তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : বিড়লা পরিবারের ষষ্ঠ প্রজন্মের প্রতিনিধি হয়েও নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে এমনই এক নাম অনন্যা বিড়লা (Ananya Birla)। আদিত্য বিড়লা গ্রুপের চেয়ারম্যান কুমার মঙ্গলম বিড়লা -এর (Kumar Mangalam Birla) জ্যেষ্ঠ কন্যা অনন্যা জন্মসূত্রে পেয়েছেন ব্যবসার রক্ত, কিন্তু মননে ও মননে বরাবরই জায়গা করে নিয়েছে সঙ্গীত, সৃজনশীলতা ও সমাজচিন্তা। রূপে, গুণে এবং ব্যক্তিত্বে তিনি যেন আধুনিক ভারতের এক বহুমাত্রিক মুখ।১৯৯৪ সালের জুলাই মাসে মুম্বইয়ে জন্ম অনন্যার। বিড়লা পরিবারের কন্যা হিসেবে তাঁর ভবিষ্যৎ যে ব্যবসার দিকেই বাঁক নেবে, তা অনেকটাই ধরে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তিনি নিজের শখকে গুরুত্ব দিতে শিখেছিলেন। গানবাজনার প্রতি অনন্যার আকর্ষণ ছিল স্বাভাবিক ও গভীর। মাত্র ১১ বছর বয়স থেকেই সন্তুর বাজানো শিখতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে সেই আগ্রহ রূপ নেয় গানের জগতে প্রবেশের স্বপ্নে।

মুম্বাইয়ে স্কুলজীবন কাটালেও অনন্যার পড়াশোনার অভিজ্ঞতা খুব একটা সহজ ছিল না। একাধিক স্কুল তাঁকে বদলাতে হয়েছিল।
একটি সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘আমি বেশি দিন এক স্কুলে পড়তে পারতাম না। আমার পারিবারিক পরিচয়টাই অনেক সময় আমার ব্যক্তিত্বের আগে চলে আসত। ফলে বন্ধুত্ব বা স্বাভাবিক মেলামেশা সহজ ছিল না।’ এই অভিজ্ঞতাই সম্ভবত তাঁকে আরও আত্মনির্ভর ও সংবেদনশীল করে তুলেছিল। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি দেন অনন্যা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় (University of Oxford) থেকে অর্থনীতি ও ম্যানেজমেন্ট নিয়ে তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি সঙ্গীতচর্চাও থামেনি। কলেজে পড়াকালীন রাতের বেলায় পানশালায় গান গাইতে যেতেন তিনি। সেখানেই পপ সঙ্গীতের প্রতি তাঁর আলাদা টান তৈরি হয়। ফিলাডেলফিয়ার একটি ছোট স্টুডিও রুমে নিজের প্রথম গান রেকর্ড করেছিলেন অনন্যা, যা ২০১৭ সালে মুক্তি পায়।

ব্যবসায়িক মেধার পরিচয়ও খুব অল্প বয়সেই দেন অনন্যা। মাত্র ১৭ বছর বয়সে একটি ছোট অর্থলগ্নি সংস্থা গড়ে তোলেন। বিড়লা পরিবারের উত্তরাধিকার বহন করলেও তিনি কখনওই শুধুমাত্র পারিবারিক পরিচয়ের উপর নির্ভর করেননি।
একই সঙ্গে, নিজেকে প্রমাণ করার তাগিদ থেকেই ব্যবসা ও সঙ্গীত, দু’টি ক্ষেত্রেই সমানভাবে পরিশ্রম করে গিয়েছেন। গান গাওয়ার পাশাপাশি গান লেখা ও নিজের গানে সুর দেওয়ার কাজেও সক্রিয় ছিলেন অনন্যা। বিদেশে থাকার সময় গিটার বাজানো শেখেন তিনি। তাঁর গানে আধুনিক পপের সঙ্গে ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আত্মপরিচয়ের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে।

২০২০ সালের অক্টোবরে আমেরিকায় একটি রেস্তোরাঁয় হেনস্থার শিকার হওয়ার ঘটনা তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রে এনে দেয়। সমাজমাধ্যমে তিনি লিখেছিলেন, ‘জাতিবৈষম্য এমন অসহনীয় জায়গায় পৌঁছেছে যে, ভারতীয় হওয়ার কারণে আমাকে ও আমার পরিবারকে রেস্তোরাঁ থেকে বের করে দেওয়া হয়।’ এই ঘটনার পর জাতিবৈষম্য নিয়ে তাঁর স্পষ্ট অবস্থান অনেকের নজর কেড়েছিল। সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, ২০২১ সালের টোকিয়ো অলিম্পিক্সে ভারতের ক্রীড়াবিদদের জন্য তৈরি গান ‘হিন্দুস্থানি ওয়ে (Hindustani Way)’ -এ সুর দিয়েছিলেন এ আর রহমান (A. R. Rahman), আর সেই গান গেয়েছিলেন অনন্যা বিড়লা। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার এই সুযোগ তাঁর সঙ্গীতজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে। স্নাতক হওয়ার পর ফের মুম্বইয়ে ফিরে আসেন অনন্যা। কোভিড অতিমারির সময় মহারাষ্ট্রের মহিলাদের জন্য নানা সুবিধা পৌঁছে দিতে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা গড়ে তোলেন তিনি। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার এই দৃষ্টিভঙ্গি অনন্যাকে কেবল একজন শিল্পী বা ব্যবসায়ী হিসেবেই নয়, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবেও তুলে ধরে।

২০২২ সালে ওটিটি পর্দায় তাঁর অভিনয় যাত্রা শুরু হয়। অজয় দেবগন (Ajay Devgn) অভিনীত ওয়েব সিরিজ ‘রুদ্র: দ্য এজ অফ ডার্কনেস (Rudra: The Edge of Darkness)’ -এর একটি গানের দৃশ্যে দেখা যায় তাঁকে। এরপর ২০২৩ সালে কুণাল কোহলি (Kunal Kohli) পরিচালিত থ্রিলার ছবি ‘শ্লোক: দ্য দেশি শার্লক (Shlok: The Desi Sherlock)’ -এর মাধ্যমে পাকাপাকি ভাবে অভিনয়ে হাতেখড়ি হয় অনন্যার। যদিও তার পর আর কোনও ছবিতে তাঁকে দেখা যায়নি। ২০২৪ সালের মে মাসে সমাজমাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন অনন্যা। তিনি জানান, গান ও ব্যবসা, দু’টি দিক একসঙ্গে সামলানো তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে উঠছে। তাই সঙ্গীতজগৎ থেকে সরে এসে সম্পূর্ণভাবে ব্যবসার দিকেই তিনি মনোযোগ দিতে চান। এই সিদ্ধান্ত অনেক অনুরাগীকেই হতাশ করলেও, তাঁর আত্মবিশ্বাসী অবস্থান আবারও স্পষ্ট করে দেয় নিজের পথ নিজেই বেছে নেওয়ার মানসিকতা।
বলি অভিনেত্রী অনন্যা পাণ্ডে -এর (Ananya Panday) সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বও বলিপাড়ায় চর্চার বিষয়। ২০২৫ সালে অনন্যা পাণ্ডের জন্মদিনে অনন্যা বিড়লা পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের ল্যাম্বর্ঘিনি উপহার দিয়েছিলেন, এমন গুঞ্জনও শোনা যায় ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহলে। তবে, সৌন্দর্য, ফ্যাশন ও ব্যক্তিত্ব, সমস্ত মিলিয়ে অনন্যা বিড়লা আজকের প্রজন্মের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম। সমাজমাধ্যমেও তাঁর জনপ্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। ইতিমধ্যেই ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুগামীর সংখ্যা ১০ লক্ষের গণ্ডি পেরিয়েছে। ব্যবসা, সঙ্গীত বা সমাজসেবা, যে ক্ষেত্রেই হোক না কেন, অনন্যা বিড়লা প্রমাণ করেছেন, উত্তরাধিকার নয়, নিজের স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রকৃত পরিচয় গড়ে তোলে।
সব ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Ananya Panday wedding menu | অনন্যা পাণ্ডের বিয়ে নিয়ে বাড়ছে জল্পনা, মেয়ের ভবিষ্যৎ বিয়ের মেনু আগেভাগেই ঠিক করে ফেললেন মা ভাবনা পাণ্ডে




