শোভনা মাইতি ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, নতুন দিল্লি : মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে অনন্য অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। নাসার ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রখ্যাত নভশ্চর সুনীতা উইলিয়ামস (Sunita Williams) আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণ করলেন। দীর্ঘ ২৭ বছরের কর্মজীবন শেষে গত ২৭ ডিসেম্বর অবসর নেন ৬০ বছর বয়সি এই মার্কিন মহাকাশচারী। মঙ্গলবার একটি বিবৃতির মাধ্যমে এই খবর প্রকাশ করেছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। মহাকাশে টানা ৬০৮ দিন কাটিয়ে, একাধিক বিশ্বরেকর্ড গড়ে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে সুনীতার বিদায় মহাকাশ বিজ্ঞানীদের কাছে আবেগঘন মুহূর্ত হয়ে উঠেছে।
২০০৬ সালের ডিসেম্বরে সুনীতা উইলিয়ামসের প্রথম মহাকাশযাত্রা। ডিসকভারি (Discovery) স্পেস শাটলে চড়ে তিনি পাড়ি দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের উদ্দেশে। নাসার এক্সপিডিশন ১৪/১৫ (Expedition 14/15)-এ ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সেই অভিযানের মধ্যেই চারটি স্পেসওয়াক সম্পন্ন করে বিশ্বরেকর্ড গড়েন সুনীতা। প্রথম অভিযানে তাঁর দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস নাসার উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের নজর কাড়ে। এরপর ২০১২ সালে দ্বিতীয় বার তিনি মহাকাশে যান। ১২৭ দিনের এই অভিযানে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (International Space Station- ISS) -এর কমান্ডারের দায়িত্ব সামলান সুনীতা উইলিয়ামস। এই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি ইতিহাসে জায়গা করে নেন। একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মহিলা নভশ্চরের নেতৃত্বে আইএসএস পরিচালনা বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছিল। বৈজ্ঞানিক গবেষণা, প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং মহাকাশচারীদের সুরক্ষা, সমস্ত দিকেই তাঁর নেতৃত্ব ছিল প্রশংসনীয়।
সবচেয়ে আলোচিত ও নাটকীয় অধ্যায়টি আসে ২০২৪ সালে। তৃতীয় এবং শেষ মহাকাশ অভিযানে সুনীতা যান বোয়িং স্টারলাইনার (Boeing Starliner) মহাকাশযানে চড়ে। সঙ্গী ছিলেন আর এক মার্কিন মহাকাশচারী বুচ উইলমোর (Butch Wilmore)। পরিকল্পনা অনুযায়ী এই অভিযান ছিল মাত্র ১০ দিনের। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৃথিবীতে ফেরা সম্ভব হয়নি তাঁদের। ফলে প্রায় ১০ মাস আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে আটকে থাকতে হয় দু’জনকে। অবশেষে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে, ২৮৬ দিন পর নিরাপদে পৃথিবীতে ফেরেন তাঁরা। এই দীর্ঘ অনিচ্ছাকৃত অবস্থান সুনীতার মানসিক দৃঢ়তা ও পেশাদারিত্বের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ কর্মজীবনে সুনীতা উইলিয়ামস মোট তিনটি আইএসএস অভিযান সম্পন্ন করেছেন। নাসার আধিকারিক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান (Jared Isaacman) সুনীতার অবসর প্রসঙ্গে বলেন, ‘মানববাহী মহাকাশ অভিযানে সুনীতা উইলিয়ামস একজন অন্যতম পথিকৃৎ। মহাকাশ স্টেশনে সুদক্ষ নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে বাণিজ্যিক অভিযানের পথও প্রশস্ত করেছেন তিনি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতিতে তাঁর অবদান দৃষ্টান্তমূলক, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বড় স্বপ্ন দেখতে এবং অসম্ভবের গণ্ডি পেরোতে অনুপ্রাণিত করবে।’ তিনি নাসা তথা সমগ্র জাতির প্রতি তাঁর একনিষ্ঠ সেবার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
শিক্ষাজীবনেও সুনীতা ছিলেন অত্যন্ত কৃতী। পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর ফ্লরিডার মেলবোর্নে অবস্থিত ফ্লরিডা ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (Florida Institute of Technology) থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এর পর যোগ দেন মার্কিন নৌসেনায় (United States Navy)। হেলিকপ্টার ও ফিক্সড-উইং পাইলট হিসেবে ৪০টিরও বেশি বিমানে তাঁর ৪,০০০ ঘণ্টারও বেশি উড়ানের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই বিপুল অভিজ্ঞতাই তাঁকে মহাকাশ অভিযানের জন্য প্রস্তুত করে তোলে। ১৯৯৮ সালে নাসায় যোগ দেওয়ার পর আর ফিরে তাকাতে হয়নি সুনীতা উইলিয়ামসকে। ২৭ বছরের কর্মজীবনে তিনি মোট ৬০৮ দিন মহাকাশে কাটিয়েছেন, যা নাসার মহাকাশচারীদের ইতিহাসে দ্বিতীয় দীর্ঘতম সময়। পাশাপাশি তিনি মোট ৬২ ঘণ্টা ৬ মিনিটের ন’টি স্পেসওয়াক সম্পন্ন করেছেন, যা যে কোনও মহিলা নভশ্চরের নিরিখে সর্বোচ্চ। মহাকাশে ম্যারাথন দৌড়োনো প্রথম মানুষ হিসেবেও সুনীতা ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন।
অবসর ঘোষণার পর নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে সুনীতা বলেন, ‘যাঁরা আমাকে চেনেন, তাঁরা জানেন যে মহাকাশ আমার অত্যন্ত প্রিয় জায়গা। মহাকাশচারী হতে পারা এবং তিন বার মহাকাশে যাওয়ার সুযোগ পাওয়াটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মান।’ সহকর্মীদের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, নাসায় ২৭ বছরের যাত্রাপথে তিনি অগণিত ভালোবাসা ও সমর্থন পেয়েছেন। উল্লেখ্য, নাসার আসন্ন আর্টেমিস-২ (Artemis-2) চন্দ্রাভিযান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে হাসতে হাসতে সুনীতা বলেন, ‘যেতে তো চাই, কিন্তু আমার স্বামী আমাকে মেরে ফেলবেন!’ তারপর সামান্য থেমে যোগ করেন, ‘এবার ঘরে ফেরার সময়। এ বার না হয় মহাকাশযাত্রার ইতিহাসে পরবর্তী প্রজন্মই তাদের জায়গা করে নিক।’ এই কথাতেই স্পষ্ট, অবসর নিলেও মহাকাশের প্রতি তাঁর ভালোবাসা অটুট। প্রসঙ্গত, সুনীতা উইলিয়ামসের অবসর যুগান্তকারী অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে দেখছে বিশ্ব। তবে তাঁর সাহস, নিষ্ঠা ও স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা আগামী প্রজন্মের মহাকাশচারীদের পথ দেখাবে, এ কথা বলাই যায়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Himachal Pradesh polyandry marriage | হিমাচলে এক স্ত্রীর একাধিক স্বামী! বছরের পর বছর ধরে আজও জীবিত এই প্রথার নেপথ্যে কোন যুক্তি কাজ করছে?




