সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ গ্যাংটক : সিকিমে ফের ভূমিকম্পের আতঙ্ক। বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত টানা ১২ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ১২ বার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে। একাধিক কম্পনের অভিঘাতে কেঁপে উঠেছে উত্তর সিকিম থেকে দক্ষিণ সিকিম, পূর্ব ও পশ্চিম সিকিমের বিস্তীর্ণ এলাকা। শুধু তাই নয়, কম্পনের প্রভাব পড়েছে উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং, কালিম্পং, শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়ির বিস্তৃত অংশে। এমনকী এই ভূমিকম্পের মৃদু কম্পন অনুভূত হয়েছে প্রতিবেশী অসম, নেপাল এবং চিনেও। যদিও প্রশাসনের তরফে এখনও পর্যন্ত কোনও ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করা হয়নি, তবু লাগাতার কম্পনে সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা ক্রমেই বাড়ছে।
উল্লেখ্য, শুক্রবার রাত ১টা বেজে ৯ মিনিটে প্রথম ও সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পনটি অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৪.৫। পশ্চিম সিকিমের গ্যালশিং (Gyalshing) এলাকায় ভূগর্ভের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে ছিল কম্পনের উৎসস্থল। এই এক ঝাঁকুনিতেই কেঁপে ওঠে সিকিমের প্রায় সব জেলা। পাহাড়ি এলাকার পাশাপাশি সমতলের উত্তরবঙ্গেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গভীর রাতে মানুষ ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন, বহু হোটেল ও লজের পর্যটকেরাও দুশ্চিন্তায় জেগে ওঠেন। প্রথম শক্তিশালী কম্পনের পর যেন থামার নাম নেয়নি ভূমিকম্প। রাত ১টা ১৫ মিনিটে গ্যাংটক (Gangtok) থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে ফের কম্পন অনুভূত হয়, যার মাত্রা ছিল ৩.১। এর কিছুক্ষণ পর রাত ২টা ৩ মিনিটে মঙ্গন (Mangan) এলাকায় ২.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। রাত ২টা ২০ মিনিটে আবার কেঁপে ওঠে সিকিমের নামচি (Namchi), তখন কম্পনের মাত্রা ছিল ৩.৯। রাত ২টা ৪৩ মিনিটে নামচি থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার গভীরে উৎসস্থল নিয়ে আরও একটি মৃদু ভূমিকম্প হয়, যার মাত্রা ছিল ২.৪। এরপরেও ধারাবাহিকভাবে কম্পন চলতে থাকে। রাত ২টা ৫৬ মিনিট ও ২টা ৫৯ মিনিটে মঙ্গনে পরপর দু’বার ভূমিকম্প হয়, দু’বারই উৎসস্থল ছিল পাঁচ কিলোমিটার গভীরে এবং মাত্রা ছিল যথাক্রমে ২.৪ ও ২.৫। রাত ৩টা ১১ মিনিটে আবার তুলনামূলক শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়, যার মাত্রা ছিল ৪। এরপর ৩টা ৩৬ মিনিটে ২.৮ মাত্রার কম্পন, ৩টা ৫২ মিনিটে ও ভোর ৪টা ৫৭ মিনিটে ফের মঙ্গনে ভূমিকম্প হয়। ভোর ৫টা ২৯ মিনিটে নামচির পাঁচ কিলোমিটার গভীরে ২.৯ মাত্রার ভূমিকম্প নথিভুক্ত হয়। প্রথম শক্তিশালী কম্পনের পরবর্তী কম্পনগুলি তুলনামূলক মৃদু হলেও একের পর এক ঝাঁকুনি মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ভয় বাড়িয়েছে।
সিকিম আবহাওয়া দফতরের ডিরেক্টর ডক্টর গোপীনাথ রাহা (Dr. Gopinath Raha) জানান, ‘প্রথম বারের ভূমিকম্পের তীব্রতা তুলনামূলক বেশি ছিল। তার পর থেকে অন্তত ১২ বার কম্পন রেকর্ড করা হয়েছে। সিকিমের বিভিন্ন প্রান্তে সেই কম্পন অনুভূত হয়েছে।’ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই ধরনের আফটারশক পাহাড়ি ও ভূকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অস্বাভাবিক নয়, তবে পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে। এই সময়টায় সিকিমে পর্যটনের ভরা মরসুম। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পর্যটক পাহাড়ে ছুটি কাটাতে এসেছেন। ফলে ভূমিকম্পের খবরে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে পর্যটন মহলেও। একাধিক ট্যুর অপারেটর জানিয়েছেন, আতঙ্কিত পর্যটকেরা ফোন করে পরিস্থিতির খোঁজ নিচ্ছেন। হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজ়ম ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের সম্পাদক সম্রাট সান্যাল বলেন, ‘উৎকণ্ঠা নিয়ে বহু পর্যটক আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তবে এই মুহূর্তে আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনও পরিস্থিতি নেই। আমরা নিয়মিত সিকিম প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি এবং প্রশাসন সম্পূর্ণ তৎপর রয়েছে।’ প্রশাসনের তরফেও জানানো হয়েছে, পরিস্থিতির উপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে। বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্ক রাখা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে গুজবে কান না দিতে এবং সরকারি নির্দেশিকা মেনে চলার অনুরোধ জানানো হয়েছে। যদিও এখনও পর্যন্ত বড় কোনও ক্ষয়ক্ষতির খবর নেই, তবু ভূমিকম্পপ্রবণ হিমালয় অঞ্চলে এই ধরনের ধারাবাহিক কম্পন স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
ভূতাত্ত্বিকদের মতে, সিকিম ও উত্তরবঙ্গ অঞ্চল ভূমিকম্পের দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভারতীয় ও ইউরেশিয়ান টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের জেরে এই অঞ্চলে মাঝেমধ্যেই কম্পন অনুভূত হয়। তাই ভবিষ্যতেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। আপাতত বড় বিপদের কোনও ইঙ্গিত না মিললেও, সতর্ক থাকাই একমাত্র উপায় বলে মত প্রশাসনের।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Elon Musk Partner Indian Origin | মাস্ক জানালেন তাঁর সঙ্গিনীর শিকড় ভারতে, ‘ইন্ডিয়ান অরিজিন’ পরিচয় ঘিরে আলোচনা তুঙ্গে




