বঙ্গের ভোটার তালিকায় ৫০% নাম উধাও! সাত জেলায় Pre-SIR যাচাইয়ে চাঞ্চল্য-রাজনীতিতে নতুন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ

SHARE:

জাতীয় নির্বাচন কমিশন স্বাস্থ্যসাথী কার্ডকে SIR নথি হিসাবে খারিজ করেছে। বাংলায় আধার ও আরও ১১টি নথি বাধ্যতামূলক। রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্ক।

বঙ্গের ভোটার তালিকায় ৫০% নাম উধাও! সাত জেলায় Pre-SIR যাচাইয়ে চাঞ্চল্য-রাজনীতিতে নতুন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ

সাশ্রয় নিউজ : নিজস্ব সংবাদাতা, কলকাতা, ১৯ অক্টোবর ২০২৫: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আবারও অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠল ভোটার তালিকা ঘিরে। নির্বাচন কমিশনের নতুন উদ্যোগ “Pre-SIR (Pre Summary Intensive Revision)”-এর প্রাথমিক পর্বে উঠে এসেছে এক বিস্ফোরক তথ্য। রাজ্যের সাতটি জেলায় ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে প্রায় ৫০ শতাংশ নামের কোনো অস্তিত্বই নেই! এই আশ্চর্যজনক তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহল থেকে প্রশাসন সব জায়গায় শুরু হয়েছে চরম বিতর্ক ও চাপানউতোর।

নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) এক সিনিয়র আধিকারিক জানিয়েছেন, দক্ষিণ ২৪ পরগনা (South 24 Parganas), উত্তর ২৪ পরগনা (North 24 Parganas), নদিয়া (Nadia), মালদা (Malda), মুর্শিদাবাদ (Murshidabad), উত্তর দিনাজপুর (North Dinajpur) এবং কোচবিহার (Cooch Behar) এই সাত জেলাকে কেন্দ্র করে চালানো হয়েছে “matching–mapping” প্রক্রিয়া। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অর্ধেকের বেশি নাম ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গে মিলছে না। ফলে কমিশনের সন্দেহ, দীর্ঘদিন ধরে ভোটার তালিকায় বেআইনি বা জাল নাম সংযোজন হয়েছে, যার সঙ্গে অনুপ্রবেশকারীদের (illegal infiltration) যোগ থাকতে পারে। এই তথ্য সামনে আসতেই রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। বিজেপি (BJP) বিষয়টিকে “বাংলার গণতন্ত্রে দীর্ঘদিনের দুর্নীতির প্রমাণ” বলে দাবি করেছে, আর তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) পাল্টা অভিযোগ করেছে যে, “বিজেপি নাগরিকত্ব ও অনুপ্রবেশ ইস্যু তুলে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার ফাঁদ পেতেছে।”

রাজ্যের বিজেপি সভাপতি সমিক ভট্টাচার্য  (Samik Bhattacharjee) এক বিবৃতিতে বলেন, “আমরা বহুবার বলেছি বাংলার ভোটার তালিকায় বিপুল সংখ্যক অনুপ্রবেশকারী যুক্ত রয়েছে। এখন নির্বাচন কমিশনের যাচাই সেটাই প্রমাণ করছে। এই অনুপ্রবেশই রাজ্যের জনসংখ্যার ভারসাম্য ও রাজনৈতিক চিত্র বদলে দিয়েছে।” অন্যদিকে তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh) পাল্টা মন্তব্যে বলেন,  “এটি বিজেপির জনসংখ্যা রাজনীতির আরেক রূপ। ভোটার তালিকার পরিষ্কার প্রক্রিয়া প্রশাসনিকভাবে ঠিক, কিন্তু তার নামে ভয় দেখানো বা বিভাজন সৃষ্টি করা গ্রহণযোগ্য নয়। এই প্রক্রিয়ায় অনেক প্রকৃত নাগরিকও বাদ পড়তে পারেন।” নির্বাচন কমিশন অবশ্য এই বিতর্কে নীরব থেকে জানিয়েছে, “এটি সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ও স্বচ্ছ উদ্যোগ। লক্ষ্য একটাই ভোটার তালিকা থেকে নকল, মৃত বা ভুয়ো নাম বাদ দেওয়া।” কমিশনের এক আধিকারিক বলেন, “যাদের নাম মিলছে না, তাঁদের নোটিশ পাঠানো হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বৈধ নথি জমা দিতে বলা হবে। বৈধ প্রমাণ দিতে না পারলে নাম স্থায়ীভাবে মুছে দেওয়া হবে।” সূত্রের খবর, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের (Assembly Election 2026) আগে নির্বাচন কমিশন চায় একদম “পরিষ্কার ভোটার তালিকা” তৈরি করতে। প্রতিটি জেলায় এখন বিশেষ টিম গঠন হচ্ছে, যারা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, সীমান্ত-সংলগ্ন জেলাগুলিতে এই বাদ পড়া নামের হার স্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে উত্তর ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ ও মালদা এই তিনটি জেলায় নাম উধাও হওয়ার হার গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। তাঁদের মতে, “এটি প্রমাণ করে, বিগত দুই দশকে ভোটার তালিকা নিয়ে বড় ধরনের কারচুপি হয়েছে। এখন প্রশাসন সেটি পরিস্কার করার প্রক্রিয়ায় নেমেছে।” অন্যদিকে, এক নির্বাচনী বিশ্লেষক বলেন, “এই উদ্যোগ রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কারণ, যদি দেখা যায় যে বহু নাম প্রকৃত নয়, তাহলে তা সরাসরি ‘ইনফিলট্রেশন পলিটিক্স’-এর সঙ্গে যুক্ত হবে। আর সেই বার্তা ভোটারদের কাছে গেলে বিজেপি বিরাট সুবিধা পেতে পারে।”

রাজনৈতিক প্রভাব ও সম্ভাব্য ফলাফল
এই Pre-SIR যাচাই এখন রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছুড়েছে। নাগরিকত্ব, অনুপ্রবেশ ও ভোটাধিকারের প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অনেকেই বলছেন, এটি শুধুমাত্র ভোটার তালিকা পরিস্কারের প্রশাসনিক অভিযান নয় এটি ২০২৬-এর নির্বাচনের আগে এক কৌশলগত রাজনৈতিক চাল। তৃণমূল শিবিরের এক প্রবীণ নেতা গোপন সূত্রে বলেন, “বিজেপি চাইছে এই উদ্যোগকে নাগরিকত্ব বিতর্কে রূপ দিতে, যাতে তাদের CAA–NRC–NPR এজেন্ডাকে শক্তিশালী করা যায়।” বিজেপি অবশ্য স্পষ্ট করে বলছে, “ভোটার তালিকা থেকে ভুয়ো নাম মুছে ফেলা মানেই ভোটের স্বচ্ছতা।” দলের এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, “এটা রাজনীতি নয়, এটা দেশের নাগরিক স্বচ্ছতার প্রশ্ন। প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করতে হলে, জাল ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দিতেই হবে।”

ভোটারদের আতঙ্ক ও প্রশাসনের ভূমিকা
রাজ্যের বহু জায়গায় ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, তাঁদের নাম বাদ পড়েছে বা যাচাইয়ের জন্য নোটিশ এসেছে। স্থানীয় প্রশাসন জানাচ্ছে, “যারা প্রকৃত ভোটার, তাঁদের চিন্তার কোনও কারণ নেই।” কমিশন স্পষ্ট করেছে, যাদের নাম বাদ পড়বে, তারা ৩০ দিনের মধ্যে প্রমাণপত্র দেখাতে পারবেন যেমন আধার (Aadhaar), ভোটার আইডি (Voter ID), রেশন কার্ড (Ration Card) বা জমির নথি।

ভোট রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ? ২০২৬ সালের নির্বাচন সামনে রেখে এই Pre-SIR প্রক্রিয়া এখন কার্যত রাজনীতির নতুন অস্ত্র হয়ে উঠেছে। একদিকে তৃণমূল দাবি করছে, “এটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার চেষ্টা,” অন্যদিকে বিজেপি বলছে, “এটি জনগণের প্রকৃত ম্যান্ডেটের পুনঃপ্রতিষ্ঠা।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, “যদি জনগণের মধ্যে ‘ভোটার তালিকা পরিস্কার মানেই অনুপ্রবেশ রোধ’, এই ধারণা গড়ে ওঠে, তাহলে বিজেপি তার রাজনৈতিক লাভ তুলতে পারবে।”

এই পুরো প্রক্রিয়াটি এখন প্রশাসনিকভাবে সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করতে চায় কমিশন। ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করার কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যেই। উল্লেখ্য, বাংলার ভোটার তালিকায় ৫০ শতাংশ নাম উধাও হওয়ার ঘটনা নিছক পরিসংখ্যান নয়, এটি রাজনৈতিক সঙ্কেতও বটে। একদিকে প্রশাসনের স্বচ্ছতার প্রচেষ্টা, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলের কৌশল- দুইয়ের সংঘাতে নতুন করে ধাক্কা খেতে পারে বাংলার রাজনৈতিক ভারসাম্য। এই “matching–mapping” শুধু নাম মেলাচ্ছে না, এটি ভবিষ্যতের রাজনীতির দিকও নির্ধারণ করছে। এখন শুধু প্রশ্ন, এটি কি ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নাকি নতুন ভোট রাজনীতির সূচনা? সময়ই দেবে উত্তর।

ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত 

আরও পড়ুন : SIR in Bengal, Suvendu Adhikari statement | ‘বাংলায় SIR না হলে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হবে’ : নাগরাকাটায় শুভেন্দু অধিকারীর বিস্ফোরক মন্তব্যে তপ্ত রাজনীতি

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন