শোভনা মাইতি, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ সাশ্রয় নিউজ : ভারতের মাটিতে ইতিহাস আবারও পুনরাবৃত্তি করল, তবে এবার নায়ক নয়, নায়িকা। এক যুগ আগে ২০১১ সালে যেখানে মহেন্দ্র সিং ধোনির ছক্কায় বিশ্বকাপ উঠেছিল ভারতের হাতে, ২০২৫ সালে সেই মুম্বইয়ের ডিওয়াই পাটিল স্টেডিয়ামেই মেয়েরা লিখল নতুন ইতিহাস। ফাইনালের দিন সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশে ছুটল কনফেটি, গ্যালারিতে উচ্ছ্বাসের ঢেউ, আর ভারতীয় মহিলা দলের হাতে উঠল একদিনের বিশ্বকাপ ট্রফি।
২০১৭ সালে লর্ডসে হার, চোখে জল আর ব্যথায় ভরা সেই সন্ধ্যার পর এই দিনটার অপেক্ষায় ছিল গোটা দেশ। হরমনপ্রীত কৌর (Harmanpreet Kaur), স্মৃতি মান্ধানা (Smriti Mandhana), শেফালি ভার্মা (Shafali Verma), দীপ্তি শর্মা (Deepti Sharma) তাঁদের লড়াই, দৃঢ়তা, আর আগুনে মনোভাবের ফলেই এদিন ভারত পেল প্রাপ্য সম্মান। গ্রুপ লিগে একের পর এক হারের হ্যাটট্রিকের পরও দলের কেউ হাল ছাড়েননি। অধিনায়ক হরমনপ্রীতের ভাষায়, “আমরা জানতাম একটা ম্যাচ আমাদের ঘুরিয়ে দেবে। শুধু বিশ্বাসটা ধরে রাখতে হতো।” সেই বিশ্বাসের প্রতিদানই এই ফাইনালের জয়।
অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে বিশ্বরেকর্ড গড়ে ভারত পৌঁছেছিল ফাইনালে। আর দক্ষিণ আফ্রিকার (South Africa) বিরুদ্ধে শিরোপা লড়াইয়ে ভারতীয় মেয়েরা খেলল যেন নিয়তির মঞ্চে লেখা কোনো স্ক্রিপ্ট মেনে। প্রথমে ব্যাট হাতে শুরুটা করেন ওপেনার স্মৃতি মান্ধানা। তাঁর ব্যাট থেকে আসে ৪৫ বলে ৫৮ রানের দাপুটে ইনিংস। একের পর এক কাভার ড্রাইভে স্টেডিয়ামের প্রতিটি কোণ থেকে করতালি উঠছিল। অপর ওপেনার শেফালি ভার্মা ৭৮ বলে ৮৭ রান করে যেন আগুন ঝরালেন ব্যাটে। তাঁর ব্যাটে ছিল ছয়টি বাউন্ডারি, তিনটি ছক্কা, আর প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস।
জেমাইমা রড্রিগস (Jemimah Rodrigues) ও হরমনপ্রীত কৌর মিলিয়ে গড়েন গুরুত্বপূর্ণ পার্টনারশিপ। তবে ম্যাচের গতি বদলে দেন অলরাউন্ডার দীপ্তি শর্মা, যিনি শুধু ব্যাটেই নয়, বল হাতেও ছিলেন বিধ্বংসী। ব্যাট হাতে ৫৮ রানের অমূল্য ইনিংসের পর তিনি নেন ৪ উইকেট। যেন একাই পুরো দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং লাইনআপকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেন। আমনজোৎ কৌর (Amanjot Kaur) ও রিচা ঘোষ (Richa Ghosh) ফিনিশিং টাচ দেন ভারতের ইনিংসে। নির্ধারিত ৫০ ওভারে ২৯৮ রানে থামে ভারতের স্কোরবোর্ড। প্রোটিয়া বোলারদের মুখে তখন ক্লান্তি আর হতাশা। খাকা (Kagiso Khaka) অবশ্য সর্বাধিক ৩ উইকেট নেন, কিন্তু ভারতের ব্যাটিং আগুন থামাতে পারেননি।
প্রোটিয়াদের রান তাড়া করতে নেমে শুরুতেই তারা চাপে পড়ে যায়। লরা উলভার্ট (Laura Wolvaardt) অবশ্য একাই এক লড়াই চালান। তাঁর ব্যাট থেকে আসে দুর্দান্ত ১০১ রান। কিন্তু অন্য প্রান্তে কেউই দাঁড়াতে পারেননি। তাজমিন ব্রিটস (Tazmin Brits) রান আউট, অ্যানেক বস্ক (Anneke Bosch) এলবিডব্লিউ, দলে ভাঙন ধরতে সময় লাগেনি। শেফালি ভার্মা নিজের হাত ঘুরিয়ে ২টি উইকেট নেন, দীপ্তি শর্মা চারটি। শেষ পর্যন্ত ৪৫.৩ ওভারে দক্ষিণ আফ্রিকা থামে ২৪৬ রানে। জয় আসে ভারতের ঝুলিতে ৫২ রানের ব্যবধানে।
ম্যাচের শেষে চোখে জল নিয়ে হরমনপ্রীত বলেন, “এই ট্রফি শুধু আমাদের নয়, ২০১৭ সালের সেই হার থেকে উঠে আসা প্রতিটি ভারতীয় মেয়ের স্বপ্নের প্রতীক।” স্টেডিয়ামে তখন গর্জে উঠেছিল ভারতীয় সমর্থকদের স্লোগান, “চ্যাম্পিয়নস! চ্যাম্পিয়নস!” রিচা ঘোষের হাতে ট্রফি, আর পেছনে উড়ছে তিরঙ্গা। সেদিনের রাত হয়ে উঠেছিল ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে আরেকটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা অধ্যায়।
এই জয় পরিশ্রম আর নারী শক্তির জয়ের প্রতীক। ভারতের মেয়েরা দেখিয়ে দিলেন, ক্রিকেট শুধু পুরুষদের খেলা নয়, এদেশে মেয়েরাও পারে বিশ্ব জিততে। যেমন কোপিল দেব-এর ১৯৮৩ ও ধোনির ২০১১ সালের স্কোরকার্ড আজও সংগ্রহে রাখেন অনেকে, তেমনই এই ২০২৫ সালের স্কোরকার্ডও হবে এক ঐতিহাসিক স্মারক। কারণ এটি শুধু সংখ্যার খেলা নয়, এটি এক প্রজন্মের লড়াই, আত্মত্যাগ ও জয়ের কাহিনি।
স্কোরকার্ড সংক্ষেপে:
ভারত: ২৯৮/৭ (৫০ ওভার)
স্মৃতি মান্ধানা ৫৮, শেফালি ভার্মা ৮৭, দীপ্তি শর্মা ৫৮
দক্ষিণ আফ্রিকা: ২৪৬ (৪৫.৩ ওভার)
লরা উলভার্ট ১০১, দীপ্তি শর্মা ৪/৪৩, শেফালি ভার্মা ২/৩৫
ফলাফল: ভারত জয়ী ৫২ রানে
২০২৫ নারী বিশ্বকাপ ফাইনালে ভারতীয় দলের ঐতিহাসিক জয়। হরমনপ্রীত, স্মৃতি, শেফালিদের লড়াইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে বিশ্বজয়। সংগ্রহে রাখুন এই অবিস্মরণীয় স্কোরকার্ড।

India creates history in the CWC 2025 Women’s Final! Harmanpreet Kaur’s team beats South Africa to lift the World Cup. Relive the iconic scorecard and golden moments of victory.


