সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : নয়া নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যেই ফের বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এল স্কুল সার্ভিস কমিশন। বুধবার সন্ধ্যায় আচমকাই ২,১০৩ জন প্রার্থীর নামের জোড়া তালিকা প্রকাশ করল স্কুল সার্ভিস কমিশন (School Service Commission বা SSC)। কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, এই তালিকাগুলি ২০১৬ সালের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত ‘ওএমআর মিসম্যাচ’ (OMR Mismatch) সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হয়েছে। তালিকা প্রকাশের পরেই শিক্ষামহল থেকে শুরু করে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
এসএসসি সূত্রে দাবি করা হয়েছে, প্রকাশিত দু’টি আলাদা তালিকার একটিতে রয়েছেন শিক্ষক পদপ্রার্থীরা এবং অন্যটিতে রয়েছেন শিক্ষাকর্মী পদে আবেদনকারীরা। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, এই সমস্ত প্রার্থীর নাম সিবিআই (Central Bureau of Investigation বা CBI) -এর ‘ওএমআর মিসম্যাচ’ সংক্রান্ত নথিতে থাকলেও ২০১৬ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তাঁদের চাকরির জন্য সুপারিশ করা হয়নি। অর্থাৎ, তাঁদের ক্ষেত্রে নিয়োগ সংক্রান্ত কোনও চূড়ান্ত সুপারিশ এসএসসি করেনি বলে দাবি কমিশনের।প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষক পদে মোট ২৫০ জন প্রার্থীর নাম রয়েছে তালিকায়। এই তালিকায় প্রত্যেক প্রার্থীর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে। কোন বিষয়ের জন্য তাঁরা আবেদন করেছিলেন, অভিভাবকের নাম, জন্মতারিখ, রোল নম্বর এবং নবম-দশম না একাদশ-দ্বাদশ কোন স্তরের জন্য আবেদন করা হয়েছিল, সেই সমস্ত তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, শিক্ষাকর্মী পদে মোট ১,৮৫৩ জনের নাম প্রকাশ করেছে এসএসসি। এই তালিকাতেও সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা গ্রুপ ‘সি’ (Group C) না গ্রুপ ‘ডি’ (Group D) পদের জন্য আবেদন করেছিলেন, তা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই তালিকা প্রকাশের পরই নতুন করে উঠে এসেছে ‘ওএমআর মিসম্যাচ’ বিতর্ক। আসলে কী এই ওএমআর মিসম্যাচ? ২০১৬ সালের নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় তদন্তের সময় সিবিআই যে তথ্য সামনে এনেছিল, তার ভিত্তিতেই এই বিষয়টি আলোচনায় আসে। অভিযোগ ছিল, পরীক্ষার্থীদের ওএমআর শিটে কারচুপি করে নম্বর বদলানো হয়েছে। পাশাপাশি র্যাঙ্কজাম্প এবং প্যানেলে নাম না থাকলেও নিয়োগ, এই তিনটি পথেই দুর্নীতি হয়েছে বলে দাবি তদন্তকারী সংস্থার। অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India) -এর একাধিক নির্দেশে সিবিআইয়ের জমা দেওয়া রিপোর্টের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেই রিপোর্ট অনুযায়ী, নবম-দশম স্তরের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মোট ৯৫২ জন প্রার্থীর ক্ষেত্রে ওএমআর মিসম্যাচের প্রমাণ মিলেছিল। তাঁদের মধ্যে ৮০৮ জন চাকরি পেয়েছিলেন এবং ১৪৪ জন চাকরি পাননি। একাদশ-দ্বাদশ স্তরের ক্ষেত্রে ওএমআর মিসম্যাচ হওয়া প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ৯০৭ জন। তাঁদের মধ্যে ৭৭২ জনকে নিয়োগ করা হয়েছিল, আর ১৩৫ জন চাকরি থেকে বঞ্চিত ছিলেন।
শুধু শিক্ষক পদেই নয়, শিক্ষাকর্মী নিয়োগেও বিপুল সংখ্যায় ওএমআর মিসম্যাচের অভিযোগ উঠেছিল। গ্রুপ ‘সি’ পদের ক্ষেত্রে সিবিআইয়ের হিসাব অনুযায়ী ৩,৪৮১ জন প্রার্থীর ওএমআর মিসম্যাচ ধরা পড়ে। তাঁদের মধ্যে ৭৮২ জন চাকরি পেয়েছিলেন, কিন্তু ২,৬৯৯ জন চাকরি পাননি। গ্রুপ ‘ডি’ পদের ক্ষেত্রে ২,৮২৩ জনের ওএমআর মিসম্যাচের তথ্য সামনে আসে, যাঁদের মধ্যে ১,৯১১ জনকে নিয়োগ করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।এই প্রেক্ষাপটেই এসএসসি-র তরফে প্রকাশিত নতুন তালিকা ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। একাংশের দাবি, যাঁদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে, তাঁদের অনেকেই এতদিন ধরে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে আসছিলেন। আবার অন্য একটি অংশের বক্তব্য, এতদিন পরে এই তালিকা প্রকাশের উদ্দেশ্য কী, তা পরিষ্কার নয়। নয়া নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যেই পুরনো তালিকা প্রকাশ হওয়ায় বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে।কমিশনের বিশেষ সূত্রে খবর ‘স্বচ্ছতা বজায় রাখতেই এই তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। যাঁদের নাম সিবিআইয়ের ওএমআর মিসম্যাচ তালিকায় ছিল, কিন্তু যাঁদের চাকরির জন্য সুপারিশ করা হয়নি, তাঁদের তথ্য জনসমক্ষে আনা হয়েছে।’ যদিও এই ব্যাখ্যায় পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন চাকরিপ্রার্থীদের একাংশ।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই তালিকা প্রকাশের ফলে ২০১৬ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে আইনি জটিলতা আরও বাড়তে পারে। কারণ, ওএমআর মিসম্যাচ থাকা সত্ত্বেও যাঁরা চাকরি পাননি, তাঁদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে কোনও আইনি দাবি ওঠে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে নয়া নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এর প্রভাব পড়বে কি না, সেদিকেও নজর রয়েছে সকলের। কিন্তু, এসএসসি-র প্রকাশিত ২,১০৩ জনের ‘ওএমআর মিসম্যাচ’ তালিকা তথ্য প্রকাশ দীর্ঘদিন ধরে চলা শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলার পুরনো ক্ষতকে ফের উসকে দিল বলেই মনে করছেন শিক্ষা ও প্রশাসনিক মহলের একাংশ।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : SSC Exam Controversy | ‘পরীক্ষার কী হবে কেউ জানে না!’ : কলকাতা হাইকোর্টে তীব্র মন্তব্য বিচারপতি অমৃতা সিনহা, নতুন SSC পরীক্ষার বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন




