সংবেদন শীল ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : মুম্বইয়ের ডিওয়াই পাটিল স্টেডিয়ামের আকাশে সেদিন ছিল রঙিন আলোর খেলা। কিন্তু সেই আলোর মধ্যেও ভারতের ‘হ্যারি’ হরমনপ্রীত কৌরের ব্যাটে আলো কম, আর ওপেনার স্মৃতি মান্ধানার (Smriti Mandhana) রেকর্ডে যেন ঝলমল করছিল গোটা ক্রিকেটবিশ্ব। ২০২৫ সালের নারী বিশ্বকাপ ফাইনাল ঘিরে যখন উত্তেজনায় কাঁপছে দেশ, তখন একদিকে অধিনায়কের ব্যর্থতা, অন্যদিকে স্মৃতির ঐতিহাসিক সাফল্য, এই দুই মেরুতেই ঘুরে গেল ফাইনালের কাহিনি।
ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা (India vs South Africa) ফাইনালের আগে থেকেই ছিল কোটি কোটি চোখের প্রত্যাশা। সবাই জানত, এটা শুধু একটা ম্যাচ নয়, এটা এক প্রজন্মের লড়াই, প্রতিশোধের মঞ্চ। ২০১৭ সালে স্বপ্নভঙ্গের পর ভারতের মেয়েরা ২০২৫-এ এসেছিল ইতিহাস পুনর্লিখনের মিশনে। কিন্তু যখন টিম ইন্ডিয়া ২৯৮ রানে ইনিংস শেষ করল, তখনও মনে হচ্ছিল, আরও কিছু রান পাওয়া যেত, যদি নকআউটের মঞ্চের রানি হরমনপ্রীত কিছুটা সময় ক্রিজে থাকতে পারতেন। সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তাঁর ব্যাট থেকে এসেছিল ৮৯ রানের দুর্দান্ত ইনিংস। সেই হরমনপ্রীতই ফাইনালে খেললেন মাত্র ২০ রান, ২টি বাউন্ডারি মেরে ৩৮.৬ ওভারে ফিরে গেলেন সাজঘরে। হতাশার মুখে গ্যালারি, নীরব ভারতীয় দর্শক, আর টিভি পর্দার সামনে কোটি সমর্থক যেন বলছিল, “আর একটু থাকলে…”

এই হতাশার মাঝেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল আরেক নাম, স্মৃতি মান্ধানা। ভারতের ওপেনার হিসেবে তিনি শুরু থেকেই ছন্দে ছিলেন। দারুণ টাইমিং, নিখুঁত ফুটওয়ার্ক আর চোখ ধাঁধানো কাভার ড্রাইভে প্রোটিয়া বোলারদের চাপে রেখেছিলেন। যদিও তিনি ৪৫ বলে ৫৮ রান করে হাফসেঞ্চুরি মিস করেন, তবুও গড়েন এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড। মেয়েদের ওয়ান ডে বিশ্বকাপের ইতিহাসে এতদিন এক সংস্করণে ভারতের হয়ে সর্বাধিক রান ছিল কিংবদন্তি মিতালি রাজের (Mithali Raj) নামে ২০১৭ সালের বিশ্বকাপে ৪০৯ রান। কিন্তু সেই রেকর্ড ভেঙে স্মৃতি মান্ধানা লিখে ফেললেন নিজের নাম ইতিহাসে। ২০২৫ সালের বিশ্বকাপে তাঁর সংগ্রহ ৪৩৪ রান, যা এখন ভারতের ইতিহাসে এক সংস্করণে সর্বাধিক রান করা নারী ক্রিকেটারের কীর্তি। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (BCCI) ইতিমধ্যেই টুইটে লিখেছে, “She came, she conquered, she created history! Smriti Mandhana- rewriting Indian cricket’s legacy!”
ভারতের ক্রিকেটার হরভজন সিং (Harbhajan Singh) টেলিভিশন বিশ্লেষণে বলেছেন, “স্মৃতির ব্যাটিংয়ে যে ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে, তা একদিন ভারতের মেয়েদের ক্রিকেটকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাবে। সে শুধু ব্যাটসম্যান নয়, এক অনুপ্রেরণা।” ওডিআই বিশ্বকাপে ভারতের ইতিহাসে শীর্ষ পাঁচ রান সংগ্রাহকের তালিকাও এবার বদলে গেল। প্রথম স্থানে স্মৃতি মান্ধানা ৪৩৪ রানে, এরপর মিতালি রাজ ৪০৯, পুনম রাউত (Punam Raut) ৩৮১, হরমনপ্রীত কৌর ৩৫৯ এবং আবার পঞ্চম স্থানে নিজেই স্মৃতি, ২০২২ সালের বিশ্বকাপে ৩২৭ রান নিয়ে। অর্থাৎ, এই তালিকার দু’টি স্থানই এখন স্মৃতির দখলে। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পারফরম্যান্স শুধুমাত্র সংখ্যার নয়, মানসিক শক্তির প্রমাণ। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে তিনি খেলেছেন ধারাবাহিকভাবে, এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলের হাল ধরেছেন।
হরমনপ্রীতের ইনিংস নিয়ে অবশ্য বিতর্ক থামছে না। অনেকেই বলছেন, তিনি অতিরিক্ত সতর্ক ছিলেন শুরুতে, যার ফলে রানরেটের চাপ বাড়ে। তবে প্রাক্তন ক্রিকেটার ঝুলন গোস্বামী (Jhulan Goswami) বলেছেন, “একটা ম্যাচে ব্যর্থতা দিয়ে হরমনকে বিচার করা ঠিক নয়। তিনি এই দলের হৃদস্পন্দন।” ফাইনালের দিন ভারতের ইনিংসে স্মৃতি ও শেফালি ভার্মা (Shafali Verma) শুরুটা দেন দুর্দান্তভাবে। তাঁদের পার্টনারশিপে ১০৪ রান আসে, এরপর স্মৃতির আউট হওয়া যেন ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়। তিনি আউট হন ক্লোয়ি ট্রিয়নের (Chloe Tryon) বলে ১৭.৪ ওভারে। হরমনপ্রীত চারে নেমে কিছুটা সময় লড়াই করলেও, বড় ইনিংস খেলতে পারেননি।
ভারত শেষমেশ ৫০ ওভারে ২৯৮ রান তোলে। দক্ষিণ আফ্রিকার লক্ষ্য ২৯৯। রানটা বড় মনে হলেও, ভারতের ড্রেসিংরুমে একটা চাপ ছড়িয়ে পড়ে, কারণ তাঁরা জানতেন, এই ফাইনালে অন্তত ৩২০–৩৩০ রান দরকার ছিল। তবুও, সেই রান যথেষ্ট প্রমাণিত হয়, কারণ দীপ্তি শর্মা ও শেফালির ঘূর্ণিতে প্রোটিয়াদের ইনিংস গুটিয়ে যায় ২৪৬ রানে। ম্যাচ শেষে স্মৃতি মান্ধানা বলেন, “এই রেকর্ড আমার নয়, গোটা দলের। আমরা জানতাম, আজ শুধু ক্রিকেট নয়, দেশের ইতিহাসও তৈরি হচ্ছে।” তাঁর সেই হাসি, ট্রফি হাতে চোখ ভেজানো দৃশ্য, সব মিলিয়ে স্মৃতির এই বিশ্বকাপ যেন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। হরমনপ্রীত অবশ্য তাঁর ব্যর্থতা মেনে নিয়ে বলেন, “আজ আমার দিন ছিল না, কিন্তু আমি গর্বিত এই দলের প্রতিটি মেয়েকে নিয়ে।” উল্লেখ্য, ফাইনালের রাত্রিতে যখন ডিওয়াই পাটিলের গ্যালারি কনফেটিতে ভরে যাচ্ছিল, তখন বোঝা যাচ্ছিল, ভারতের মেয়েরা ক্রিকেটে আর ‘নিউজ আইটেম’ নয়, তাঁরা এখন ‘ইতিহাসের অংশ’।
ছবি : সংগৃহীত




