সুজয়নীল দাশগুপ্ত, কলকাতা ★ অক্টোবর ২, ২০২৫: দুর্গাপুজোর মহোৎসব শেষে বাঙালির সবচেয়ে আবেগঘন দিন বিজয়া দশমী। পাঁচ দিন ধরে মাতৃবন্দনায় মেতে ওঠার পর আজ বিদায়ের সুর। প্রতিমা বিসর্জনের সঙ্গে সঙ্গে ভেসে আসে কণ্ঠে, “আসছে বছর আবার হবে।” শহর থেকে মফস্বল, গ্রাম থেকে বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বাঙালি সমাজে এই দিনটি কেবল বিদায়ের নয়, তা নতুন সূচনার প্রতীক। ২০২৫ সালের এই বিজয়া দশমীও তার ব্যতিক্রম নয়।

এদিন সকাল থেকেই কলকাতার রাস্তায় রাস্তায়, পাড়ায় পাড়ায় দেখা মিলল লালপাড় শাড়িতে সেজে ওঠা মহিলাদের, ধুতি-পাঞ্জাবি পরা পুরুষদের। পূজা কমিটি থেকে ব্যক্তিগত পরিবার, সব জায়গাতেই সিঁদুরখেলার রঙে রঙিন হয়ে ওঠে পরিবেশ। উত্তর কলকাতার বাগবাজার থেকে দক্ষিণের দেশপ্রিয় পার্ক, এমনকী নববর্ষে জাঁকজমকের জন্য বিখ্যাত সল্টলেকের পূজামণ্ডপেও ভিড় ছিল উপচে পড়া। শুধু কলকাতাতেই নয়, গোটা রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা মণ্ডপে সকাল থেকেই ভিড় জমিয়েছেন মানুষ। শোভাযাত্রার আয়োজন হয়েছে একাধিক জায়গায়। নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান, বাঁকুড়া আসানসোল ইত্যাদি সব জায়গাতেই একই আবেগে মুখর জনতা।

বিজয়া দশমীর একটি বিশেষ সামাজিক দিক হল সম্পর্কের নবায়ন। এদিন ছোটরা বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রণাম জানায়, বন্ধুরা আলিঙ্গন করে, আত্মীয়-পরিজনের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিজয়ার মিষ্টিমুখ হয়। এদিনই মানুষ ভুলে যায় পুরনো বিরোধ, মনের দুঃখ-কষ্ট, আর নতুনভাবে শুরু করার অঙ্গীকার করে। প্রতিমা বিসর্জনের সময় আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন অনেকেই। ঢাকের শব্দ, উলুধ্বনি আর শঙ্খধ্বনিতে যখন মাতৃপ্রতিমা গঙ্গায় বা কাছের পুকুরে নিমজ্জিত হয়, তখন মানুষের চোখে জল আসে। কিন্তু সেই জল কেবল দুঃখের নয়, তা আশারও। মা আবার আসবেন, আবার শারদোৎসবের আনন্দে ভাসাবেন বাঙালিকে।

উত্তর কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়ির পূজো দেখতে আসা কলেজছাত্রী সায়ন্তিকা দত্ত জানালেন, “প্রতিবারের মতো এবারের বিজয়াতেও ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি। মা চলে যাচ্ছেন ঠিকই, তবে এই বিদায়ের ভেতরে এক অন্যরকম আনন্দও আছে,আসছে বছর আবার হবে।”

অন্যদিকে দক্ষিণ কলকাতার সুরুচি সংঘের সামনে বিসর্জন দেখতে আসা অভিষেক মুখোপাধ্যায় বলেন, “এই ক’দিন সবাই একসঙ্গে আনন্দ করলাম। বিজয়ার দিনটাতে তাই একটু কষ্ট হয়, তবে এটাও তো আমাদের সংস্কৃতিরই অংশ। মা আসেন, মা যান, এই আসা-যাওয়ার ভেতরেই জীবনের ছন্দ।”
আরও পড়ুন : Chittaranjan Park Durga Puja Samity (Regd), B-Block, celebrates the Golden Jubilee of its Durga Puja
উল্লেখ্য, প্রবাসী বাঙালিদের জন্যও বিজয়া ভিন্ন আবেগ বয়ে আনে। লন্ডন, নিউ ইয়র্ক কিংবা সিঙ্গাপুর, যেখানেই হোক না কেন, ছোট ছোট কমিউনিটি সেন্টারে বা সংগঠনের উদ্যোগে প্রতিমা বিসর্জন আর বিজয়া সম্মিলনী আয়োজন হয়। অনেকে ভিডিও কল বা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে দেশে থাকা পরিবার-পরিজনের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। প্রযুক্তি যেন দূরত্ব কমিয়ে দিয়েছে। উল্লেখ্য, দশমীর দিন মিষ্টির দোকানগুলোতেও ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। সন্দেশ, রসগোল্লা, ল্যাংচা থেকে শুরু করে নানারকম নতুন স্বাদের মিষ্টি—সবই আজকের দিনে অপরিহার্য। পাশাপাশি চিরাচরিত বিজয়ার বিশেষ খাবার, মুড়ি, নিমকি, নারকেল নাড়ু আজও অনেক পরিবারে দেখা মেলে।

এই বছর রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা মজবুত রাখা হয়েছে বলে উল্লেখ। বিসর্জনের জন্য আলাদা রুট, পুলিশের নজরদারি, এবং নদীতে এনডিআরএফ (NDRF) টিম প্রস্তুত বলে উল্লেখ। উল্লেখ্য, সামাজিক মাধ্যমে বিজয়া শুভেচ্ছা বার্তায় ভরে গিয়েছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম আর হোয়াটসঅ্যাপ। সাধারণ মানুষ থেকে সেলেব্রিটি, সবার টাইমলাইনে ভেসে এসেছে ‘শুভ বিজয়া’ বার্তা। আসলে বিজয়া দশমী কেবল ধর্মীয় রীতি নয়, এটি বাঙালির সামাজিক ঐতিহ্যেরও প্রতীক। বছরের পর বছর মানুষ একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। বিদায়ের দিনেও তাই বিজয়া যেন মিলনের উৎসব। মনে রাখতে হবে, এই দিনটি কেবল বিদায় নয়, বাঙালির কাছে সূচনার প্রতীক। বিজয়া দশমী ২০২৫ আমাদের আবার মনে করিয়ে দিল, সংস্কৃতি মানেই মিলন, আবেগ আর সম্পর্কের জাল। মা দুর্গার আশীর্বাদে এই সম্পর্ক যেন আরও অটুট থাকে, এটাই প্রত্যাশা।
সাশ্রয় নিউজ-এর সকল সংবাদদাতা, লেখক, পাঠক, কর্মী শুভাকাঙ্ক্ষী সহ সকলকে শুভ বিজয়ার প্রীতি ও শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। সবার ভাল হোক।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Durga Puja 2025, Punya Mati | দুর্গাপুজো ২০২৫: দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরিতে কেন লাগে যৌনকর্মীর উঠোনের মাটি?



