জগন্নাথ শংকর চৌধুরী (মহাবীর) : আজ ১২ই জানুয়ারি ২০২৬ সাল আর ১২ই জানুয়ারি ১৯৯৯ সালে এসএসসির মাধ্যমে সফল হয়ে বাংলা সহ শিক্ষিকা নিযুক্ত হয়ে তোমার চাকরি জীবন শুরু হয়েছিল, কালনা মহিষমর্দিনী ইন্সটিটিউশন, রাজবাড়ী, কালনা,পূর্ব বর্ধমান। এটাই ছিল তোমার প্রথম বিদ্যালয়।

এরপর দ্বিতীয়বার এসএসসি মাধ্যমে সসম্মানে ১৭ই মে ২০০৫ সালে শক্তিনগর গার্লস হাই স্কুল, শক্তিনগর, কৃষ্ণনগর, নদীয়া তোমার দ্বিতীয় বিদ্যালয়। এই সময় তোমার শারীরিক অবস্থা(স্পাইনাল সমস্যা যেখান থেকে পায়ে তীব্র যন্ত্রণা) ভীষণভাবে অবনতি হতে থাকে ব্রেক জার্নির জন্য। অবশেষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ তুমি কালনা ফিরবে। সেই মতো শুরু হল আলোচনা, যা বাস্তবায়িত হয় ১৭ই মে ২০১৭। মিউচুয়াল ট্রান্সফারের মাধ্যমে তোমার তৃতীয় স্কুল কালনা হিন্দু বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কালনা, পূর্ব বর্ধমান।

এরই মধ্যে যা আমাদের অজানা সেটা হল, এত ঘড়ির কাঁটা মতো সময় না কম না বেশি একদম ১২ বছর। শক্তিনগর গার্লস হাই স্কুল ১৭ই মে ২০০৫ এবং কালনা হিন্দু বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ১৭ই মে ২০১৭।
আজও স্মৃতিতে জড়িয়ে রয়েছে তোমার দ্বিতীয় বিদ্যালয় শক্তিনগর গার্লস হাই স্কুলের কত স্মরণীয় মুহূর্ত।কখনো তোমার ব্যক্তিগত কারণে আবার কখনো স্কুলের দিদি দের ডাকে উপস্থিত হয়েছি। দিদিদের কাছ থেকে পেয়েছি অফুরান স্নেহ, ভালোবাসা এবং সম্মান যা অনস্বীকার্য।

দেখতে দেখতে আজ ২৭ বছর তোমার নিরবিচ্ছিন্ন কর্ম জীবন পূর্ণ করে ২৮ বছরে পা দিলে। পড়াশোনা করতে করতে মাঝে চাকরি, পরে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ পূর্ণ করে কালনা কলেজ থেকে বি এড।২০০৬ সালে ২৯ শে নভেম্বর সাত পাকে বাঁধা।সেদিন তুমি মমতা রায় থেকে হয়েছিলে মমতা চৌধুরী রায়।মাঝে ২০০৭-২০০৮ সালে নেতাজি সুভাষ ওপেন ইউনিভার্সিটি থেকে এডুকেশনে এম এ করার সময় দেখেছি শিক্ষার প্রতি তোমার ব্যাকুলতা তাই ছুটে ছুটে গেছি তোমার সাথে কখনো কল্যাণী, কখনো শ্যামনগর আবার কখনও সোদপুর।

বরাবরই তুমি বিদ্যালয় এবং তোমার ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে চলেছ যা আজও নিরন্তর। প্রত্যেক বছর যে সময় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতো ভাদ্র মাস থেকে আশ্বিন মাসের দশ তারিখ পর্যন্ত তখনো এই ভরা গঙ্গা তুমি পারাপার করে বিদ্যালয়ে যেতে এবং আসতে। একদিনের জন্য তুমি স্কুলে যাওনি এরকম কিন্তু হয়নি।
তোমার মধ্যে জাতীয়তাবোধ ভীষণভাবে লক্ষ্য করেছি। সমস্ত মনীষীদের জন্ম এবং মৃত্যু দিবস বা জয়ন্তী পালন করা।শক্তিনগর গার্লস এ কর্মরত অবস্থায় বিশেষ করে ২৬ শে জানুয়ারি এবং ১৫ ই আগস্ট ভোর বেলায় কালনা নৃসিংহপুর ঘাট পার হয়ে বাস ধরে বেরিয়ে যেতে বিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলনের জন্য এবং কোনদিন এই দিনগুলিতে তুমি কিন্তু অনুপস্থিত হওনি যা আজও সেই ধারা বয়ে চলেছে। আবার বিদ্যালয় এবং ছাত্র-ছাত্রীদের ভালোর জন্য শক্তি নগরে বহুবার সিনিয়র দিদিদের বাড়িতে রাত্রি বাস করে পরের দিন নিজের কর্তব্য করে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরতে।
শক্তিনগর এ চাকরি করার সময় সকাল ৮ টা থেকে ৮.২০ মধ্যে বাইকে চেপে প্রথমে কালনা ঘাট তারপর ভুটভুটিতে চেপে পার হয়ে নৃসিংহপুর বাস স্ট্যান্ড(তখন অবশ্য বাস স্ট্যান্ড ঘাট থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে ছিল)থেকে বাস পেলে ভালো না হলে বাইকে অথবা অটো ধরে কখনো মতিগঞ্জের মোড় আর না হলে বাইপাস সড়ক আবার প্রয়োজন পড়লে বিদ্যালয় পর্যন্ত বাইকে। আর হ্যাঁ মনে পড়ে গেল সেই কথা, একবার নৃসিংহপুর ঘাট থেকে তুমি ফোন করেছিলে কি না, কোন কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না আর সেদিন আমার অসুবিধা ছিল। আমি শুধু এইটুকুই বলেছিলাম, কিছু যদি না পাওয়া যায় তাহলে আজকে আর স্কুলে যেতে হবে না কিন্তু তুমি বলেছিলে বাড়ি থেকে যখন বেরিয়ে এসেছি স্কুলে যাব বলে তো স্কুলে যাবই। কাজের চাপে তোমাকে ফোন করা হয়ে ওঠেনি হঠাৎ করে বেশ খানিকক্ষণ পর ফোন বেজে উঠল।তোমার ফোন,আমি স্কুলে পৌঁছে গেছি। আমি হতবাক হয়েছিলাম।এই সময়ে কি করে সম্ভব? তুমি বলেছিলে, শ্রদ্ধেয় অমিয় সিংহ রায় কাকু আমাকে দেখতে পেয়ে ডেকে নেয়।মমতা,মমতা আয় আমার গাড়িতে চল তোকে স্কুলে ছেড়ে দেবো। এইরকম ঘটনাও বেশ কয়েকবার ঘটেছে।ভাবা যায়? শ্রদ্ধেয় অমিয় সিংহ রায় কাকা তখন নদিয়া জেলা কন্ট্রোলার পদে কর্মরত এবং তোমার রেশন কার্ডও কাকার সহযোগিতায় কালনায় ট্রান্সফার সম্ভব হয় ঠিক তেমনি এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যখন তুমি মিউচুয়াল ট্রান্সফার নিয়ে কালনা হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় যোগ দিলে তখন কালনা হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়ের ২০১৭ সালে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদ অলংকৃত করেছিলেন শ্রদ্ধেয় অমিয় সিংহ রায় কাকা।

যখন তোমার আগের বা বর্তমান বিদ্যালয় এবং ছাত্র-ছাত্রীদের থেকে শুনতে পাই বা জানতে পারি,আপোষহীন শ্রদ্ধা এবং সততা ও নিষ্ঠার কথা। এমনকি সোশ্যাল মিডিয়াতে পর্যন্ত তোমার ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের প্রতি যে স্নেহ এবং অফুরান ভালোবাসা সঙ্গে ক্লাসে পঠন পাঠন নিয়ে খুবই সন্তোষজনক মতামত ভীষণভাবে আনন্দ এবং গর্ববোধ করি।
সত্যি করে মনেপ্রানে বিশ্বাস করি, “শিক্ষক বা শিক্ষিকা হচ্ছেন জাতির মেরুদন্ড এবং সমাজ গড়ার কারিগর”।তোমার উল্লেখযোগ্য দিক হল, তুমি তিনটি জিনিসকে খুব মান্যতা দাও ১) ফ্রেন্ড ২) ফিলোজাফার ৩) গাইড।বর্তমান সংসারের সমস্ত কাজ (বাড়ির এবং সারমেয়দের)সামলে করা শুধু মুখের কথা না। কোনও চলার পথ সহজ হয় না তার জন্য অনেক দৃঢ় মানসিকতার দরকার যা তোমার আছে। পাশে ছিলাম,আছি এবং থাকব।
বরাবরই তুমি ভীষণ স্পষ্টবাদী এবং এও জানি স্পষ্ট কথা বলার জন্য অনেকেই তোমাকে ভুল বোঝে বা বোঝায় তোমার সম্পর্কে। যাইহোক সত্যের পথ বড় কঠিন হয়। তুমি একজন শিক্ষিকা আর মনীষীদের কথায় “কোন কিছুর জন্য সত্যকে ত্যাগ করা যায় না”আর সত্যকে প্রমাণও করতে হয় না কারণ সত্য একদিন নিজে থেকে প্রকাশিত হয়। মা জগদম্বার কাছে প্রার্থনা, তোমার কর্মজীবন আরো গৌরবময় হোক। এগিয়ে চলো মানসিক দৃঢ়তার সাথে আপোষহীন একজন সৎ এবং নিষ্ঠাবান শিক্ষিকা হিসাবে ছাপ রেখো এই সমাজে।
লেখিকা হিসেবে তোমার স্বরচিত কবিতা,গদ্য,উপন্যাস, চিঠি,গল্প আজ প্রশংসিত। দৈনিক ও বাণিজ্যিক এবং লিটল ম্যাগাজিনসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সসম্মানে লেখার মাধ্যমে তুমি তোমার পাঠক-পাঠিকাদের এবং বিশেষভাবে এই লেখালেখি প্রকাশিত হওয়ার জন্য যে সকল শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিবর্গ অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন ভবিষ্যতে প্রশংসার মানকে আরোও উন্নত করবে এই আশাই রাখি।সঙ্গে ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেবের কথা,”জীব সেবা শিব সেবা” সাধ্যমত চালিয়ে যাও। তোমার আগামী দিনের জন্য রইল, অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও শুভকামনা। খুব ভালো থেকো এবং কর্তব্যে অবিচল থেকো।




