সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ জলপাইগুড়ি : নাগরাকাটা থেকে আবারও রাজ্য রাজনীতিতে নয়া আগুন। বৃহস্পতিবার নাগরাকাটার দুর্গত এলাকায় দাঁড়িয়ে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) এমন এক মন্তব্য করলেন, যা মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়েছে রাজনৈতিক মহলে। তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘বাংলা SIR করতে না দিলে রাষ্ট্রপতি শাসন হবে।’ মন্তব্যটি যতটা সরাসরি, তার রাজনৈতিক অভিঘাত ততটাই গভীর।
ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত নাগরাকাটায় পরিদর্শনে গিয়ে শুভেন্দু অভিযোগ করেন, বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মু (Khagen Murmu) ও বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ (Shankar Ghosh) -এর ওপর তৃণমূলের ‘জেহাদি’ কর্মীরাই হামলা চালিয়েছে। তিনি এনআইএ (NIA) তদন্তের দাবি তুলেছেন। শুভেন্দুর কণ্ঠে ক্ষোভ, ‘খগেনদার ওপর হামলার পিছনে যে তৃণমূলের আশ্রিত জঙ্গিরা আছে, তা সবার জানা। কেন্দ্রের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা।’
শুভেন্দু বলেন, ‘বাংলা SIR করতে না দিলে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হবে। আর যদি SIR হয়, তাহলে বাংলাদেশি আর ভূতুড়ে ভোটারদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে।’ তাঁর দাবি, ‘ভারতের মুসলমানদের কোনও ভয় নেই। কিন্তু যারা অবৈধভাবে ভোটার তালিকায় ঢুকে গিয়েছে, তাদের বাদ পড়তেই হবে।’ তিনি আরও জানান, ‘ছাব্বিশে বিজেপিই ক্ষমতায় আসবে। তখন বদল হবে, বদলাও হবে। জনগণ এবার জবাব দেবে।’ এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই শুভেন্দু যেন আসন্ন রাজ্য রাজনীতির ভবিষ্যৎ চিত্রটা আরও ঘনীভূত করে দিলেন।
SIR ঘিরে চরম সংঘাত
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হল SIR (বা State Identification Register) নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের টানাপোড়েন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) শুরু থেকেই এর বিরোধিতায় সরব। তিনি বারবার দাবি করেছেন, SIR মানেই বাংলার মানুষের নাগরিকত্ব নিয়ে ষড়যন্ত্র। সম্প্রতি তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলা থেকে এক জনেরও নাম বাদ গেলে বুঝে নেবেন।’ নবান্ন থেকে সাংবাদিক বৈঠক করে মমতা সরাসরি নির্বাচন কমিশন (Election Commission) ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) -এর নাম টেনে বলেন, ‘কমিশন বিজেপির নির্দেশে কাজ করছে। এটা গণতন্ত্রের জন্য ভয়ানক।’ এমন এক সময়, যখন কালীপুজোর পর থেকেই বাংলায় SIR প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার জল্পনা চলছে, তখন শুভেন্দুর এই মন্তব্যে রাজ্যের রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
তৃণমূলের পাল্টা প্রতিক্রিয়া
বিরোধী দলের এমন মন্তব্যে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বও চুপ নেই। দলের মুখপাত্র তন্ময় ঘোষ*** (Tanmay Ghosh) তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘শুভেন্দুবাবু তো নিজেই সব ঠিক করে ফেলছেন। ভারতের আর আইন, সংবিধান বলে কিছু নেই বুঝি? নির্বাচন কমিশনেরই বা ভূমিকা কী?’
তৃণমূলের তরফে আরও অভিযোগ, বিজেপি ইচ্ছাকৃতভাবে রাজ্যে অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইছে। এক নেতার কথায়, ‘রাষ্ট্রপতি শাসন জারির হুমকি দেওয়া মানে সংবিধানকে চ্যালেঞ্জ করা।’
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুভেন্দুর এই মন্তব্য শুধুমাত্র কেন্দ্রের পক্ষের বক্তব্য নয়, এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপও। তাঁরা বলছেন, বিজেপি আসন্ন নির্বাচনের আগে রাজ্যে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য এমন হুঁশিয়ারি দিচ্ছে।
রাজনীতি তপ্ত, মানুষ বিভ্রান্ত
নাগরিকপঞ্জি (NRC) থেকে শুরু করে SIR পর্যন্ত নাগরিকত্ব ইস্যু নিয়ে বাংলা রাজনীতি বিগত কয়েক বছর ধরেই উত্তাল। সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হচ্ছে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে মানুষ বুঝে উঠতে পারছেন না, SIR মানে আদৌ কী এবং তাঁদের নাগরিকত্বের ওপর এর প্রভাব কতটা হবে। এক প্রবীণ নাগরিক বলেন, ‘আমরা তো এখানে জন্মেছি, স্কুলে পড়েছি, ভোট দিয়েছি। এখন আবার নতুন করে প্রমাণ দিতে হবে কেন?’
অন্যদিকে, বিজেপির যুক্তি, SIR হলে প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকরাই স্বীকৃতি পাবেন, আর ভুয়ো ভোটারদের নাম বাদ যাবে। কিন্তু বিরোধীরা বলছেন, এর আড়ালে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছে কেন্দ্র।
রাজনীতি বিশ্লেষক অনির্বাণ মুখোপাধ্যায় (Anirban Mukhopadhyay) বলেন, ‘শুভেন্দুর বক্তব্য শুধু প্রশাসনিক হুঁশিয়ারি নয়, এটা বিজেপির একটি বড় রাজনৈতিক কৌশল। তারা জানে, নাগরিকত্ব ও অভিবাসন প্রশ্নে জনগণের একটা অংশ আবেগপ্রবণ।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই মন্তব্যের ফলে রাজ্যে রাজনীতির মেরুকরণ আরও বাড়বে। বিজেপি ও তৃণমূল, উভয়ই নিজেদের রাজনৈতিক মাটিকে শক্ত করতে চাইছে।’
উল্লেখ্য, নাগরাকাটা থেকে শুভেন্দুর এই মন্তব্য যেন রাজ্য রাজনীতিতে নতুন আগুন জ্বেলে দিয়েছে। একদিকে কেন্দ্র ও রাজ্যের সংঘাত, অন্যদিকে ভোটের আগে গেরুয়া শিবিরের আক্রমণাত্মক অবস্থান, সব মিলিয়ে রাজনৈতিক আবহ আরও ঘন হচ্ছে। এখন দেখার, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল কীভাবে এই হুঁশিয়ারির জবাব দেন, আর জনগণ কাকে সমর্থন করে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন :SIR, West Bengal SIR | নির্বাচন কমিশন জোরদার হতে বলল | ‘এসআইআর প্রস্তুতি সাত দিনের মধ্যে সম্পন্ন করুন’




