সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা/বাঁকুড়া: দূরত্ব মাত্র ১৮০ কিলোমিটার, সময়ের ব্যবধান আধঘণ্টা। কিন্তু এই অল্প সময়ের ব্যবধানেই মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে কার্যত নির্বাচনী যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। সল্টলেকে বিজেপির রাজ্য দফতরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) একের পর এক অভিযোগে তুলোধনা করলেন তৃণমূল সরকারকে। ঠিক ৩০ মিনিট পর বাঁকুড়ার বড়জোড়ার সভামঞ্চ থেকে সেই অভিযোগগুলির নাম ধরে ধরে পাল্টা জবাব দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। ভাষা, ভঙ্গি ও ব্যঙ্গ সব মিলিয়ে স্পষ্ট হয়ে গেল, বছরের শেষে নতুন বছরে বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখেই দুই শিবির পুরোপুরি রণংদেহি মেজাজে নেমেছে।
সল্টলেকের সাংবাদিক বৈঠকে শাহ পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ, জমি না দেওয়া, দুর্নীতি, তোষণ এবং ভোটের অঙ্ক এই পাঁচটি বিষয়ে সরাসরি আক্রমণ করেন মমতার সরকারকে। তাঁর বক্তব্য শেষ হতে না হতেই তৃণমূল শিবির থেকে শুরু হয় পাল্টা প্রতিক্রিয়া। তবে সব কিছুর চূড়ান্ত উত্তর আসে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর কণ্ঠে। বাঁকুড়ার সভায় মমতা স্পষ্ট করে দেন, শাহ কলকাতায় নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াতে পারছেন তৃণমূলের ‘সৌজন্যের রাজনীতি’র জন্যই। না হলে, তাঁর কথায়, ‘হোটেল থেকে এক পা-ও বেরোতে পারতেন না, তালকুটিরে বসে থাকতে হত।’ উল্লেখ্য, এ বার কলকাতা সফরে এসে অমিত শাহ নিউটাউনের ইকো পার্ক সংলগ্ন একটি হোটেলেই অবস্থান করছেন। অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে শাহ দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত দিয়ে বেআইনি অনুপ্রবেশ শুধু রাজ্যের নয়, গোটা দেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন। তাঁর মতে, এখানে শক্ত সরকার না থাকায় এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আসছে না। মমতা পাল্টা প্রশ্ন তুলে বলেন, অনুপ্রবেশ কি শুধু বাংলায় হয়? কাশ্মীরে অনুপ্রবেশ হয় না? দিল্লিতে বিস্ফোরণ ঘটে না? তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ সাকেত গোখলে (Saket Gokhale) আরটিআই করে যে তথ্য পেয়েছেন, তার উল্লেখ করে মমতার দাবি, ১৪০ কোটি আধার কার্ডের মধ্যে মাত্র ১১ হাজার অনুপ্রবেশকারীর নাম উঠে এসেছে, যা সংখ্যায় নগণ্য।
জমি প্রসঙ্গে শাহ অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় পরিকাঠামো প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গ সরকার জমি দিচ্ছে না বলেই উন্নয়ন আটকে যাচ্ছে। তামিলনাড়ু, তেলঙ্গানা বা উত্তরপ্রদেশে সমস্যা হয়নি, কিন্তু বাংলায় কেন? জবাবে মমতা নাম না করে শাহকে ‘দুঃশাসনবাবু’ আখ্যা দিয়ে বলেন, জমি না দিলে তারকেশ্বর- বাঁকুড়া রেলপথ হল কী করে? অন্ডাল বিমানবন্দরের জমি কে দিয়েছে? ইসিএল কী ভাবে কাজ করছে? তাঁর কটাক্ষ, ‘মিথ্যা বলারও একটা সীমা থাকে।’ একই সঙ্গে তিনি জানান, বিএসএফের বিরুদ্ধে নন তিনি, তবে আগে দেওয়া জমিতে কাজ শেষ না হলে নতুন জমি দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সবচেয়ে তীব্র সংঘাত হয় দুর্নীতি প্রসঙ্গে। শাহ একগুচ্ছ মামলার নাম করে তৃণমূলের একাধিক নেতা-মন্ত্রীকে কাঠগড়ায় তোলেন। পার্থ চট্টোপাধ্যায় (Partha Chatterjee), জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক (Jyotipriya Mallick), অনুব্রত মণ্ডল (Anubrata Mondal), মানিক ভট্টাচার্য (Manik Bhattacharya), কুন্তল ঘোষ (Kuntal Ghosh) নামের তালিকা পড়ে শোনান তিনি। পাশাপাশি ‘ভাইপো রাজনীতি’র অভিযোগ তুলে বলেন, বাংলায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, একজনই সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। মমতার জবাব ছিল আরও ধারালো। তিনি বলেন, তাঁদের দলের কেউ দুর্নীতি করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিক কেন্দ্র। কিন্তু বিজেপির বিরুদ্ধে খুন-ধর্ষণের অভিযোগ থাকা নেতাদের কেন ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে? সেই সঙ্গে পাল্টা ‘ভাইপো’ খোঁচায় মমতা টেনে আনেন অমিত শাহের পুত্র জয় শাহকে (Jay Shah)। তাঁর প্রশ্ন, পরিবারতন্ত্রের বিরোধিতা করলে শাহের ছেলে কীভাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (International Cricket Council) চেয়ারম্যান হলেন? সেখান থেকে কোটি কোটি টাকা উপার্জনের সুযোগ পাচ্ছেন না কি?
তোষণের রাজনীতি নিয়ে শাহের অভিযোগ ছিল, দীর্ঘদিন তোষণ করে এখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে তৃণমূল। মমতার উত্তর, তিনি কোনও বিশেষ ধর্মের জন্য নয়, সব ধর্মের মানুষের জন্য কাজ করেন। মাতঙ্গিনী হাজরার মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীকেও যখন ভুলভাবে চিহ্নিত করা হয়, তখন বিজেপির মানসিকতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে বলে দাবি তাঁর। ভোটের অঙ্কে শাহ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানান, ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সরকার গড়বে। ২০১৪ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ভোটের শতাংশ তুলে ধরে তিনি বলেন, বিজেপির উত্থান অব্যাহত। মমতার ব্যঙ্গাত্মক জবাব, আগের বার ‘দুশো পার’ বলেও বিজেপি ব্যর্থ হয়েছে। এ বার দুই-তৃতীয়াংশের স্বপ্ন দেখছে। তাঁর কটাক্ষ, ‘আগের বার কচু পেয়েছিলে, এ বার ঘেঁচু পাবে।’ উল্লেখ্য যে, মঙ্গলবারের দিনটি স্পষ্ট করে দিল ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজ্য রাজনীতি এখন সম্পূর্ণ মেরুকৃত। শাহের আক্রমণ ও মমতার পাল্টা জবাব শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং একে অপরকে কোণঠাসা করার কৌশল। এখন নজর, সফরের দ্বিতীয় দিনে অমিত শাহ মমতার এই তীব্র আক্রমণের কী পাল্টা দেন।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee voter list controversy | ভোটার তালিকা নিয়ে কমিশনের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মমতা, এআই কারচুপির আশঙ্কা




