শর্মিষ্ঠা সাহা মৈত্র ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, চন্দননগর : চন্দননগর (Chandannagar) জুড়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেল অন্য রকম উৎসবের আবহ। দুর্গাপুজোর বিদায়ের সুর গুনগুনিয়ে উঠতেই চন্দননগরবাসী অপেক্ষা করতে থাকে আর এক মহোৎসবের, জগদ্ধাত্রী পুজো (Jagaddhatri Puja)। রীতি মেনে এই বছরের মতো বৃহস্পতিবার, দুর্গা পুজোর দশমীর দিন সম্পন্ন হয়ে গেল জগদ্ধাত্রীর কাঠামো পুজো (Kathamo Puja)। উমার বিদায়ের দিন যখন সর্বত্র বেদনার আবহ, তখনই চন্দননগরবাসীর কাছে শুরু হয়ে যায় আনন্দের অন্য অধ্যায়।
চন্দননগরের এই কাঠামো পুজো ঘিরে রয়েছে বহু বছরের ঐতিহ্য। স্থানীয়দের বিশ্বাস, দুর্গা পুজোর সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই দেবী জগদ্ধাত্রীর আগমনের প্রস্তুতি নিতে হয়। সেই কারণে দশমীর দিনই ক্লাবের সদস্যরা একত্র হয়ে প্রতিমার কাঠামোর পূজা দেন। তারপর থেকেই শুরু হয় প্রতিমা গড়ার আনুষ্ঠানিক কাজ। এক মাস পরে, অর্থাৎ কার্তিক মাসের শেষে মহাসমারোহে পালিত হয় জগদ্ধাত্রী পুজো। স্থানীয় এক পুজো উদ্যোক্তা সুভ্রজিৎ মুখোপাধ্যায় বলেন, “চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পুজো শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কাঠামো পুজো মানে আসন্ন আনন্দের ঘোষণা।” তিনি আরও জানান, কাঠামো পুজো থেকেই শুরু হয় প্রতিমাশিল্পীদের ব্যস্ততা। বাঁশ, খড়, কাদার গন্ধে তখন ভরে ওঠে মণ্ডপ চত্বর।
প্রতিমা গড়ার এই বিশেষ প্রথা নিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন প্রবীণ নাগরিক অরুণ পাল। তাঁর কথায়, “আমরা ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি দুর্গা বিদায়ের দিনই এখানে নতুন উৎসবের সূচনা হয়। যেন বিষাদের মধ্যে আনন্দের জন্ম।” তিনি আরও বলেন, জগদ্ধাত্রী পুজোকে ঘিরে চন্দননগরের আলোকসজ্জা সারা বাংলার মানুষকে টানে। প্রতিবছর চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পুজোর সময় ক’য়েক লক্ষ দর্শনার্থীর ভিড় জমে। এ প্রসঙ্গে স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনের সভাপতি সুশান্ত দে জানান, “জগদ্ধাত্রী পুজো চন্দননগরের অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এই পুজোকে ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা যেমন লাভবান হন, তেমনই শহরের রাস্তাঘাট, আলো আর শিল্পকলাও জাতীয় পর্যায়ে প্রশংসিত হয়।”
চন্দননগরের কাঠামো পুজো মানে আসলে সময়ের বাঁক। দুর্গা প্রতিমার নিরঞ্জনের আগে যখন মানুষ চোখে জল নিয়ে মাকে বিদায় জানান, তখনই চন্দননগরের গলিতে বাজতে শুরু করে নতুন কোলাহল। “হৈমন্তিকা”কে আহ্বান জানিয়ে ঢাকের শব্দ আর শঙ্খধ্বনি ভরিয়ে তোলে শহরের বাতাস।প্রতিমাশিল্পী রতন শীল বলেন, “কাঠামো পুজো হয়ে গেলে আমাদের জন্য শুরু হয় দিন-রাতের যুদ্ধ। প্রতিমার প্রতিটি বাঁক, দেবীর মুখাবয়ব ফুটিয়ে তুলতে সময় খুব কম থাকে। কিন্তু এটাই আমাদের পেশা নয়, আমাদের আবেগ।”
দশমীর দিন কাঠামো পুজোর সময় উপস্থিত থাকেন বিভিন্ন ক্লাবের সদস্যরাও। পাড়ায় পাড়ায় এই পুজোকে ঘিরে তৈরি হয় মিলনমেলা। ক্লাব সদস্য অরিন্দম সাহা বলেন, “আমরা ছোট থেকে এই দিনে অপেক্ষা করি। কাঠামো পুজো মানেই বন্ধুদের একসঙ্গে ভিড়, হাসি, আড্ডা আর নতুন উদ্দীপনা।” উল্লেখ্য, চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজো শুধুমাত্র বাংলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এই পুজোকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় আন্তর্জাতিক আকর্ষণও। ফরাসি উপনিবেশের ছোঁয়া পাওয়া এই শহরে আলোকসজ্জা, শিল্পকলা ও পুজোর জাঁকজমক দেশ-বিদেশের পর্যটকদেরও টেনে আনে।
চন্দননগরের ইতিহাসবিদ অমলেন্দু ভট্টাচার্য বলেন, “জগদ্ধাত্রী পুজোর সঙ্গে চন্দননগরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নাগরিক জীবনের বন্ধন অটুট। কাঠামো পুজো সেই ঐতিহ্যেরই প্রথম সোপান।” উল্লেখ্য যে,
প্রতিবারের মতো এ বছরও কাঠামো পুজোর দিন থেকেই শহর ভরে উঠছে আলো, রঙ আর প্রত্যাশায়। দুর্গাপুজোর পর শূন্যতা যেন বেশিক্ষণ জায়গা পায় না চন্দননগরে। দেবী জগদ্ধাত্রীর আগমনকে ঘিরে শহরবাসী এখন দিন গুনছে মহোৎসবের জন্য।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Shubho Bijoya 2025, Bijoya Dashami 2025 | শুভ বিজয়া দশমী ২০২৫: মিলন, মিষ্টি আর আবেগের উৎসব




