Amal Chowdhury death | নিঃশব্দ প্রস্থান দূরদর্শনের মহালয়ার অসুর-এর, তালা ভেঙে উদ্ধার অমল চৌধুরীর দেহ, অভাবেই থামল এক শিল্পীর জীবনযাত্রা

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ অশোকনগর : নব্বইয়ের দশকে মহালয়ার ভোর মানেই বাঙালির ঘরে ঘরে এক আলাদা আবেশ। দূরদর্শনের পর্দায় দেবী দুর্গার আবির্ভাবের আগে যে অট্টহাসি, যে বলিষ্ঠ কণ্ঠে ‘অসুর’ -এর উপস্থিতি দর্শকদের রোমাঞ্চিত করত, সেই পরিচিত মুখটাই আজ আর নেই। দূরদর্শনের মহালয়ার অনুষ্ঠানে ‘অসুর’ চরিত্রে অমর হয়ে থাকা প্রবীণ অভিনেতা অমল চৌধুরী (Amal Chowdhury) আর নেই। বুধবার পৌষ সংক্রান্তির দিন তাঁর বাড়ির তালা ভেঙে উদ্ধার করা হয়েছে নিথর দেহ। এই খবরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে শিল্পী মহলে, একই সঙ্গে উঠে এসেছে এক নির্মম বাস্তবতার প্রশ্ন, লাইমলাইট ফুরোলেই কি শিল্পীদের এমন নিঃসঙ্গ পরিণতি অনিবার্য?

আরও পড়ুন : Rajesh Khanna birth anniversary | ৮৩ বছরে রাজেশ খান্না: সময় পেরিয়েও অমলিন বলিউডের প্রথম সুপারস্টারের জাদু

স্থানীয় সূত্রে খবর, দীর্ঘদিন ধরেই একা থাকতেন অমল চৌধুরী। প্রতিবেশীরা বেশ কিছু দিন ধরে তাঁকে দেখতে না পাওয়ায় সন্দেহ হয়। খবর দেওয়া হয় পুলিশে। এরপর পুলিশ এসে তাঁর বাড়ির দরজার তালা ভেঙে ভিতরে ঢুকে অভিনেতার দেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিক ভাবে অনুমান করা হচ্ছে, বেশ কিছু দিন আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে দেহ ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে। যদিও স্থানীয়দের ধারণা, দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা ও আর্থিক অনটনের চাপেই ধীরে ধীরে তিনি ভেঙে পড়েছিলেন।অমল চৌধুরীর নাম শুনলেই আজও বহু দর্শকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে মহালয়ার সেই পরিচিত দৃশ্য। দেবী দুর্গার সঙ্গে অসুরের দ্বন্দ্বে তাঁর উপস্থিতি চরিত্রটিকে আরও জীবন্ত করে তুলত। শুধু ‘অসুর’ নয়, মহালয়ার অনুষ্ঠানে তিনি যমরাজ, সেনাপতি-সহ একাধিক চরিত্রে অভিনয় করেছেন। দূরদর্শনের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বাংলা ছবিতেও কাজ করেছিলেন তিনি। যদিও সিনেমার ঝলমলে জগতে নিজেকে স্থায়ী ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি।

জীবনের শুরুতে তাঁর স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। কিন্তু শিল্পের প্রতি টান, বিশেষ করে মহালয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আবেগই তাঁকে নিয়ে আসে অভিনয়ের জগতে। মঞ্চ, টেলিভিশন সবখানেই নিজের মতো করে কাজ করেছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর আর একটি বড় পরিচয় ছিল একজন চিত্রশিল্পী হিসেবে। ছবি আঁকতে ভালোবাসতেন অমল চৌধুরী। বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার শিশুকে তিনি আঁকার হাতেখড়ি দিয়েছেন। অনেক ছাত্রছাত্রীই আজ প্রতিষ্ঠিত শিল্পী, যারা এখনও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন তাঁদের প্রিয় শিক্ষককে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাজ কমেছে, কমেছে আয়ও। একসময় তিনি মহালয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন, ধীরে ধীরে তিনি হারিয়ে যেতে থাকেন আলোচনার বাইরে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক সমস্যাও পিছু ছাড়েনি। কয়েক মাস আগে একটি দুর্ঘটনায় তাঁর পায়ে চিড় ধরে। ঠিকমতো চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি আর্থিক সমস্যার কারণে। সেই সময় দুর্গাপুজোর ঠিক আগে সংবাদমাধ্যমের সামনে কাতর আবেদন জানিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, ‘দিদি যদি একটু সাহায্য করেন।’ চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ছিল প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ টাকা। সেই অর্থ আর জোগাড় হয়নি।

শিল্পীমহলের একাংশ চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত পর্যাপ্ত সাহায্য পৌঁছয়নি তাঁর কাছে। ধীরে ধীরে অসুস্থতা বাড়তে থাকে। একাকিত্ব, শারীরিক যন্ত্রণা আর আর্থিক অনটনের বোঝা বয়ে নিয়ে শেষ পর্যন্ত না-ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন অমল চৌধুরী। তাঁর মৃত্যুর খবরে অনেকেই বলছেন, একসময় যাঁরা বাঙালির উৎসবের আবহ গড়ে তুলেছিলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের কীভাবে ভুলে যাওয়া হয়, এই ঘটনা তারই নির্মম উদাহরণ। সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যেই শোকপ্রকাশ শুরু হয়েছে। বহু মানুষ লিখছেন, মহালয়ার ভোরে তাঁর গর্জন ছাড়া দেবী বন্দনা যেন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কেউ কেউ আবার প্রশ্ন তুলছেন, একজন শিল্পী যিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আনন্দ দিয়েছেন, তাঁর শেষ জীবন যদি এমন অভাবে কাটে, তবে আমাদের সমাজের দায় কোথায়?

সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে যুক্ত মহলের মতে, এই ঘটনা ফের প্রমাণ করল শিল্পীদের জন্য কোনও স্থায়ী সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো কতটা জরুরি। যতদিন আলো থাকে, ততদিন সম্মান তারপর ধীরে ধীরে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া। অমল চৌধুরীর মৃত্যু যেন সেই কথাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
উল্লেখ্য, তিনি নেই, কিন্তু তাঁর অট্টহাসি, তাঁর শক্তিশালী উপস্থিতি বাঙালির মহালয়ার স্মৃতিতে থেকে যাবে চিরকাল। দেবী দুর্গার আরাধনার সঙ্গে সঙ্গে অসুরের সেই পরিচিত মুখটিও থাকবে স্মৃতির ফ্রেমে। নিঃশব্দে চলে গেলেও, অমল চৌধুরী বেঁচে থাকবেন বাঙালির সংস্কৃতির ইতিহাসে।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Novelist Kamal Chakraborty Demise : চলে গেলেন সাহিত্যিক কমল চক্রবর্তী

Sasraya News
Author: Sasraya News