সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ পাটনা : বিহারের (Bihar) নওয়াদা (Nawada) জেলায় ফের কুসংস্কারের ভয়াবহ মুখ। একটি শিশুর অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে ‘ডাইনি’ অপবাদে একই পরিবারের তিন জন মহিলাকে প্রকাশ্যে গণপিটুনির অভিযোগ উঠল। নির্মম মারধরের জেরে মৃত্যু হল একজন মহিলার। সঙ্কটজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন আরও দুই জন। এই ঘটনায় এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, একুশ শতকে দাঁড়িয়েও কেন কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাসের বলি হতে হচ্ছে নারীদের? পুলিশ সূত্রে খবর, মৃত মহিলার নাম কিরণ দেবী (Kiran Devi)। তিনি নওয়াদা জেলার একটি গ্রামের বাসিন্দা। কিরণ দেবীর পরিবারের অভিযোগ, প্রতিবেশী এক পরিবারের শিশুটি বেশ কিছু দিন ধরে ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়ছিল। শিশুটির শারীরিক সমস্যার কারণ খুঁজতে গিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয় পরিবারটি। চিকিৎসার পর জানা যায়, শিশুটির মস্তিষ্কে জটিল সমস্যা রয়েছে। কিন্তু সেই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা মানতে রাজি হয়নি শিশুটির পরিবার। উল্টে কুসংস্কার আর গুজবের উপর ভর করে তারা দায় চাপায় কিরণ দেবী এবং তাঁর দুই আত্মীয়ার উপর।
আরও পড়ুন : extramarital love story | শ্যালিকাকে নিয়ে পালালেন জামাইবাবু, জামাইবাবুর বোনকে নিয়ে চম্পট শ্যালক
অভিযোগ, শিশুটির বাবা-মা দাবি করেন, কিরণ দেবী ও তাঁর দুই জা ‘কালাজাদু’ বা ডাইনিবিদ্যা প্রয়োগ করেই শিশুটিকে অসুস্থ করে তুলেছেন। এই অভিযোগ মুহূর্তের মধ্যে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামবাসীদের একাংশ সেই কথায় বিশ্বাস করে ফেলে। এর পরেই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নেয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ডাইনি অপবাদ দিয়ে কিরণ দেবী ও তাঁর দুই জা-কে টেনে হিঁচড়ে বাইরে এনে বেধড়ক মারধর করা হয়।পরিবারের তরফে অভিযোগ করা হয়েছে, হামলায় নেতৃত্ব দেয় মুকেশ চৌধরি (Mukesh Chaudhary), মহেন্দ্র চৌধরি (Mahendra Chaudhary), নত্রু চৌধরি (Natru Chaudhary) ও শোভা দেবী (Shobha Devi)। তাঁদের সঙ্গে আরও কয়েক জন আত্মীয়ও ছিলেন। হাতে ছিল ইট, লাঠি, রড। কিরণ দেবী এবং তাঁর দুই জা-কে নির্মম ভাবে পেটানো হয়। চিৎকার শুনে কেউ এগিয়ে আসেননি বলে অভিযোগ। এক সময় তিন জনই রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
স্থানীয়দের একাংশ পরে আহত অবস্থায় তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু ততক্ষণে অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হয়ে উঠেছিল। চিকিৎসা চলাকালীন মৃত্যু হয় কিরণ দেবীর। তাঁর দুই জা এখনও হাসপাতালে ভর্তি। চিকিৎসকদের কথায়, তাঁদের অবস্থা গুরুতর। শরীরের একাধিক জায়গায় গভীর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। কিরণ দেবীর আত্মীয় রেখা দেবী (Rekha Devi) কাঁদতে কাঁদতে জানান, ‘শিশুটির অসুস্থতার কথা আমরা পরে জানতে পারি। ওকে ডাক্তার দেখানো হয়েছিল। তখনই জানা যায়, ওর মস্তিষ্কে সমস্যা রয়েছে। কিন্তু সেই কথা কেউ শুনতে চায়নি। উল্টে আমাদের উপর দোষ চাপানো হল।’ তাঁর অভিযোগ, পুরোটাই পরিকল্পিত ভাবে করা হয়েছে। গ্রামে কিরণ দেবীর পরিবারকে একঘরে করার জন্যই এই কুৎসা ছড়ানো হয়েছিল।
এই ঘটনায় ফের সামনে এল বিহারে ডাইনি অপবাদে নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র। সরকারি ভাবে বারবার বলা হলেও, বাস্তবে গ্রামবাংলার বহু জায়গায় এখনও কুসংস্কার গভীর ভাবে শিকড় গেড়ে বসে আছে। বিশেষ করে নারীরাই এর প্রধান শিকার। কোনও অসুখ, মৃত্যু বা পারিবারিক সমস্যার জন্য দায়ী করা হয় ‘ডাইনি’ বলে দাগিয়ে দেওয়া মহিলাদের। পুলিশ সুত্রে উল্লেখ, ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। অভিযুক্তদের চিহ্নিত করা হয়েছে। কয়েক জনকে আটকও করা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। পুলিশ আধিকারিকদের বক্তব্য, ‘আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। কুসংস্কারের নামে এই ধরনের নৃশংসতা বরদাস্ত করা হবে না।’ মৃত কিরণ দেবীর পরিবারের তরফে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। প্রশাসনের একজন আধিকারিক জানিয়েছেন, এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে যাতে পরিস্থিতি আর না ঘোরে। একই সঙ্গে গ্রামবাসীদের সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। তবে স্থানীয় সমাজকর্মীদের একাংশের প্রশ্ন, শুধু পুলিশি ব্যবস্থা কি যথেষ্ট? তাঁদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলা কুসংস্কার ভাঙতে হলে লাগাতার সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন।
এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, প্রযুক্তি আর উন্নয়নের কথা যতই বলা হোক, দেশের কিছু অঞ্চলে এখনও মধ্যযুগীয় মানসিকতা বিদ্যমান। একটি শিশুর অসুস্থতার মতো মানবিক সমস্যার সমাধান খোঁজার বদলে, ডাইনি অপবাদে হত্যা, এই বাস্তবতা গোটা সমাজের জন্যই লজ্জার। কিরণ দেবীর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আর এক নির্মম অধ্যায়।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Gold Extraction from Seawater | সাগরের নোনা জলে লুকিয়ে কোটি কোটি টন সোনা, বাস্তবে মিলবে তো?




