pornography addiction brain effects | পর্ন আসক্তি: মস্তিষ্কের অদৃশ্য বিধ্বংসী প্রকোপ

SHARE:

তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : যাঁরা মন খোলা স্বাধীনভাবে সময় কাটান, তাঁদের অনেকেই হয়ত কখনও কোনও অনলাইন ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট, যেমন অশ্লীল চিত্র বা ভিডিও দেখেছেন। প্রথমটা হয়ত কৌতূহলবশত, পরে হয়ত সেটা এক অভ্যাসে পরিণত হয়। কিন্তু সম্প্রতি স্নায়ুবিজ্ঞানীদের গবেষণা যে বিষয়টি সামনে এনেছে, তা হল, পর্ন (Pornography) আসক্তি কেবল পুরাতন ধারণা নয়; এটি মস্তিষ্কের বিভিন্ন সেক্টরে গঠন ও কাজ-প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে পারে। এখানে আমরা জানব, পর্ন আসক্তি মানুষের মস্তিষ্ককে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, এবং কাদের মধ্যে এটা বেশি দেখা যায়।

ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত

গবেষণায় মস্তিষ্কের চিত্রে তুলে ধরা হয়েছে বেশ কিছু নতুন তথ্য। JAMA Psychiatry-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, অতিরিক্ত পর্ন ব্যবহার এবং সাপ্তাহিক সময়ের মধ্যে ধরা পর্নের ঘন্টা সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে মাইগ্রেইন গ্রে ম্যাটার ভলিউমে (gray matter volume) একটি নেতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ, যেসব ব্যক্তির পর্নের ব্যবহার বেশি করেন, তাঁদের মস্তিষ্কের কিছু অংশ, বিশেষ করে ডান সিউডেট (right caudate) এলাকায় গ্রে ম্যাটার কম থাকে। কেবল গঠনেই নয়, কাজের ক্ষেত্রে, ইররিটিভ স্টিমুলাস হাতে ধরলে মস্তিষ্কে যে সাড়া আসে, সেটাও পরিবর্তিত হয়। মস্তিষ্কের ফ্রন্টোস্ট্রায়াটাল নেটওয়ার্ক (frontostriatal network) -এর কার্যকরী সংযোগ কমে যেতে পারে বলে দেখা গিয়েছে, যা স্ব-নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দেয়। আরও নতুন একটি গবেষণায়, functional near-infrared spectroscopy (fNIRS) প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখা যায়, যারা অনলাইন পর্ন নিয়মিত দেখেন, তাঁদের প্রেফ্রন্টাল কোরটেক্স (prefrontal cortex) অঞ্চলের কার্যকরী সংযোগ এমনভাবে পরিবর্তিত হয়, যা ড্রাগ আসক্তির মস্তিষ্ক-পরিসরে দেখা যায়। গবেষকরা এ অবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন “ড্রাগ আসক্তির মতো” আচরণগত বৈশিষ্ট্যগুলোর সঙ্গে। মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড (reward) ও উদ্দীপনা (arousal) কেন্দ্রগুলোর, বিশেষ করে ভেন্ট্রাল স্ট্রায়াটামতেও (ventral striatum) অস্বাভাবিক সক্রিয়তা ধরা পড়েছে। এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পর্নের সঙ্কেত (cue) দেওয়া হলে ওই এলাকায় অধিক উত্তেজনা তৈরি হয়, যেমনটি ড্রাগ-প্রাকৃতিক উদ্দীপক সঙ্কেত দেখানো হলে ড্রাগ আসক্তদের মস্তিষ্কে ঘটে।

আর একটি দিক হল, কগনিটিভ ও আবেগের প্রতিক্রিয়া। পর্ন দেখার পর, অংশগ্রহণকারীরা Stroop Color-Word Test (SCWT)-এ কম সঠিক উত্তর দেয় এবং প্রতিক্রিয়া সময় বৃদ্ধি পায়, অর্থাৎ তাদের মনোযোগ ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমে যায়। এছাড়া, দীর্ঘমেয়াদে পর্ন ব্যবহার অপ্রত্যাশিত আবেগ, যেমন উদ্বেগ, বিষণ্ণতা ও স্ট্রেস বাড়িয়ে দিতে পারে।

ছবি: প্রতীকী ও সংগৃহীত 

ক্ষতির দিক, প্রভাব ও
নিয়ন্ত্রণ হারানো 

পর্ন আসক্তিতে ব্যক্তি চায় ‘আরেকটা ভিডিও, আরও একটি’ এ ধরনের চাপ ও আকর্ষণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, ডোপামিন ও অন্যান্য নিউরোবায়োকেমিক পরিবর্তনের কারণে।
সংবেদনশীলতা হ্রাস (Desensitization): অতিরিক্ত উদ্দীপনায় মস্তিষ্ক উদ্দীপনাকে কম অনুভব করতে পারে; তাই সময়ের সঙ্গে যৌন অভিজ্ঞতা ও সম্পর্কিত অনুভূতি স্বাভাবিক অভিজ্ঞতায় কম আকর্ষণীয় মনে হতে পারে।
যৌন ক্রিয়ায় সমস্যা: বিশেষ করে যুবকদের মধ্যে ইরেকটাইল ডিসফাংশন (erectile dysfunction) বা যৌন উত্তেজনায় অব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সমস্যাগুলো উল্লেখ করা হচ্ছে।
মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব: উদ্বেগ (anxiety), বিষণ্নতা (depression), স্বল্পস্বাস্থ্য অনুভূতি এসব আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে পারে।
সম্পর্ক ও সামাজিক সমস্যা: অকস্মাৎ আকর্ষণ কমে যাওয়া, পার্টনারের সঙ্গে যোগাযোগে দুর্বলতা, বিশ্বাসহানি, এসব বিষয় দেখা দিয়েছে অনেক ক্ষেত্রে

একটি ইংরেজি সংবাদ ফিচারে (The Guardian) টনি (Tony) নামের এক ব্যক্তি বলেন, “আমি এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি এই আচরণে যে, বন্ধ করা এক ধরনের সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।”
আরেক ব্যক্তি জ্যাক (Jack) জানান, “রিয়েল-লাইফের অভিজ্ঞতায় উত্তেজনা ধরে রাখতে পারিনি, কারণ ভার্চুয়াল ভিডিওর উদ্দীপনা বাজিমাত করেছিল।”

ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত

কাদের মধ্যে বেশি দেখা যায়? 

যদিও পর্ন আসক্তি সকল ক্ষেত্রেই হতে পারে, কিছু গবেষণা বলে যে কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে এটি তুলনামূলক ভাবে বেশি দেখা যায়। নীচে কিছু মূল ধরণ:

যুবক ও কিশোর বয়সের ছেলে: প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট ব্যবহারে এগুলো বেশি সক্রিয়। প্রথম পর্ন দেখার বয়স আজ সাধারণত ১০-১৩ বছরের মধ্যে। ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার বেশি ব্যবহারকারী: ইন্টারনেটের সহজ প্রবেশাধিকার ও মোবাইল ডিভাইস এ কাজকে দ্রুততর করেছে।
সাইকোলজিক্যাল প্রবণতা থাকা ব্যক্তিরা: উদ্বেগ, বিষণ্নতা, আত্মঅহংকার সমস্যাসহ মানসিক চাপের মানুষদের মধ্যে আসক্তি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হতে পারে। একাকিত্ববোধ, সম্পর্কবিচ্ছিন্নতা বা সামাজিক বন্ধন কম থাকা মানুষ: ভেতর থেকে যাদের ইমোশনাল একাকিত্ব বা সম্পর্কবিচ্ছিন্নতার অনুভূতি রয়েছে, তারা আত্মপ্রসারক হিসেবে এ ধরণের আচরণ শুরু করতে পারে।

নার্সিং ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী: এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, নার্সিং শিক্ষার্থীদের মধ্যে পর্ন আসক্তি ও ওভার ইউজ ইন্টারনেট ব্যবহারকে তারা ইতিবাচক বা নেতিবাচকভাবে অভিহিত করছেন। গবেষণাটি দেখিয়েছে, পর্ন আসক্তি ও পর্ন দেখার সময় বাড়লে উদ্বেগ (r = 0.369), বিষণ্নতা (r = 0.441) এবং চাপ (r = 0.319) -এর মাত্রা বাড়ে।

বর্তমান সময়ের ডিজিটাল যুগে পর্ন আশক্তি ভীষণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। প্রথমটা কেবল আগ্রহ তবে পরে তা আসক্তির রূপ নিতে পারে। যেখানে মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকরী নেটওয়ার্ক বদলে যায়। এই পরিবর্তন সহজে বোঝা যায় না, কারণ শুরুতে ক্ষতিগতি ধীরগতিতে ঘটে।তবে আশার কথা হল, গবেষণা বলছে, যদি ব্যবহার বন্ধ বা কমিয়ে দেয়া যায়, ধুলো ঝেড়ে সবকিছু ধীরে ধীরে ফিরে আসতে পারেন; গ্রে ম্যাটার হ্রাস করা অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু
সতর্ক থাকতে হবে, যেমন ড্রাগ বা অন্য কোনও আসক্তি, এই সমস্যাও ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে। যদি দেখেন, কোন ব্যক্তি তার দৈনন্দিন কাজ, সম্পর্ক বা মানসিক শান্তি বজায় রাখতে পারছেন না, তাহলে মনোবিদ বা স্নায়ুবিদের–এর সাহায্য নেওয়া জরুরি।

ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত 

আরও পড়ুন : Sarah Kane Blasted Cleansed 4.48 Psychosis analysis | তিরিশ বছর পরেও সমান প্রাসঙ্গিক: ‘ব্লাস্টেড’-এর নির্মম বাস্তবতা আর সারা কেনের অমরত্ব

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন