scheme বা PMFME)’।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী উল্লেখ যে, এই প্রকল্পগুলির সমন্বয়ের মাধ্যমে গুদাম নির্মাণের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। ‘অ্যাগ্রিকালচার ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ড (AIF)’ প্রকল্পের অধীনে PACS-কে গুদাম নির্মাণের জন্য নেওয়া ঋণের উপর সুদে ভর্তুকি দেওয়া হয়। অন্যদিকে ‘অ্যাগ্রিকালচারাল মার্কেটিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার স্কিম (AMI)’ -এর মাধ্যমে খাদ্যশস্য গুদাম নির্মাণে প্রায় ৩৩ শতাংশ ভর্তুকি প্রদান করা হয়। এই প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা বিতরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ‘ন্যাশনাল ব্যাংক ফর অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট (National Bank for Agriculture and Rural Development বা NABARD)’। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, AMI প্রকল্পের আওতায় NABARD ভর্তুকি অনুমোদন এবং বিতরণের কাজ করে থাকে।
অন্যদিকে, PACS-কে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করছে ‘স্টেট কোঅপারেটিভ ব্যাংক (State Cooperative Banks সংক্ষেপে StCBs)’ এবং ‘ডিস্ট্রিক্ট সেন্ট্রাল কোঅপারেটিভ ব্যাংক (District Central Cooperative Banks বা DCCBs)’। এই ব্যাংকগুলি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে PACS-কে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করে যাতে গুদাম নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে। এই পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হল ঋণের সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো। সরকারি তথ্য অনুযায়ী উল্লেখ, NABARD-এর বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্প ব্যবহার করে সমবায় সংস্থাগুলির আর্থিক চাপ কমানো হয়েছে। এর সঙ্গে ‘অ্যাগ্রিকালচার ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ড (AIF)’ -এর অধীনে ৩ শতাংশ সুদ ভর্তুকি যুক্ত হওয়ায় PACS-এর জন্য কার্যত ঋণের সুদের হার মাত্র প্রায় ১ শতাংশে নেমে আসে।
কিছু রাজ্য সরকারও এই প্রকল্পে নিজস্ব আর্থিক সহায়তা প্রদান করছে। উদাহরণ হিসেবে ‘রাজস্থান (Rajasthan)’ এবং ‘গুজরাট (Gujarat)’ রাজ্য নিজেদের রাজ্য স্তরের প্রকল্পের মাধ্যমে গুদাম নির্মাণে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। সংসদে অমিত শাহ (Amit Shah) বলেন, ‘সমবায় খাতকে শক্তিশালী করে গ্রামীণ স্তরে আধুনিক খাদ্যশস্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।’ তাঁর মতে, এই প্রকল্প সফল হলে কৃষকরা ফসল সংরক্ষণে সুবিধা পাবেন এবং বাজারে ন্যায্য দাম পাওয়ার সুযোগও বাড়বে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারতের মতো কৃষিনির্ভর দেশে পর্যাপ্ত গুদাম না থাকায় অনেক সময় ফসল নষ্ট হয়ে যায় বা কৃষকরা কম দামে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হন। সমবায় স্তরে বড় পরিসরে গুদাম তৈরি হলে এই সমস্যা অনেকটাই কমবে এবং কৃষকদের আয় বাড়াতে সাহায্য করবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Cooperative crop loan India | ক্ষুদ্র কৃষকদের ভরসা সমবায় ঋণ, কোটি কোটি টাকার সহায়তায় বাড়ছে উৎপাদন, সংসদে তথ্য দিলেন অমিত শাহ




