পারিজাত গঙ্গোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, মুম্বাই : ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে আর এক অধ্যায়ের সূচনা হয়ে গেল মুম্বইয়ের ডিওয়াই পাতিল স্টেডিয়ামে। মহিলাদের বিশ্বকাপের (Women’s World Cup) ফাইনাল ম্যাচে হরমনপ্রীত কৌর (Harmanpreet Kaur)-এর নেতৃত্বে ভারত যখন ইতিহাস গড়ল, তখন স্টেডিয়ামের এক কোণে বসে চোখ ভিজে গেল রোহিত শর্মা (Rohit Sharma)-র। ট্রফি উঁচিয়ে ধরার সেই মুহূর্তে গোটা স্টেডিয়াম গর্জে উঠল “ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া” স্লোগানে। আর সেই আওয়াজের ভেতরেও একটুখানি নিঃশব্দ আবেগ লুকিয়ে ছিল ভারতীয় পুরুষ দলের প্রাক্তন অধিনায়কের চোখে।
রোহিতের আবেগপূর্ণ মুহূর্তটি ধরা পড়ে ক্যামেরায়। সাদা টি-শার্ট, মাথায় টুপি, পাশে স্ত্রী রীতিকা সাজদেহ (Ritika Sajdeh), পুরো সময়টা তিনি ছিলেন মনোযোগী দর্শক। আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ (Jay Shah)-এর পাশে বসে খেলা দেখছিলেন তিনি। একসময় দেখা যায়, তাঁর পাশে বসে রয়েছেন প্রাক্তন ব্যাটসম্যান ভিভিএস লক্ষ্মণ (VVS Laxman)। ম্যাচের প্রতিটি রোমাঞ্চকর মুহূর্তে রোহিতের মুখে স্পষ্ট ফুটে উঠছিল উত্তেজনা। ভারতের জয় নিশ্চিত হওয়ার পর যখন হরমনপ্রীত অসাধারণ ক্যাচটি ধরলেন, তখন ক্যামেরায় ধরা পড়ে রোহিতের চোখে জল। আকাশের দিকে তাকিয়ে হাততালি দিচ্ছেন তিনি, ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি, আর চোখের কোণে গড়িয়ে পড়ছে অতীতের বেদনা।
দু’বছর আগের আহমেদাবাদের (Ahmedabad) সেই রাত হয়ত ফিরে এসেছিল তাঁর মনে। ২০২৩ সালের পুরুষদের একদিনের বিশ্বকাপের (ODI World Cup) ফাইনালে ভারতের কাছে এসেও হেরে যেতে হয়েছিল। তখন অধিনায়ক ছিলেন রোহিত নিজেই। সেই স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গিয়েছিল তাঁর কাছে। আজ যখন ভারতের মেয়েরা ট্রফি হাতে উল্লাস করছিল, রোহিত যেন নিজের হারানো মুহূর্তটাকেও নতুনভাবে ফিরে পেলেন। ভারতের পতাকা উড়তে দেখে তাঁর চোখে সেই আনন্দ, সেই তৃপ্তির অশ্রু, যা প্রতিটি ক্রিকেটপ্রেমীর হৃদয়ে একসঙ্গে বাজছে।
শুধু রোহিত নন, দলের এই ঐতিহাসিক জয়ে শুভেচ্ছা জানাতে পিছিয়ে থাকেননি বিরাট কোহলি (Virat Kohli)ও। সমাজমাধ্যমে ট্রফি হাতে মেয়েদের একটি ছবি শেয়ার করে কোহলি লিখেছেন, “তোমরা পরের প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করবে। ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলে তোমরা গোটা দেশকে গর্বিত করেছ। এই মুহূর্তটা তোমাদের, উপভোগ করো। হরমন ও তাঁর দল দুর্দান্ত খেলেছ। জয় হিন্দ।”রোহিত ও কোহলির এই বার্তা শুধু অভিনন্দন বার্তাই নয়, এক গভীর উপলব্ধি। তিনি জানেন, বিশ্বকাপের ফাইনাল জেতা মানে কী, আবার হেরে যাওয়া বেদনাও কীভাবে বুক ভেঙে দেয়। তাই এই জয়কে তিনি দেখছেন ভারতের নতুন অধ্যায় হিসেবে, যেখানে নারী ক্রিকেটাররাই হয়ে উঠেছেন অনুপ্রেরণার প্রতীক।
স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে দর্শকদের উল্লাসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল জাতীয় পতাকার রঙ। হরমনপ্রীতের নেতৃত্বে স্মৃতি মন্ধানা (Smriti Mandhana), রেণুকা সিং (Renuka Singh), দিপ্তি শর্মারা (Deepti Sharma) যে ক্রিকেট খেললেন, তা এককথায় অসাধারণ। প্রতিটি বল, প্রতিটি রান যেন দেশবাসীর প্রত্যাশার প্রতিচ্ছবি। ভারতের জয় নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্টেডিয়াম জুড়ে ‘চ্যাম্পিয়নস’ স্লোগান ধ্বনিত হয়, আর সেই আবেগে ডুব দেয় কোটি কোটি ভারতীয়। খেলা শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে হরমনপ্রীত বলেন, “এই জয় শুধু আমাদের দলের নয়, গোটা ভারতের। মেয়েদের ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে আমরা চেয়েছিলাম, আজ সেটাই বাস্তব। এই ট্রফি আমাদের দেশের প্রতিটি মেয়ের জন্য, যারা কখনও স্বপ্ন দেখেছিল ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে দেশের জন্য কিছু করার।”
ভারতের ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরে পুরুষদের সাফল্যই ছিল শিরোনামে। কিন্তু এবার হরমনপ্রীতরা ইতিহাস বদলে দিলেন।প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্রিকেটপ্রেমীরা শুভেচ্ছায় ভরিয়ে দিয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়া। ক্রিকেট বিশ্লেষকরা বলছেন, এই জয় ভারতীয় সমাজে মেয়েদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলের এক বড় পদক্ষেপ। ক্রিকেট নামের এই খেলাটায় আজ নারীরা সেই জায়গায় পৌঁছে গিয়েছেন, যেখানে একসময় পৌঁছানো ছিল শুধু স্বপ্ন।
রোহিত শর্মা হয়ত নিজের হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি তুলতে পারেননি, কিন্তু হরমনদের জয় তাঁর বুকেও এনে দিল গর্বের স্রোত। আজকের এই জয় ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে চিরকালীন হয়ে থাকবে, যেখানে আবেগ, আত্মবিশ্বাস আর নারীর শক্তি একসঙ্গে লিখে দিল এক নতুন অধ্যায়।
ছবি : সংগৃহীত


