Medical Termination of Pregnancy Act, Supreme Court of India | ‘গর্ভধারণ চালিয়ে যেতে নারীকে বাধ্য করা তাঁর দেহগত স্বাধিকারের লঙ্ঘন’ : দিল্লি হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : দিল্লি হাইকোর্ট (Delhi High Court) একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মানবাধিকার-সংবেদনশীল রায়ে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিল, কোনও নারীকে অনিচ্ছাকৃতভাবে গর্ভধারণ চালিয়ে যেতে বাধ্য করা তাঁর দেহগত স্বাধিকার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সরাসরি লঙ্ঘন। একই সঙ্গে এই ধরনের চাপ নারীর মানসিক আঘাতকে আরও তীব্র করে তোলে। আদালত জানিয়েছে, দাম্পত্য কলহের পরিস্থিতিতে কোনও নারী গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নিলে, তা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না। এই মন্তব্যের মাধ্যমে আদালত নারীস্বাধীনতা, প্রজনন অধিকার এবং মানসিক স্বাস্থ্যের প্রশ্নে এক সুদূরপ্রসারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।এই মামলায় বিচারপতি নীনা বান্সাল কৃষ্ণা (Justice Neena Bansal Krishna) একটি বিচ্ছিন্ন জীবনযাপনকারী স্ত্রীকে তাঁর স্বামীর করা ফৌজদারি মামলা থেকে অব্যাহতি দেন। অভিযোগ ছিল, ওই স্ত্রী চিকিৎসাগতভাবে ১৪ সপ্তাহের ভ্রূণ নষ্ট করিয়ে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩১২ ধারায় (IPC Section 312) অপরাধ করেছেন। তবে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, এই ঘটনায় ওই ধারায় কোনও অপরাধ সংঘটিত হয়নি।

আরও পড়ুন : Banu Mushtaq speech, Booker Prize winner at book festival | শোনার শিক্ষা থেকে সহমর্মিতার পাঠ, কেরালা অ্যাসেম্বলি আন্তর্জাতিক বইমেলায় বুকারজয়ী বানু মুস্তাকের বক্তব্য

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘পছন্দের স্বাধীনতা ব্যক্তিগত স্বাধিকার বা পার্সোনাল অটোনমির (personal autonomy) অবিচ্ছেদ্য অংশ। একজন নারীর নিজের প্রজনন নিয়ন্ত্রণের অধিকার মৌলিক মানবিক প্রয়োজন এবং সাংবিধানিক অধিকার হিসেবেই স্বীকৃত।’ বিচারপতির মতে, কোনও নারীর শরীর ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাঁর নিজেরই, সেখানে স্বামীর অনুমতি বা সামাজিক চাপ প্রাধান্য পেতে পারে না। এই রায়ে আদালত জানিয়েছে, মেডিক্যাল টার্মিনেশন অফ প্রেগন্যান্সি আইন (Medical Termination of Pregnancy Act) অনুযায়ী গর্ভপাতের ক্ষেত্রে কোনও নারীর স্বামীর অনুমতির প্রয়োজন নেই। আদালতের ভাষায়, এই আইনের ‘সোনালি সুতো’ বা মূল ভাবনা হল, নারীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গুরুতর আঘাত (grave injury) রোধ করা। বিচারপতি মন্তব্য করেন, ‘যদি কোনও নারী গর্ভধারণ চালিয়ে যেতে না চান, তাহলে তাঁকে বাধ্য করা তাঁর দেহগত স্বাধিকারের লঙ্ঘন এবং তা তাঁর মানসিক আঘাতকে আরও বাড়িয়ে দেয়, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।’

আদালত আরও জানিয়েছে, যখন দেশের শীর্ষ আদালত বা সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India) একাধিক রায়ে দাম্পত্য কলহের পরিস্থিতিতে নারীর গর্ভপাতের স্বাধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে, এবং এমটিপি আইন ও সংশ্লিষ্ট নিয়মাবলি সেই অধিকারকে আইনি ভিত্তি দিয়েছে, তখন এই ধরনের সিদ্ধান্তকে অপরাধ বলা যায় না। বিচারপতির মতে, এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩১২ ধারার প্রয়োগ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এই মামলায় স্বামীর পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, গর্ভপাতের সময় দম্পতি একসঙ্গেই বসবাস করছিলেন, ফলে তাঁদের মধ্যে কোনও দাম্পত্য কলহ ছিল না। সেই কারণে এমটিপি আইনের সুবিধা এখানে প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়। কিন্তু আদালত এই যুক্তি খারিজ করে দেয়। বিচারপতির স্পষ্ট বক্তব্য, ‘দাম্পত্য কলহ’ শব্দটির অর্থকে এত সংকীর্ণ ভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না যে, তা কেবলমাত্র বিচ্ছেদ বা আইনি মামলার পরেই অস্তিত্বশীল হবে। বাস্তবে একসঙ্গে থাকলেও মানসিক দূরত্ব, অশান্তি ও সম্পর্কের ভাঙন থাকতে পারে, যা নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গভীর প্রভাব ফেলে।

রায়ে সমাজের বাস্তব চিত্রও তুলে ধরেছে আদালত। বিচারপতি নীনা বান্সাল কৃষ্ণা বলেন, ‘এই পুরুষতান্ত্রিক বিশ্বের কঠোর বাস্তবতা হল, অনাকাঙ্ক্ষিত বা দুর্ঘটনাজনিত গর্ভধারণের ক্ষেত্রে পুরুষ সব সময় দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসে না। বহু ক্ষেত্রেই নারীকে একাই সেই বোঝা বহন করতে হয়।’ আদালতের মতে, এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে কোনও নারীর উপর মাতৃত্ব চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না। এই রায় নারী-স্বাধীনতা ও প্রজনন অধিকারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বার্তা। আদালত কার্যত জানিয়ে দিল, নারীর শরীর কোনও সামাজিক বা বৈবাহিক চুক্তির সম্পত্তি নয়। তাঁর শরীর, তাঁর মন এবং তাঁর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার একান্তভাবেই তাঁর নিজের। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, এই রায় ভবিষ্যতে গর্ভপাত সংক্রান্ত আইনি বিতর্কে এক শক্তিশালী দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে।

আইনজ্ঞদের মতে, দিল্লি হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণ নারী অধিকার আন্দোলনের ক্ষেত্রে এক বড় অগ্রগতি। এটি প্রমাণ করে, আদালত ধীরে ধীরে নারীর মানসিক স্বাস্থ্য, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং সামাজিক বাস্তবতার দিকে আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে এই রায় সমাজকে এই নির্দেশ দেয় যে, মাতৃত্ব কোনও বাধ্যবাধকতা নয়, তা একটি সচেতন ও স্বেচ্ছাপ্রসূত সিদ্ধান্ত হওয়াই শ্রেয়।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Dilip Ghosh | ‘মাঠজুড়ে খেলব, দল চাইলে লড়ব’ : সল্টলেকে আক্রমণাত্মক দিলীপ ঘোষ

Sasraya News
Author: Sasraya News