সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি/পাটনা: সমাজমাধ্যমের বাড়তে থাকা প্রভাব এবং তার অপব্যবহার রুখতে কড়া পদক্ষেপ নিল বিহার সরকার (Bihar Government)। মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের (Nitish Kumar) নেতৃত্বাধীন সরকার সরকারি কর্মীদের সমাজমাধ্যম ব্যবহারে একগুচ্ছ কঠোর নিয়ম জারি করেছে। ফেসবুক (Facebook), এক্স বা প্রাক্তন টুইটার (X), ইনস্টাগ্রাম (Instagram), ইউটিউব (YouTube) -সহ সব ধরনের সমাজমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই নির্দেশিকা মানা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মন্ত্রীসভার অনুমোদনও মিলেছে, এখন শুধু তা কার্যকর হওয়ার অপেক্ষা।
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনও সরকারি কর্মী সমাজমাধ্যমে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলতে চাইলে তাঁকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট দফতরের কাছ থেকে আগাম অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি ছাড়া অ্যাকাউন্ট খোলা হলে তা নিয়মভঙ্গ হিসেবে গণ্য হবে। পাশাপাশি, ভুয়ো নাম বা বেনামে কোনও অ্যাকাউন্ট চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিচু স্তরের কর্মী থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন আধিকারিক, সকলের ক্ষেত্রেই এই নিয়ম সমানভাবে প্রযোজ্য বলে স্পষ্ট করেছে রাজ্য সরকার। সরকারি নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, সমাজমাধ্যমে ব্যক্তিগত পোস্ট করলেও সেখানে নিজের পদমর্যাদা বা তিনি কোন দফতরে কর্মরত, সেই পরিচয় উল্লেখ করা যাবে না। সরকারি লোগো, প্রতীক কিংবা সরকারি পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত কোনও চিহ্ন ব্যবহারের উপরেও কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মীদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, ব্যক্তিগত পোস্টের ক্ষেত্রে যেন অফিসিয়াল ই-মেল আইডি বা সরকারি ফোন নম্বর ব্যবহার না করা হয়। সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি হিসেবে কারও মতামত এবং একজন সরকারি কর্মী হিসেবে তাঁর অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা টানতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নির্দেশিকায় কী ধরনের পোস্ট করা যাবে না, তা বিশদে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনও অশ্লীল, উস্কানিমূলক, আপত্তিকর বা সমাজে অশান্তি ছড়াতে পারে, এমন কোনও লেখা, ছবি বা ভিডিয়ো পোস্ট করা যাবে না। জাতি, ধর্ম বা কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে ঘিরে মন্তব্য করাও নিষিদ্ধ। সরকারি বৈঠক, প্রশাসনিক আলোচনা কিংবা সংবেদনশীল ও গোপন নথি সংক্রান্ত ছবি বা ভিডিও সমাজমাধ্যমে শেয়ার করা যাবে না। এমনকি সরকারি কোনও বিষয় পোস্ট হলে, সেই পোস্টে মন্তব্য করা থেকেও কর্মীদের বিরত থাকতে বলা হয়েছে।সরকারি নীতির সমালোচনা বা ঊর্ধ্বতন কোনও আধিকারিকের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মন্তব্য করাও এই নির্দেশিকা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা যাবে না। যৌন হেনস্থার শিকার কোনও ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, এই সব নিয়ম লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট কর্মীর বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে তদন্তও করা হবে।
রাজ্য সরকারের যুক্তি, সমাজমাধ্যম ব্যবহার বন্ধ করাই এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য নয়। পাশাপাশি সরকারি কর্মীদের দায়িত্ববোধ, শালীনতা এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখাই মূল লক্ষ্য। সরকারের এক আধিকারিকের কথায়, ‘সমাজমাধ্যম আজ ব্যক্তিগত মত প্রকাশের বড় মঞ্চ। কিন্তু সরকারি কর্মীদের ক্ষেত্রে কিছু অতিরিক্ত দায়িত্ব থাকে। সেই দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করতেই এই নীতি।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রীয় স্তরে সমাজমাধ্যমে সরকারি কর্মীদের মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত মতামত সরকারি অবস্থানের সঙ্গে গুলিয়ে যাচ্ছে, যা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে ফেলছে। বিহার সরকারের এই সিদ্ধান্ত সেই জায়গাতেই স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন প্রশাসনিক মহলের একাংশ।
সরকারের এই নির্দেশিকা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও দেখা যাচ্ছে। একাংশের মত, এতে সরকারি কর্মীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হতে পারে। আবার অন্য পক্ষের বক্তব্য, সরকারি কর্মীরা যেহেতু রাষ্ট্রের প্রতিনিধি, তাই তাঁদের আচরণ ও বক্তব্যে শৃঙ্খলা থাকা জরুরি। সমাজমাধ্যমের যুগে প্রশাসনিক গোপনীয়তা ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে এই ধরনের নীতির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না বলেই মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। উল্লেখ্য, নীতীশ কুমারের সরকার আগেও প্রশাসনিক সংস্কার ও শৃঙ্খলার উপর জোর দিয়েছে। সমাজমাধ্যম সংক্রান্ত এই নতুন নির্দেশিকাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলেই মনে করা হচ্ছে। এখন দেখার, এই নিয়ম কার্যকর হলে বাস্তবে কতটা প্রভাব পড়ে সরকারি কর্মীদের সমাজমাধ্যম ব্যবহারে এবং প্রশাসনিক পরিবেশে।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Under 16 Social Media Restriction, Goa Government | ১৬ বছরের কম বয়সিদের সমাজমাধ্যম নিষিদ্ধ করার ভাবনায় গোয়া ও অন্ধ্রপ্রদেশ




