সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে এককভাবে লড়াই করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিল কংগ্রেস। বামফ্রন্ট বা সিপিএমের সঙ্গে কোনও জোটে না গিয়ে রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনেই প্রার্থী দেওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানাল অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি। বৃহস্পতিবার নতুন দিল্লিতে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের নেতাদের দীর্ঘ বৈঠকের পর এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সিলমোহর পড়ে। কংগ্রেসের অন্দরে এই সিদ্ধান্তকে ‘রাজনৈতিক পুনর্গঠনের সূচনা’ বলেই ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
নতুন দিল্লির ১০, রাজাজি মার্গে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গের (Mallikarjun Kharge) সরকারি বাসভবনে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi), সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) কে সি বেণুগোপাল (K C Venugopal), পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা গুলাম আহমেদ মীর (Ghulam Ahmed Mir), প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার (Subhankar Sarkar), প্রাক্তন সাংসদ অধীর চৌধুরী (Adhir Chowdhury) এবং সাংসদ ইশা খান চৌধুরী (Isha Khan Chowdhury)। রাজ্যের আরও কয়েক জন নেতা ভার্চুয়ালি বৈঠকে যোগ দেন বলে দলীয় সূত্রে খবর। বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দলের সাংগঠনিক শক্তি ও ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। সূত্রের খবর, অধিকাংশ নেতা পরিষ্কারভাবে মত দেন যে বামেদের সঙ্গে জোট কংগ্রেসের রাজনৈতিক পরিচয় ও সংগঠনের ক্ষতি করেছে। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন জোট রাজনীতির কারণে কংগ্রেসের নিজস্ব ভোটব্যাঙ্ক ও কর্মীভিত্তি দুর্বল হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এ বার একা লড়াইয়ের পথে হাঁটার পক্ষে সওয়াল করেন প্রদেশ নেতৃত্বের বড় অংশ।
যদিও বৈঠকে প্রাক্তন প্রদেশ সভাপতি অধীর চৌধুরী বামেদের সঙ্গে জোটের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সিপিএমের সঙ্গে জোট করেই কংগ্রেস রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল হয়েছিল। তাঁর যুক্তি ছিল, তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বামেদের সঙ্গে বোঝাপড়া কৌশলগত ভাবে সহায়ক হতে পারে। এমনকি ২০২৩ সালের সাগরদিঘি উপনির্বাচনে বামেদের সমর্থন নিয়ে কংগ্রেসের জয়কেও উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত একক লড়াইয়ের পক্ষেই যায়। বৈঠক শেষে পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা গুলাম আহমেদ মীর বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে সংগঠন ও রাজনৈতিক রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সকলের মতামত শোনার পর সিদ্ধান্ত হয়েছে, কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে একক ভাবেই ২৯৪টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।’ তিনি আরও জানান, ‘অতীতে জোট রাজনীতির কারণে রাজ্যের কংগ্রেস কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠে দলের নিজস্ব শক্তি ফেরাতেই এই সিদ্ধান্ত।’
দলীয় সূত্রে খবর, শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে প্রদেশ নেতারা যুক্তি দেন যে বামফ্রন্টের সঙ্গে জোটে কংগ্রেসের আলাদা রাজনৈতিক অবস্থান ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির বিরুদ্ধে বিকল্প শক্তি হিসেবে কংগ্রেসকে তুলে ধরার সুযোগ সে ভাবে তৈরি হয়নি। একা লড়াই করলে জেলা স্তরে সংগঠন মজবুত করা, নতুন মুখ সামনে আনা এবং কর্মীদের মনোবল বাড়ানো সম্ভব হবে বলেই নেতৃত্বের ধারণা। এই সিদ্ধান্তের পর অধীর চৌধুরীর প্রতিক্রিয়া ঘনিষ্ঠ মহলে আলোচিত। তিনি জানান, ‘এআইসিসি যে সিদ্ধান্ত নেবে, তা আমাদের সকলকেই মেনে নিতে হবে।’ তাঁর এই বক্তব্যে দলীয় শৃঙ্খলার বার্তাই স্পষ্ট বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস, বামফ্রন্ট ও ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট একসঙ্গে জোট করে লড়াই করেছিল। কিন্তু সেই নির্বাচনে কংগ্রেস একটিও আসন পায়নি। বামফ্রন্টও শূন্য হয়ে যায়, শুধু ভাঙড় থেকে ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের নওশাদ সিদ্দিকী (Naushad Siddique) জয়ী হন। সেই ফলাফল রাজ্যে কংগ্রেসের সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং জোট রাজনীতির কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দেয়। কংগ্রেস নেতৃত্বের একাংশের মতে, সেই ব্যর্থতাই এবার নতুন পথে হাঁটার অন্যতম কারণ।রাজনৈতিক মহলের মতে, কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্তে পশ্চিমবঙ্গের ভোটের অঙ্কে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে। তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে বিজেপি নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে। সেই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস একক লড়াই করে কতটা জায়গা দখল করতে পারে, সেটাই বড় প্রশ্ন। তবে কংগ্রেস শিবিরে আশাবাদ, একা লড়াই করলে দলের পরিচয় স্পষ্ট হবে এবং সংগঠন মজবুত হবে। প্রসঙ্গত, বামেদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের জোট রাজনীতিতে ইতি টেনে কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্ত রাজ্য রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে এই একক লড়াই কংগ্রেসের ভাগ্য কতটা বদলাতে পারে, সে দিকেই এখন নজর রাজ্যবাসীর।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Health Scheme pensioners, cashless medical benefit West Bengal | রাজ্য বাজেটে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের চিকিৎসা খাতে বড় সুবিধা, পেনশনভোগীদের ভরসা বাড়াল নবান্ন




