সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বাঁকুড়া : বাঁকুড়া (Bankura) জেলার জয়পুরে (Joypur) চাষের জমিতে ধান রোপণের সময় কাদাজলের মধ্যে আধডোবা অবস্থায় উদ্ধার হল একটি সদ্যোজাত কন্যাসন্তানের দেহ। বৃহস্পতিবার সকালে এই মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। স্থানীয় কৃষকেরা জমিতে কাজ করতে নেমে প্রথম দেহটি দেখতে পান। খবর পেয়ে জয়পুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠিয়েছে। কে বা কারা, কখন এবং কীভাবে শিশুটিকে সেখানে ফেলে গেল, তা ঘিরে রহস্য দানা বাঁধছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে জয়পুর ব্লকের শ্যামনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের বেলিয়া ডাঙরপাড়া এলাকায় কয়েকজন কৃষক ধান রোপণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। জমিতে জল সেচ দেওয়া হয়েছিল, কাদা নরম করে তৈরি করা হয়েছিল চারা বসানোর জন্য। জমির এক কোণে সাবমার্সিবল পাম্পের পাশে কাদার মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু দেখতে পান এক কৃষক। কাছে যেতেই চোখে পড়ে, কাদার ভিতরে আধডোবা অবস্থায় পড়ে রয়েছে এক নবজাতক কন্যার দেহ। মুহূর্তে স্তম্ভিত হয়ে পড়েন তাঁরা। দ্রুত অন্যদের ডাকেন এবং পরে পুলিশে খবর দেওয়া হয়।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই আশপাশের গ্রাম থেকে বহু মানুষ মাঠে ভিড় জমাতে থাকেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের বক্তব্য, এমন দৃশ্য তাঁরা জীবনে দেখেননি। এক গৃহবধূ বলেন, ‘প্রথমে আমরা বিশ্বাসই করতে পারিনি। ধানের চারা বসানোর জন্য যে কাদা তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যেই শিশুটিকে পড়ে থাকতে দেখেছি। এমন ঘটনা আমাদের গ্রামে কখনও ঘটেনি।’ আর এক স্থানীয় বাসিন্দার কথায়, ‘সকালে মাঠে কাজ করতে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখব ভাবিনি। সারা শরীর কেঁপে উঠেছিল। কে এমন নিষ্ঠুর কাজ করতে পারে?’ পুলিশ সূত্রে খবর, দেহটি উদ্ধার করে প্রথমে জয়পুর প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল (Bankura Sammilani Medical College and Hospital) -এ। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে শিশুটি সদ্যোজাত বলেই অনুমান। তবে জন্মের পর কত সময়ের মধ্যে তাকে ফেলে দেওয়া হয়েছে, কিংবা জন্মটি হাসপাতাল না বাড়িতে হয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে এলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনাটি ঘিরে একাধিক প্রশ্ন উঠছে। স্থানীয়দের একাংশের অনুমান, অবাঞ্ছিত কন্যাসন্তান হওয়ার কারণে শিশুটিকে পরিত্যাগ করা হয়ে থাকতে পারে। যদিও এই বিষয়ে পুলিশ কোনও সম্ভাবনাকেই উড়িয়ে দিচ্ছে না। আশপাশের গ্রামগুলিতে সদ্যোজাত শিশু জন্মের খোঁজখবর শুরু হয়েছে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র, নার্সিংহোম ও ধাত্রীদের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। গত কয়েক দিনে কোনও গোপন প্রসবের ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়েও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীরা আশঙ্কা করছেন, ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে গভীর রাতে ঘটানো হয়ে থাকতে পারে। চাষের জমি নির্জন হওয়ায় এবং ভোরের আগে সেখানে মানুষের আনাগোনা কম থাকায় দুষ্কৃতীরা সুযোগ নিয়েছে বলে প্রাথমিক অনুমান। তবে জমির মালিক বা স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ এলাকা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে। মাঠে বা তার আশপাশে কোনও কাপড়, প্লাস্টিক বা সন্দেহজনক বস্তু পাওয়া গিয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শিক্ষিত মহলের মতে, গ্রামীণ সমাজে এখনও কন্যাসন্তানকে ঘিরে কুসংস্কার ও সামাজিক চাপ পুরোপুরি দূর হয়নি। যদিও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কন্যাশ্রী, বেটি বাঁচাও প্রকল্পের মতো নানা কর্মসূচি চালু রয়েছে, তবু বিচ্ছিন্নভাবে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা সামনে আসছে। প্রশাসনের এক কর্তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক থেকে বলেন, ‘যদি প্রমাণিত হয় যে কন্যাসন্তান হওয়ার কারণেই শিশুটিকে পরিত্যাগ করা হয়েছে, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আইন অনুযায়ী, সদ্যোজাত শিশুকে পরিত্যাগ বা হত্যার ঘটনা গুরুতর অপরাধ। ভারতীয় দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় দোষ প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। সেই কারণে পুলিশ বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখছে। তদন্তের স্বার্থে এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ (যদি কোথাও থাকে) খতিয়ে দেখা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে। পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঘটনার জেরে এলাকায় শোক ও ক্ষোভের সুর। অনেকেই বলছেন, এমন নৃশংসতা মানবিকতার পরিপন্থী। এক প্রবীণ গ্রামবাসীর কথায়, ‘সন্তান তো ঈশ্বরের দান। ছেলে-মেয়ে ভেদ করে এভাবে ফেলে দেওয়া যায়? সমাজ কোথায় যাচ্ছে?’ অন্য এক যুবকের মন্তব্য, ‘যদি কোনও সমস্যা থেকেও থাকে, প্রশাসন বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সাহায্য নেওয়া যেত। কিন্তু এভাবে কাদার মধ্যে ফেলে যাওয়া অমানবিক।’ প্রসঙ্গত, এখন নজর ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও পুলিশের তদন্তে। শিশুটির পরিচয় এবং পরিবারের সন্ধান মিললেই রহস্যের জট কিছুটা কাটবে বলে মনে করা হচ্ছে। আপাতত গোটা জয়পুর ও বাঁকুড়া জুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা। কাদাজমিতে আধডোবা অবস্থায় পড়ে থাকা এক নবজাতকের দেহ যেন সমাজের বিবেককেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Bankura Flood 2025 | দ্বারকেশ্বর গিলে নিল প্রাণ, টানা বৃষ্টিতে ভাসছে বাঁকুড়া, সেতু-রাস্তা বন্ধ, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন




