সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : নিছক একটি বইমেলা নয়, বাঙালির কাছে এ যেন ঘরে ফেরার উৎসব। শীতের কলকাতায় ফের একবার সেই আবেগই ছড়িয়ে পড়তে চলেছে, যখন দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা সাহিত্যিকরা তাঁদের শিকড়, স্মৃতি ও ভাষার টানে হাজির হচ্ছেন আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায়। ২২ জানুয়ারি শুরু হতে চলা এই বইমেলা শুধু বই কেনাবেচার জায়গা নয়, তা বিশ্বসাহিত্যে বাঙালির অবদান, চিন্তা ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক বৃহৎ প্রদর্শনী হয়ে উঠতে চলেছে বলে মনে করছেন সাহিত্যপ্রেমীরা। এ বছরের বইমেলার অন্যতম আকর্ষণ কলকাতা সাহিত্য উৎসব ও কলকাতা লিটারারি মিট (Kolkata Literary Meet)। এই দুই সাহিত্য উৎসবের মঞ্চেই শীতের কলকাতায় ফিরছেন অমিতাভ ঘোষ (Amitav Ghosh) এবং বুকারজয়ী সাহিত্যিক কিরণ দেশাই (Kiran Desai)। অনেকের কাছেই এই ফেরা শুধুই অতিথি হয়ে আসা নয়, বরং এক গভীর আত্মিক প্রত্যাবর্তন। অমিতাভ ঘোষের এখনও দক্ষিণ কলকাতায় বাড়ি রয়েছে, আর কিরণ দেশাইয়ের মা প্রখ্যাত সাহিত্যিক অনিতা দেশাই (Anita Desai) বাঙালি বাবার কন্যা। সেই অর্থে কিরণের এই আসা যেন শিকড়ের কাছে ফিরে আসা।
২৪ ও ২৫ জানুয়ারি বইমেলার মাঠে অনুষ্ঠিত কলকাতা সাহিত্য উৎসবে উপস্থিত থাকবেন অমিতাভ ও কিরণ, এই খবরেই বইপ্রেমীদের উত্তেজনা তুঙ্গে। উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন অমিতাভ ঘোষ নিজেই। অন্য দিকে, সল্টলেকের বইমেলার সঙ্গে সমান্তরালে ২২ থেকে ২৬ জানুয়ারি আলিপুর জেল মিউজ়িয়মের প্রাঙ্গণে বসছে কলকাতা লিটারারি মিট। সেখানে অমিতাভ তাঁর সদ্য রচিত ডিসটোপিয়ান উপন্যাস ‘গোস্ট-আই’ নিয়ে আলোচনা করবেন। অনাগত অথচ ভীষণ চেনা এক কালপর্বের ছবি এঁকে দেওয়া এই উপন্যাস ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক সাহিত্য মহলে আলোচনার কেন্দ্রে।
কলকাতা লিটারারি মিটের মঞ্চে কিরণ দেশাই আলোচনা করবেন তাঁর বুকারের জন্য মনোনীত উপন্যাস ‘দ্য লোনলিনেস অব সোনিয়া অ্যান্ড সানি’ নিয়ে। দীর্ঘ এক যুগ পরে এই সাহিত্য মঞ্চে ফিরছেন আর এক কলকাতা-কন্যা ঝুম্পা লাহিড়ী (Jhumpa Lahiri)। তাঁর উপস্থিতি নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক সাহিত্য মানচিত্রে কলকাতার অবস্থানকে আরও দৃঢ় করবে বলে মনে করছেন আয়োজকেরা। উল্লেখ্য, এই শীতে শহরের অতিথি সাহিত্যিকদের তালিকায় বিশেষ জায়গা করে নিয়েছেন বুকার আন্তর্জাতিক পুরস্কারজয়ী বানু মুশতাক (Banu Mushtaq)। ২২ জানুয়ারি বইমেলার উদ্বোধনী দিনেই বিকেলে তিনি উপস্থিত থাকবেন কলকাতা লিটারারি মিটে। পরের দিন, ২৩ জানুয়ারি দুপুরে তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্ত ছোটগল্প সংকলন ‘হার্ট ল্যাম্প’ নিয়ে আলোচনা করবেন। তাঁর লেখার মানবিক আবেদন ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে পাঠক ও গবেষকদের মধ্যে আগ্রহ তুঙ্গে।
এ বার বইমেলার মাঠে কলকাতা সাহিত্য উৎসবের দায়িত্বে রয়েছেন কলকাতা লিটারারি মিটের প্রধান আয়োজক মালবিকা বন্দ্যোপাধ্যায় (Malabika Banerjee)। তিনি জানিয়েছেন, ‘কলকাতা সাহিত্য উৎসবে এ বার নানা ভাবে বিশ্বসাহিত্যে বাংলার অবদান মেলে ধরা হবে’। সেই লক্ষ্যেই বাদল সরকার (Badal Sircar), ঋত্বিক ঘটক (Ritwik Ghatak), মহাশ্বেতা দেবী (Mahasweta Devi) এবং গুরু দত্ত (Guru Dutt)-এর শতবর্ষ উদ্যাপন করা হবে। পাশাপাশি মহাশ্বেতা দেবী, সলিল চৌধুরী (Salil Chowdhury) ও ভূপেন হাজরিকা-এর (Bhupen Hazarika) শতবর্ষের স্মৃতিও ছায়া ফেলবে বইমেলার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। উল্লেখ্য, কলকাতা সাহিত্য উৎসবে উপস্থিত থাকবেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় (Shirshendu Mukhopadhyay), অরুণাভ সিংহ (Arunava Sinha), দেবদত্ত পট্টনায়ক (Devdutt Pattanaik) -এর মতো বিশিষ্ট লেখকরাও। ২৫ জানুয়ারি উত্তমকুমার (Uttam Kumar)-এর শতবর্ষ স্মরণে বিশেষ সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এর আগের দিন, ২৪ জানুয়ারি সাহিত্য উৎসব উপলক্ষে বইমেলার মাঠে শোনা যাবে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সেতারবাদক নিশাত খানের (Nishat Khan) সুর।
২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া বইমেলা নিয়ে আয়োজক পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডের পক্ষ থেকে ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায় (Tridibkumar Chattopadhyay) ও সুধাংশুশেখর দে (Sudhangshusekhar De) জানিয়েছেন, এ বার বইমেলার স্থাপত্যেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মোট ন’টি তোরণের মধ্যে দু’টি তোরণে থাকবে থিম দেশ আর্জেন্টিনার স্থাপত্যের ছোঁয়া। প্রফুল্ল রায় (Prafulla Roy) ও প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের (Pratul Mukhopadhyay) নামে থাকবে দু’টি তোরণ। শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের (Shailajananda Mukhopadhyay) জন্মের ১২৫ বছর উপলক্ষে তৈরি হচ্ছে একটি বিশেষ তোরণ। প্রয়াত কবি রাহুল পুরকায়স্থের (Rahul Purkayastha) নামে উৎসর্গ করা হচ্ছে লিটল ম্যাগাজ়িন মণ্ডপ। পাশাপাশি, শিল্পী ময়ূখ চৌধুরীর (Mayukh Chowdhury) নামে হবে বইমেলার শিশু মণ্ডপ, যেখানে আগামী প্রজন্মের পাঠকদের বইয়ের সঙ্গে আলাপ করানোর নানা উদ্যোগ থাকবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এ বছরের কলকাতা বইমেলা হয়ে উঠতে চলেছে এক বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। এখানে যেমন থাকবে বিশ্বসাহিত্যে বাঙালির অবদান তুলে ধরার প্রয়াস, তেমনই থাকবে শিকড়ের টানে ঘরে ফেরার আবেগ। বইমেলার এই মঞ্চেই আবারও প্রমাণিত হতে চলেছে, বাংলা সাহিত্য শুধু আঞ্চলিক নয়, বিশ্বমানচিত্রে তার স্বতন্ত্র ও উজ্জ্বল স্বাক্ষর রয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : আত্মপ্রকাশ করল ভারতীয়ম্ সাহিত্যপত্রের মাসিক সংখ্যা




