সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : দেশে প্রথমবারের মতো সমাজমাধ্যম ব্যবহারে বয়সসীমা বেঁধে দেওয়ার চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার দেখানো পথ অনুসরণ করে ভারতের দুই রাজ্য গোয়া (Goa) ও অন্ধ্রপ্রদেশ (Andhra Pradesh) ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সমাজমাধ্যম নিষিদ্ধ করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। শিশু-কিশোরদের পড়াশোনায় মনোযোগ বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা এবং পারিবারিক জীবনে সমাজমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব কমাতেই এই উদ্যোগ বলে মনে করছে প্রশাসন। গোয়া সরকারের পর্যটন ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী রোহন খাউন্টে (Rohan Khaunte) সম্প্রতি জানিয়েছেন, অভিভাবকদের তরফে ক্রমাগত অভিযোগ আসছে যে, সমাজমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানোর কারণে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। শুধু তাই নয়, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক আচরণ ও মানসিক স্থিতির উপরেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়ার আদলে একটি আইন আনার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হচ্ছে। তাঁর কথায়, ‘আমরা চাই শিশু-কিশোররা প্রযুক্তিকে বিনোদনের বদলে শিক্ষার কাজে ব্যবহার করুক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার দিকে তাদের মনোযোগ ফেরানো জরুরি।’

সূত্রের খবর, গোয়ার তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ ইতিমধ্যেই এই প্রস্তাবের আইনি দিকগুলি খতিয়ে দেখা শুরু করেছে। কীভাবে বয়স যাচাই করা হবে, কোন কোন সমাজমাধ্যম এই আইনের আওতায় পড়বে, এবং আইন কার্যকর হলে তার বাস্তবায়ন পদ্ধতি কী হবে, এই সব বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। রোহন খাউন্টে আরও জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী প্রমোদ সবন্ত (Pramod Sawant) -এর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী বিধানসভা অধিবেশনেই এই সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হতে পারে। শুধু গোয়া নয়, অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারও একই ধরনের পদক্ষেপের কথা ভাবছে। মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নায়ডু (Chandrababu Naidu) -এর নেতৃত্বাধীন সরকার শিশুদের সমাজমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনতে কী ধরনের নীতি গ্রহণ করা যায়, তা খতিয়ে দেখছে। প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, ডিজিটাল আসক্তি কমানো এবং শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

এই প্রস্তাবের পেছনে আন্তর্জাতিক উদাহরণ হিসেবে বারবার উঠে আসছে অস্ট্রেলিয়ার নাম। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বে প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য সমাজমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার আইন কার্যকর করে। সেই আইনের আওতায় ফেসবুক (Facebook), টিকটক (TikTok), ইউটিউব (YouTube), এক্স (X), স্ন্যাপচ্যাট (Snapchat), ইনস্টাগ্রাম (Instagram)-সহ মোট ১০টি জনপ্রিয় সমাজমাধ্যমকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকেই সেদেশে ব্যাপকভাবে অ্যাকাউন্ট যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়। উল্লেখ্য, অস্ট্রেলিয়ার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই ১৬ বছরের কম বয়সিদের ১০ লক্ষেরও বেশি অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির মাধ্যমে ব্লক করা হয়েছে। আইন ভাঙলে সমাজমাধ্যম সংস্থাগুলিকে গুনতে হতে পারে সর্বোচ্চ ৩ কোটি ৩০ লক্ষ ডলার জরিমানা, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২৯৬ কোটি টাকারও বেশি। এই কঠোর শাস্তির ব্যবস্থাই আইনটির সবচেয়ে আলোচিত দিক। তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। বিশ্বের একাধিক তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ় (Anthony Albanese) -এর সরকারের এই আইনকে ‘ব্ল্যাংকেট সেন্সরশিপ’ বলে কটাক্ষ করেছে। তাদের দাবি, এতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হতে পারে এবং প্রযুক্তির ইতিবাচক দিকগুলি উপেক্ষিত হবে। যদিও অস্ট্রেলিয়া সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, শিশুদের মানসিক ও সামাজিক সুরক্ষাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
ভারতের ক্ষেত্রে এই ধরনের আইন কার্যকর করা কতটা সহজ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিপুল এবং বয়স যাচাইয়ের প্রক্রিয়া যথেষ্ট জটিল। তবু গোয়া ও অন্ধ্রপ্রদেশের এই ভাবনা কেন্দ্রীয় স্তরেও নতুন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এটি কার্যকর হলে ভবিষ্যতে অন্যান্য রাজ্যও একই পথে হাঁটতে পারে।কিন্তু, সমাজমাধ্যমের দুনিয়ায় শিশু-কিশোরদের উপস্থিতি নিয়ে যে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে, গোয়া ও অন্ধ্রপ্রদেশের এই উদ্যোগ তারই প্রতিফলন। অস্ট্রেলিয়ার মডেল ভারতের প্রেক্ষাপটে কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, সেটাই এখন দেখার।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Rajasthan mobile ban, camera phone ban for women | প্রজাতন্ত্র দিবস থেকে ক্যামেরাযুক্ত মোবাইল নিষিদ্ধ! রাজস্থানের গ্রাম পঞ্চায়েতের ফরমান ঘিরে তীব্র বিতর্ক




