সৌমি নন্দ ✪ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক: লন্ডনের রয়্যাল কোর্ট থিয়েটারে যখন সারা কেনের (Sarah Kane) প্রথম নাটক Blasted মঞ্চস্থ হয়েছিল ১৯৯৫ সালে, তখনই সমালোচক মহলে ঝড় ওঠে। মাত্র ২৩ বছর বয়সী নাট্যকার কীভাবে এতটা সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন, যুদ্ধের ভয়াবহতা একটি নাটকে ঢেলে দিলেন, তা মেনে নিতে পারেননি অনেকেই। ডেইলি মেইল-এর (Daily Mail) জ্যাক টিঙ্কার (Jack Tinker) লিখেছিলেন, “এ এক ঘৃণ্য অশ্লীল ভোজ।” ডেইলি টেলিগ্রাফ-এর (Daily Telegraph) চার্লস স্পেন্সার (Charles Spencer) এই নাটককে ‘মানসিক ও শৈল্পিক উৎকর্ষতা শূন্য’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন। কেউ কেউ এমনও বলেছিলেন যে কেন মানসিকভাবে অসুস্থ। অথচ, তিরিশ বছর পর, Blasted সহ সারা কেনের রচনাগুলোকে আধুনিক ব্রিটিশ থিয়েটারের অমূল্য রত্ন হিসেবে দেখা হয়।
Blasted-এর গল্প এক হোটেল ঘর থেকে শুরু হয়, যেখানে সাংবাদিক ইয়ান (Ian) আর কেট (Cate) আসে। ইয়ানের মুখে বর্ণবিদ্বেষী গালাগালি, হাতে রিভলভার, আর কেটের ওপর যৌন নিপীড়ন সব মিলিয়ে অস্বস্তিকর এক বৃত্ত তৈরি হয়। হঠাৎ এক সৈনিক প্রবেশ করে, যে যুদ্ধের বিভীষিকা বর্ণনা করতে করতে ইয়ানকে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। এই সৈনিক চরিত্রটি যে শুধু বলকান যুদ্ধের (Balkans War) ইঙ্গিত দেয় তা নয়, কেনের লেখনী দর্শকের সামনে মঞ্চেই ছুঁড়ে দেয়। নাট্য সমালোচক গ্রাহাম সন্ডার্স (Graham Saunders) বলছেন, “Blasted আমাদের চোখের সামনের নিরাপদ পর্দাগুলো ছিঁড়ে ফেলে, যেন সহিংসতা আর যন্ত্রণাই মানব সভ্যতার চরম সত্য।”
সারা কেন জন্মেছিলেন ১৯৭১ সালে, ব্রেন্টউড (Brentwood), এসেক্সে (Essex)। বাবা সাংবাদিক ছিলেন। কৈশোরে খ্রিস্টান পরিবার আর শহরতলির মূল্যবোধকে বর্জন করেন। ওঁর বন্ধু নাট্যকার মার্ক র্যাভেনহিলের (Mark Ravenhill) লেখা শোকলিপিতে কেনের কথা উদ্ধৃত হয়েছে, “লোকেরা ভাবে, এখানে এসব হতে পারে না। অথচ এসেক্সেও (Essex) ঠিক ততটাই শোষণ আর দুর্নীতি আছে, যা আমি প্রকাশ করতে চাই।” তাঁর লেখা থেকে স্পষ্ট, জয় ডিভিশন (Joy Division), পিক্সিজ (Pixies), রেডিওহেড (Radiohead)-এর মতো ব্যান্ডের গানের প্রভাব ছিল গভীর। স্যামুয়েল বেকেট (Samuel Beckett), হ্যারল্ড পিন্টার (Harold Pinter)-এর নাট্যরীতিও তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল। দ্বিতীয় নাটক Phaedra’s Love-এ ক্লাসিকাল মিথকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে সৎপুত্র হিপোলিটাসের (Hippolytus) চোখ দিয়ে নিষিদ্ধ প্রেমের এক নির্মম বয়ান তুলে ধরেন। কিন্তু কেইনের নাটকের কুখ্যাতি শুধু সহিংসতার জন্য নয়, মঞ্চে সেই সহিংসতাকে উপস্থাপনের ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জের জন্যও। Cleansed নাটকে (১৯৯৮) এমন সব দৃশ্যের নির্দেশনা ছিল, যেমন মৃত ইঁদুর দিয়ে চরিত্রকে সাজানো বা “The rats carry Carl’s feet away” যা প্রযোজক-পরিচালকদের মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছিল। নাট্যকার ডেভিড গ্রেইগ (David Greig) মনে করতেন, কেনের লেখায় এমন সব ‘অমঞ্চনীয়’ নির্দেশনা থাকত যাতে পরিচালকরা নতুন কিছু করার জন্য বাধ্য হন।
তাঁর শেষ লেখা 4.48 Psychosis আত্মহননের আগের মানসিক অবস্থাকে তুলে ধরে। সেখানে কোনও দৃশ্যরূপ নেই, চরিত্র সংখ্যা নেই, এটি একটি ছন্দবদ্ধ কবিতার মতো। নাট্যকার Madeleine Potter বলেন, “এটি শুধু বিষণ্নতা বা সাইকোসিসের গল্প নয়। মানবিক সংযোগের এক সার্বজনীন অনুসন্ধান।” ড্যানিয়েল ইভান্স (Daniel Evans) মন্তব্য করেন, “কেইন নাট্যরূপকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছেন, যেখান থেকে আমাদের নাট্যধারা এখনও বেরোতে পারেনি।”
মৃত্যুর দুই দশক পরও কেনের লেখা #MeToo, যৌন সহিংসতা, মানসিক স্বাস্থ্য, জেন্ডার ডিসমরফিয়া-এর মতো বিষয়কে নতুন আলোয় দেখায়। Cleansed-এ প্রেম আর শারীরিক যন্ত্রণাকে এক সুতোয় বাঁধা হয়েছে। রোলাঁ বার্তের (Roland Barthes) A Lover’s Discourse-এর মতো কেইনও মনে করেন, প্রেমে পড়া মানেই নিজের স্বত্তা হারানো। প্রেমের উচ্ছ্বাস, যন্ত্রণার বিভীষিকা আর জীবনের নিষ্ঠুর রিয়্যালিজম কেনের নাটকে এই তিনের সংমিশ্রণেই নিহিত তাঁর অমরত্ব।বর্তমান সময়ে যখন 4.48 Psychosis আবার মঞ্চে ফিরছে রয়্যাল শেক্সপীয়র কোম্পানির (Royal Shakespeare Company) প্রযোজনায়, বা Cleansed আসছে আলমেইডা থিয়েটারে (Almeida Theatre), তখন বোঝা যায়, তিরিশ বছর আগের সেই ‘Feast of Filth’ বলে তিরস্কৃত নাটকগুলোই মানবিক সত্যের সবচেয়ে নির্মোহ আয়না।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Saiyaara Movie Review | ভালবাসার রণক্ষেত্রে জয়ী হল ‘সাইয়ারা’: অহন-অনীতের আবেগঘন রসায়নে উদ্বেল বলিউড




