সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ পাটনা, ৩১ অক্টোবর: বিহার (Bihar) আবারও প্রবল রাজনৈতিক উত্তেজনায় ফুঁসছে। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে আজ, শুক্রবার, জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (National Democratic Alliance – NDA) আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের যৌথ ইশতেহার (Joint Manifesto) প্রকাশ করতে চলেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই ঘোষণার মাধ্যমে বিজেপি (BJP), জনতা দল (ইউনাইটেড) বা জেডিইউ (JD(U)) এবং অন্যান্য মিত্র দলগুলি আগামী পাঁচ বছরের শাসনের রূপরেখা স্পষ্ট করবে। অন্যদিকে, বিরোধী শিবির মহাগঠবন্ধন (Mahagathbandhan) ইতিমধ্যেই তাদের ইশতেহার “বিহার কা তেজস্বী প্রাণ (Bihar Ka Tejashwi Pran)” প্রকাশ করে দিয়েছে। সেখানে তেজস্বী যাদব (Tejashwi Yadav) এবং কংগ্রেস (Congress) নেতৃত্ব একাধিক বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, বিশেষত রাজ্যের বেকার যুবকদের জন্য “প্রতিটি পরিবারে একজন সদস্যকে সরকারি চাকরি” দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নির্বাচনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
মহাগঠবন্ধনের ইশতেহারে সবচেয়ে আলোচিত প্রতিশ্রুতি হল “মাই-বেহিন মান যোজনা (Mai-Behen Maan Yojana)”, যার আওতায় ১ ডিসেম্বর থেকে রাজ্যের নারীদের প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে আগামী পাঁচ বছরের জন্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিহারের নারীরা দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ভোটার হিসেবে পরিচিত, যাদের ভোট যে কোনও জোটের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজেপির (BJP) শীর্ষ নেতৃত্ব জানিয়েছেন, “মহিলাদের জন্য এনডিএ সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প যেমন উজ্জ্বলা যোজনা (Ujjwala Yojana) এবং আত্মনির্ভর ভারত প্রকল্প ইতিমধ্যেই বাস্তবিক পরিবর্তন এনেছে। মহাগঠবন্ধনের প্রতিশ্রুতিগুলো শুধুই নির্বাচনী নাটক।”
এদিকে, আজকের এনডিএ ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে বিজেপির জাতীয় সভাপতি জগৎ প্রকাশ নাড্ডা (J.P. Nadda), বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার (Nitish Kumar), এবং লোক জনশক্তি পার্টি (রামবিলাস) এর নেতা চিরাগ পাসওয়ান (Chirag Paswan) -এর। সূত্র অনুযায়ী, ইশতেহারে বিশেষ জোর দেওয়া হবে যুবক ও কৃষকদের কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা এবং শিল্প বিনিয়োগ বৃদ্ধির দিকে। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) নেতৃত্বাধীন এনডিএ এই নির্বাচনে একটি সুসংহত প্রচারণা চালাচ্ছে, যেখানে উন্নয়ন ও জাতীয় নিরাপত্তা তাদের মূল বার্তা। গত কয়েকদিনে মোদী একাধিক জনসভায় বলেছেন, “বিহার আজ উন্নয়নের নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। আমরা শুধু প্রতিশ্রুতি দিই না, তা বাস্তবে প্রমাণ করি।” অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরের নেতা রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi) প্রধানমন্ত্রীকে আক্রমণ করে বলেছেন, “বিহারের মানুষ আর মিথ্যা আশ্বাসে বিভ্রান্ত হবে না। আমরা কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার এবং মর্যাদা ফেরানোর লড়াই করছি।”
এনডিএর ইশতেহার প্রকাশের ঠিক আগের দিনই বিজেপি সভাপতি জে.পি. নাড্ডা (J.P. Nadda) কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর ছট উৎসব নিয়ে মন্তব্যকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, “রাহুল গান্ধীর মতো নেতার মন্তব্যে শুধু ধর্মীয় অনুভূতিই আঘাত পায় না, বরং দেশের সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের অবমাননা হয়।” এই মন্তব্যের জবাবে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে পাল্টা দাবি করা হয়েছে যে “বিজেপি নিজেই ধর্মকে ভোটের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।” রাজনৈতিক সমালোচক মনে করছেন, এই নির্বাচন কেবল দু’টি আদর্শের সংঘর্ষ নয়, এটি বিহারের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিকনির্দেশকও বটে। এনডিএ যেখানে নিজেদের “উন্নয়নের ধারক” হিসেবে তুলে ধরছে, সেখানে মহাগঠবন্ধন “সামাজিক ন্যায় ও চাকরির প্রতিশ্রুতি”-এর মাধ্যমে তরুণদের মন জয় করার চেষ্টা করছে। বিহারের মহিলা ভোটারদের ভোটব্যাঙ্ককে ঘিরে দুই পক্ষের লড়াই আরও স্পষ্ট। মহাগঠবন্ধনের “মাই-বেহিন মান যোজনা” যেখানে সরাসরি নারীদের আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, এনডিএ সেখানেই দাবি করছে যে “বাস্তব উন্নয়ন ও সুরক্ষা”ই মহিলাদের প্রকৃত ক্ষমতায়নের পথ।
নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশন (Election Commission) রাজ্যজুড়ে আইনশৃঙ্খলা এবং সীমান্ত অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করেছে। সূত্রের খবর, এই বছর ভোটে প্রায় ৭ কোটি ২০ লক্ষ ভোটার অংশ নেবেন, যার মধ্যে প্রায় অর্ধেকই মহিলা ভোটার। যদিও মহাগঠবন্ধনের তরফে দাবি করা হচ্ছে যে এইবার “জনতার তরঙ্গ” তাদের পক্ষে, বেশিরভাগ সমীক্ষা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এনডিএ এখনও এগিয়ে আছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, এনডিএ ২৪৩টি আসনের মধ্যে প্রায় ১৪৫-১৬০টি আসন পেতে পারে, যেখানে মহাগঠবন্ধন পেতে পারে ৮০-৯৫টি আসন, এবং বাকি আসন যাবে স্বতন্ত্র ও ছোট দলগুলির ঝুলিতে।
বিহারের রাজনৈতিক বিশ্লেষক অজয় কুমার বলেন, “এটা এমন একটি নির্বাচন যেখানে প্রতিশ্রুতির ভারসাম্য, বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব এবং সংগঠনের দক্ষতাই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করবে। এনডিএ এখনও সংগঠনের দিক থেকে অনেক এগিয়ে।” আজকের এনডিএ ইশতেহার প্রকাশ সেই প্রতিযোগিতাকে আরও উস্কে দেবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। এখন দেখার বিষয়, বিহারের জনগণ উন্নয়নের পথ বেছে নেন, না কি নতুন প্রতিশ্রুতির রাজনীতির দিকে ঝোঁকেন।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত




