কৌশিক রায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক : বাংলার বর্ষা এলেই মাঠে-ঘাটে, গ্রামের মেঠোপথে কিংবা শহরের পার্কের কোণে উঁকি মারে ছোট ছোট কদম ফুল (Kadamba Flower)। সাদা ও হলুদের মিশ্রণে তৈরি সেই বলের মতো নরম ফুল হাতে নিয়ে আমরা অনেকেই মুগ্ধ হই। প্রেমিক-প্রেমিকারা ভালবাসা প্রকাশের প্রতীক হিসেবেও কদমকে বেছে নেয়। অথচ এই ছোট্ট সুন্দর ফুলটির আসল অর্থ হয়ত আমরা জানিই না! কদম ফুল (Kadamba Flower) কেবল উপহারের সৌন্দর্য নয়। প্রকৃতির ইতিহাসে, জীববৈচিত্রের ধারাবাহিকতায়-এর অবদান অগাধ। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে যখন অরণ্যে গাছে নতুন ফুল ফোটে না, ফল ধরতে দেরি হয়, তখন চুপিসারে পাকতে থাকে কদমের ফল। এই ফলই হয়ে ওঠে অরণ্যের ক্ষুধার্ত প্রাণীর বেঁচে থাকার অবলম্বন। বনপাখি, বাদুড় (Bat), কাঠবিড়ালি (Squirrel), হরিণ (Deer) পর্যন্ত কদমের ফল খেতে ভালবাসে। তাদের খাদ্যচক্রের গুরুত্বপূর্ণ এক স্তর এই ফল। তাই কদম ফুল ছিঁড়ে টেবিল সাজানোর মানে শুধু একটি ফুলের জীবন নেওয়া নয়, সেইসঙ্গে অজস্র বন্যপ্রাণীর খাদ্যসূত্র কেড়ে নেওয়া, এটি হয়ত কারও ভাবনাতেই আসেনি কখনও! একসময় কদম গাছ (Kadamba Tree) গ্রামীণ জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় (Subhash Mukhopadhyay) লিখেছিলেন, “আষাঢ়ে বর্ষায় কদম ফোটে, / মাটির গন্ধে মন জাগে।”
কবিতায় যেমন রোম্যান্স, প্রকৃতির কাছে এই গাছের মাহাত্ম্য তেমনি গভীর। গবেষকরা বলেন, কদম ফুল ও ফল উভয়ই অরণ্যের পোকা-মাকড় থেকে শুরু করে ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর খাদ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বর্ষা শেষে যখন অনেক গাছে ফল ফুরিয়ে যায়, তখন কদম গাছই তাঁদের (Kadamba Tree) শেষ অবলম্বন। কিন্তু আজকের দিনে শহরের পার্ক, রাস্তার ধারে, কলেজ চত্বরের এই কদম গাছও কমে যাচ্ছে। ‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ ফরেস্ট্রি’ (Indian Journal of Forestry) এক রিপোর্টে জানিয়েছে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমবঙ্গে (West Bengal) কদম গাছের সংখ্যা গত ১৫ বছরে প্রায় ৩০% কমেছে। কারণ? নগরায়ন, অরণ্য ধ্বংস ও মানুষের হাতে ফুল ছেঁড়ার বাড়াবাড়ি সেই কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা। প্রকৃতিবিদ অনুরাধা সিংহ (Anuradha Singh)-এর কথায়, ‘কদম গাছ শুধু সৌন্দর্য নয়, বর্ষাকালের ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য রক্ষা করে। এই ফুল ছিঁড়লে তা শুধু গাছের ক্ষতি নয়, অজস্র পাখি ও বনজ প্রাণীর খাদ্যও ছিঁড়ে ফেলার সমান।’
অন্য দিকে, বাংলার লোককথায় কদম গাছের একটি ভিন্ন গুরুত্ব রয়েছে। কৃষ্ণলীলায় কদম গাছের উল্লেখ আছে। বলা হয়, বৃন্দাবনে (Vrindavan) কৃষ্ণ (Krishna) কদম গাছের তলায় রাধার (Radha) সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। তাই কদম ফুলকে অনেকেই প্রেমের প্রতীক হিসেবে দেখে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore) কদম নিয়ে বহু গান লিখেছেন। যেমন,
‘নাচে নাচে পাগল কদম তলায়,
মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়।’
এই সাহিত্যিক রোম্যান্সের বাইরেও আছে কদমের বাস্তব ও বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য। কদম গাছের ছাল ও পাতা আয়ুর্বেদে বহু যুগ ধরে ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে এর ফল ও ফুলই প্রধানত বন্যপ্রাণীর খাদ্য হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে যখন আমরা উপহারের জন্য কদম ফুল ছিঁড়ি, তখন একবারও ভাবি না এই ফুলের জন্য হয়ত কোনও কাঠবিড়ালি (Squirrel) দিনভর অপেক্ষা করছিল। কোনও বুলবুলি (Bulbul) তার বাচ্চাদের মুখে এই ফল খাওয়ানোর স্বপ্ন দেখছিল! এইভাবে প্রতিটি ফুল ছেঁড়া মানে একটি জীবনের ক্ষুধা কেড়ে নেওয়া। প্রকৃতির দৃষ্টিতে কদম গাছের (Kadamba Tree) সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এই নয় যে, তা মানুষের টেবিল সজ্জার কাজে ব্যবহৃত হবে। বরং এই যে, সে নিঃশব্দে অরণ্যের ক্ষুধা মেটায়, ক্ষুদ্র প্রাণীদের জন্য জীবন দান করে সেটাই তার প্রকৃত মহিমা।
অরণ্যের খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষা করা মানুষের দায়িত্ব। পরিবেশবিদেরা বলছেন, শহরে বেশি বেশি কদম গাছ লাগানো প্রয়োজন। বর্ষা ও শরৎকালে যখন অন্যান্য গাছে ফল থাকে না, তখন এই গাছই হতে পারে জীববৈচিত্র্যের প্রধান ভরসা। এ যেন প্রকৃতির এক নিঃশব্দ সৈনিক, যে মানুষ নয়, অরণ্যের প্রতিটি প্রাণীর প্রতি সমান ভালোবাসা বয়ে আনে। তাই এবার থেকে প্রিয়জনকে উপহার দিতে চাইলে কদম ফুল নয়, তার বদলে কদম গাছ লাগানোর প্রতিশ্রুতি দিন। প্রকৃতি তখন কেবল আপনার প্রেমের নয়, মানবিকতারও সাক্ষী হয়ে থাকবে।
ছবি : সংগৃহীত। প্রতীকী।
আরও পড়ুন : Aamir Khan, Kiran Rao | বিচ্ছেদের পরও একইরকম ঘনিষ্ঠতা! কিরণ ও আমিরের সম্পর্ক নিয়ে মুখ খুললেন পরিচালক




