সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ শিবপুরী : মানুষ আর পোষ্যের সম্পর্ক যে কেবল অভ্যাসের নয়, গভীর অনুভূতির, ফের একবার তা প্রমাণ করল মধ্যপ্রদেশের (Madhya Pradesh) শিবপুরী (Shivpuri) জেলার একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা। আত্মহত্যা করেছেন মালিক। আর সেই মুহূর্ত থেকে শেষযাত্রা পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্যও পাশে ছাড়েনি তার পোষ্য কুকুর। সারা রাত মরদেহ আগলে বসে থাকা থেকে শুরু করে শববাহী গাড়ির পিছু পিছু প্রায় চার কিলোমিটার পথ হাঁটা, কুকুরটির এই নিঃশর্ত আনুগত্য দেখে আবেগে ভেসেছেন গ্রামবাসী থেকে পুলিশকর্মী, সকলেই। ঘটনাটি সামনে আসে সোমবার ভোরে। শিবপুরী জেলার এক গ্রামে ৪০ বছরের জগদীশ প্রজাপতি-এর (Jagdish Prajapati) ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয় তাঁর বাড়ির অদূরে। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, রাতের কোনও এক সময় তিনি আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর দৃশ্যটি দেখা যায় তাঁর দেহ উদ্ধারের সময়। জগদীশের নিথর দেহের পাশে ঠায় বসে ছিল তাঁর পোষ্য কুকুরটি। স্থানীয়দের দাবী, সারা রাত ধরেই কুকুরটি এক জায়গায় বসে থেকে মালিকের দেহ পাহারা দিয়েছে। কেউ কাছে এলেই সে সজাগ হয়ে উঠছিল, যেন কাউকে ছুঁতে না দেয়। সকালে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছলে কুকুরটিকে সেখান থেকে সরানো অসম্ভব হয়ে ওঠে। বহু চেষ্টা করেও তাকে সরানো যায়নি বলে উল্লেখ। অবশেষে অনেক সময় নিয়ে, আদর আর শান্ত স্বরে ডেকে পুলিশ দেহটি ময়নাতদন্তে পাঠানোর প্রস্তুতি নেয়। তখনও কুকুরটি মালিকের দেহের কাছেই ছিল। স্থানীয় এক বাসিন্দার কথায়, ‘এমন দৃশ্য আমরা আগে কখনও দেখিনি। কুকুরটা যেন বুঝে গিয়েছিল, তার সবচেয়ে কাছের মানুষটি আর নেই।’
পরদিন সকালে জগদীশের দেহ যখন ময়নাতদন্তের জন্য কারেরা (Karera) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন ঘটে আরও এক আবেগঘন ঘটনা। শববাহী গাড়ি গ্রামের রাস্তা ধরে এগোতেই কুকুরটি আচমকা দৌড়ে গাড়ির পিছু নেয়। প্রথমে কেউ বিষয়টি খেয়াল না করলেও কিছু দূর যাওয়ার পর গ্রামবাসীরা দেখেন, কুকুরটি নিরন্তর গাড়ির পিছনে ছুটছে। প্রায় চার কিলোমিটার পথ সে এভাবেই হাঁটে ও দৌড়য়। রোদের তাপ, ক্লান্তি কোনও কিছুর তোয়াক্কা না করে সে যেন একটাই লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছিল, মালিকের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়া। এই দৃশ্য দেখে গাড়িতে থাকা আত্মীয়স্বজন এবং পুলিশকর্মীরাও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত পরিবারের সিদ্ধান্তে কুকুরটিকে গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। ময়নাতদন্ত-সহ সমস্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চলাকালীনও কুকুরটিকে নীরবে বসে থাকতে দেখা যায়। কারও ডাকে সে সাড়া দিচ্ছিল না, শুধু একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল মালিকের দেহের দিকে।
স্থানীয়দের দাবি, ওই সময় কুকুরটিকে জল কিংবা খাবার দিতে চাইলেও সে কিছুই গ্রহণ করেনি। মালিকের দেহ দাহের প্রস্তুতি চলাকালীনও সে এক পাশে বসে ছিল। একজন প্রবীণ গ্রামবাসীর কথায়, ‘মানুষের মধ্যেও এমন নিষ্ঠা অনেক সময় দেখা যায় না। কুকুরটা যেন নিজের সব অনুভূতি দিয়ে প্রমাণ করল, ভালবাসা কাকে বলে।’
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় ভিড় জমতে শুরু করে। অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। এমনকী অভিজ্ঞ পুলিশকর্মীরাও আবেগ সামলাতে পারেননি বলে জানা গিয়েছে। স্থানীয় থানার ইনচার্জ (Station In-Charge) কুকুরটির এই আচরণকে ‘বিরল ও অনন্য’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি কুকুরটির একটি ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেন, যেখানে দেখা যাচ্ছে, কুকুরটি কীভাবে শববাহী গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেই ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই ভাইরাল হয়েছে। বহু নেটিজেন মন্তব্য করেছেন, ‘মানুষের চেয়েও বেশি মানবিক এই পোষ্য।’
তবে আবেগঘন এই ঘটনার মাঝেও একাধিক প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে। জগদীশ প্রজাপতি কেন আত্মহত্যা করলেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনায় একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করা হয়েছে এবং তদন্ত শুরু হয়েছে। পরিবার ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে সম্ভাব্য কারণ জানার চেষ্টা চলছে। কোনও সুইসাইড নোট উদ্ধার হয়নি বলেও সূত্রের খবর। এই ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে পোষ্যদের প্রতি মানুষের দায়িত্ব এবং সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই বলছেন, পোষ্য শুধু ঘরের প্রাণী নয়, পরিবারেরই এক সদস্য। এই কুকুরটির আচরণ যেন সেই কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দিল। প্রসঙ্গত, মধ্যপ্রদেশের শিবপুরীর এই ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনার খবর নয়, তা নিঃশর্ত ভালবাসা ও আনুগত্যের এক জীবন্ত উদাহরণ। যেখানে শব্দের প্রয়োজন নেই, সেখানে নীরব উপস্থিতিই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে শক্তিশালী অনুভূতির প্রকাশ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Kanpur : ইতিহাসের শহর কানপুর




