সাশ্রয় নিউজ ★ কলকাতা : বাংলা কৌতুকজগতের উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন। প্রয়াত জনপ্রিয় কৌতুকশিল্পী ও মঞ্চ-উপস্থাপক উত্তম দাস (Uttam Das)। কয়েক দশক ধরে গ্রাম থেকে শহর, পাড়ার জলসা থেকে বড় মঞ্চ সব জায়গায় তাঁর স্বতন্ত্র উপস্থিতি ছিল দর্শকনন্দিত। আশির দশকের টেপ-রেকর্ডারের যুগে যাঁর কণ্ঠস্বর ঘুরে বেড়াত বাংলার অগণিত বাড়িতে, সেই শিল্পীর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ বাংলা বিনোদন দুনিয়া। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় (Prosenjit Chatterjee)। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, বয়সজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন উত্তম দাস। শেষ পর্যন্ত সকলকে ছেড়ে চিরবিদায় নিলেন তিনি। মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক মাধ্যমে শিল্পী, অভিনেতা ও অনুরাগীদের শোকবার্তায় ভরে ওঠে টাইমলাইন। বাংলা কৌতুকশিল্পে তাঁর অবদান স্মরণ করে অনেকে লিখেছেন, এক যুগের অবসান ঘটল।
উত্তম দাস শুধু কৌতুক অভিনেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অসামান্য মঞ্চ-ব্যক্তিত্ব। তাঁর কণ্ঠস্বর, বাচনভঙ্গি ও সংলাপ পরিবেশনের নিজস্ব ঢং দর্শকদের মুগ্ধ করত। তিনি মঞ্চে উঠলেই পরিবেশ বদলে যেত। দর্শক হাসতে হাসতে চোখের জল ফেলতেন, আবার তাঁর ব্যঙ্গ-রসাত্মক মন্তব্যে সমাজবাস্তবতার প্রতিফলনও ধরা পড়ত। নিখাদ হাস্যরসের আড়ালে সূক্ষ্ম সামাজিক পর্যবেক্ষণ ছিল তাঁর শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শোকবার্তায় প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় (Prosenjit Chatterjee) লেখেন, ‘উত্তম দাস এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি মঞ্চে উঠলেই যেন জাদু সৃষ্টি করতেন। তিনি ছিলেন সত্যিকারের এক প্রতিভা। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর কাজ ও স্মৃতি চিরকাল আমাদের হৃদয়ে থেকে যাবে।’ টলিউডের এই বর্ষীয়ান অভিনেতার বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, উত্তম দাস কেবল কৌতুকশিল্পী নন, শিল্পীমহলে তিনি ছিলেন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব।
আশির দশকে যখন বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিল মঞ্চানুষ্ঠান ও অডিও ক্যাসেট, তখন উত্তম দাস ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। পাড়ায় পাড়ায় জলসা, বিশেষ করে দুর্গাপূজার পর বিজয়া সম্মিলনীর আসর এসব জায়গায় তাঁর উপস্থিতি প্রায় অপরিহার্য ছিল। আয়োজকেরা জানতেন, উত্তম দাস মানেই দর্শকভর্তি মাঠ, অট্টহাসির রোল। বাংলার গ্রাম ও শহরতলিতে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল আকাশছোঁয়া। অনেকের মতে, সেই সময়ের জলসা সংস্কৃতির তিনি অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিলেন। মঞ্চের পাশাপাশি অডিও ক্যাসেটের জগতেও সমান সাফল্য পেয়েছিলেন উত্তম দাস। তাঁর প্রকাশিত ক্যাসেটগুলির মধ্যে ‘হাসির মালপোয়া’ এবং ‘হাসির হেডলাইট’ বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। টেপ-রেকর্ডারে তাঁর কৌতুক শুনে বড় হয়েছেন এক প্রজন্ম। পারিবারিক আসর, পিকনিক বা উৎসব সব জায়গাতেই তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল আনন্দের সঙ্গী। বর্তমান ডিজিটাল যুগের আগে অডিও ক্যাসেটের বাজারে যে কয়েকজন কৌতুকশিল্পী ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিলেন, তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম।
খড়দহের (Khardah) বাসিন্দা উত্তম দাস উঠে এসেছিলেন অত্যন্ত সাধারণ পরিবার থেকে। আর্থিক অনটন সঙ্গী হলেও শিল্পচর্চার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তোলেন। প্রথম জীবনে ছোট ছোট অনুষ্ঠান দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে বড় মঞ্চে পৌঁছন। তাঁর সাফল্যের গল্প বহু তরুণ শিল্পীর কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিনোদনের মাধ্যম বদলেছে, টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আগমন ঘটেছে, কিন্তু উত্তম দাসের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। তিনি নিজেকে সময়োপযোগী করে তুলেছিলেন। তাঁর পরিবেশনায় ছিল সরলতা, আন্তরিকতা ও তীক্ষ্ণ রসবোধ। অশালীনতা বা কৃত্রিমতার আশ্রয় না নিয়ে নিখাদ হাসির মাধ্যমে দর্শকদের মন জয় করেছিলেন তিনি। এটাই ছিল তাঁর শিল্পসত্তার শক্তি। সহশিল্পীদের একাংশের মতে, উত্তম দাস ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও সহৃদয় মানুষ। নবীন শিল্পীদের উৎসাহ দিতেন, মঞ্চে সুযোগ করে দিতেন। এক প্রবীণ সংগঠকের কথায়, ‘উত্তমদা শুধু নিজের পারফরম্যান্স নিয়েই ভাবতেন না, পুরো অনুষ্ঠান কীভাবে সফল হবে তা নিয়েও চিন্তা করতেন। তিনি ছিলেন দলনেতার মতো।’ শিল্পী হিসেবে যেমন সফল, মানুষ হিসেবেও তেমনই সহজ-সরল ছিলেন তিনি।
তাঁর প্রয়াণে বাংলা কৌতুকশিল্প এক বড় শূন্যতার মুখে পড়ল। আজকের দিনে স্ট্যান্ড-আপ কমেডির যে জনপ্রিয়তা, তার অনেক আগেই মঞ্চকৌতুকে নিজস্ব ধারা তৈরি করেছিলেন উত্তম দাস। বাংলা ভাষার স্বতন্ত্র উচ্চারণ, আঞ্চলিক টান ও দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ঘটনাকে তিনি রসিকতার মোড়কে পরিবেশন করতেন। ফলে দর্শক সহজেই নিজেদের জীবনের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেতেন তাঁর কথায়। বর্তমানে সামাজিক মাধ্যমে বহু অনুরাগী তাঁর পুরনো অডিও ও ভিডিও ক্লিপ শেয়ার করে স্মৃতিচারণ করছেন। কেউ লিখেছেন, ‘শৈশবের হাসি যেন ফিরে এল তাঁর কণ্ঠ শুনে।’ আবার কেউ বলেছেন, ‘উত্তম দাস মানেই আমাদের পাড়ার জলসার সেরা মুহূর্ত।’ এভাবেই মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবেন তিনি। বাংলা বিনোদন জগতে উত্তম দাসের অবদান নিঃসন্দেহে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কৌতুকশিল্পকে তিনি সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন। মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি, কণ্ঠের ওঠানামা, সংলাপের ছন্দ, সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন একজন অনন্য শিল্পী। তাঁর প্রয়াণে যে শূন্যতা তৈরি হল, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তবু তাঁর সৃষ্ট হাসির মুহূর্তগুলোই আগামী দিনে বাঙালির স্মৃতিতে আলো জ্বেলে রাখবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Kim Ju Ae successor, North Korea leadership crisis | ১৩ বছরের কন্যাই কী উত্তর কোরিয়ার পরবর্তী শাসক? ক্ল্যাশ অফ কিম্স-এ সরগরম পিয়ংইয়ং, নজরে বিশ্বরাজনীতি




