সুজয়নীল দাশগুপ্ত ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, বুয়েনস আইরেস: বয়স কেবল সংখ্যা এই কথাটিকে যেন নতুন করে প্রমাণ করে চলেছেন লিয়োনেল মেসি (Lionel Messi)। ৩৯-এর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও তাঁর পায়ের জাদুতে আবার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে আর্জেন্টিনা (Argentina)। চলতি প্রতিযোগিতায় মাত্র দুই ম্যাচে পাঁচ গোল করে ইতিমধ্যেই আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন তিনি। মাঠে তাঁর উপস্থিতি, বল নিয়ন্ত্রণ, গোলের ক্ষুধায় আবারও ফুটবল দুনিয়ার নজর কাড়ছেন লিও। এই দুরন্ত পারফরম্যান্সের পর থেকেই ফুটবল মহলে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, তিন বছর আগেই কি এই বিশ্বকাপ জয়ের পরিকল্পনা করে ফেলেছিলেন মেসি? ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যায়। সেই সময় তিনি খেলছিলেন প্যারিস সঁ জরমঁ (Paris Saint-Germain)-এ। বিশ্বকাপ জয়ের পর ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে ২০২৩ সালে তিনি পাড়ি দেন আমেরিকার মেজর লিগ সকারে, ইন্টার মায়ামিতে (Inter Miami)। এই সিদ্ধান্তই এখন অনেকের মতে তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
আর্জেন্টিনার কোচ লিয়োনেল স্কালোনি (Lionel Scaloni) মেসির বর্তমান ফর্ম নিয়ে বলেন, ‘লিয়ো যত দিন চাইবে, তত দিন নিজের সেরা খেলাটা খেলতে পারবে। গত দুই দশক ধরে সে সেটাই করে আসছে।’ তাঁর এই মন্তব্য যেন মাঠের পারফরম্যান্সেই প্রতিফলিত হচ্ছে। আবার ফ্রান্সের প্রাক্তন তারকা থিয়েরি অঁরি (Thierry Henry) আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেন, ‘মেসি আলাদা। ও অন্যদের মতো নয়। ও যেন অন্য জগতের ফুটবলার।’ এমন মন্তব্যই বোঝায়, বয়স বাড়লেও মেসির প্রভাব কতটা অটুট।
এই বিশ্বকাপ যে মেসির শেষ, তা নিয়ে প্রায় নিশ্চিত ফুটবল বিশ্ব। কিন্তু তাঁর খেলা দেখে তা বোঝার উপায় নেই। বরং আগের মতোই দলের প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন ফুটবলার অ্যালেক্সি লালাস (Alexi Lalas) মন্তব্য করেন, ‘আর্জেন্টিনার খেলার কেন্দ্রবিন্দু মেসি। ও-ই পুরো সিস্টেমকে চালায়। দলের বাকিরা ওকে ঘিরেই নিজেদের ভূমিকা ঠিক করে।’ উল্লেখ্য, মেসির আমেরিকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তখন নানা আলোচনা হয়েছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো ক্যারিয়ারের শেষ পর্বে আরাম খুঁজছেন তিনি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সেটাই ছিল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। ইউরোপে একটি মরসুমে প্রায় ৫০টি ম্যাচ খেলতে হয়, যেখানে মেজর লিগ সকারে ম্যাচ সংখ্যা তুলনায় কম। ফলে শরীরের উপর চাপ কম পড়ে। মেসি নিজেই ম্যাচ বেছে খেলার স্বাধীনতা পেয়েছেন ইন্টার মায়ামিতে (Inter Miami)।
ডেভিড বেকহ্যাম (David Beckham)-এর ক্লাব মেসিকে সেই স্বাধীনতা দিয়েছে, আর তার ফলও পেয়েছে। যে দল আগে তেমন সাফল্য পায়নি, সেই ইন্টার মায়ামি মেসির নেতৃত্বে অল্প সময়েই ট্রফি জিতেছে। ক্লাব ফুটবলে চাপ কমিয়ে জাতীয় দলের জন্য নিজেকে আরও প্রস্তুত করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। এর আগে বার্সেলোনাতে (FC Barcelona) খেলাকালীন অতিরিক্ত ম্যাচ খেলার ফলে জাতীয় দলে তাঁর পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন উঠত। অনেকেই বলতেন, ক্লাবেই বেশি সফল মেসি। কিন্তু প্যারিস সঁ জরমঁ (Paris Saint-Germain)-এ যাওয়ার পর সেই চাপ কিছুটা কমে, যার ফল ২০২২ সালের বিশ্বকাপে দেখা যায়। এখন আমেরিকায় গিয়ে সেই চাপ আরও কমিয়ে নিজের সেরাটা তুলে ধরছেন তিনি। মেসি নিজে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি খেলতে ভালবাসি, প্রতিযোগিতা ভালবাসি। বিশ্বকাপে নামার আনন্দ অন্য সব কিছুর থেকে আলাদা।’ তাঁর এই মানসিকতাই তাঁকে আজও সেরাদের সারিতে রেখেছে।
শুধু নিজে নয়, দলের সমন্বয়ও আরও মজবুত করেছেন মেসি। ইন্টার মায়ামি (Inter Miami)-তে নিজের সতীর্থ রদ্রিগো ডি পল (Rodrigo De Paul)-কে নিয়ে আসেন। মাঠে তাঁদের বোঝাপড়া এখন আর্জেন্টিনার আক্রমণের বড় অস্ত্র। সাম্প্রতিক ম্যাচে ডি পলের পাস থেকেই মেসির গোল এসেছে, যা তাঁদের বোঝাপড়ার প্রমাণ। ডি পল বলেন, ‘আমরা অনেক দিন ধরে একসঙ্গে অনুশীলন করছি। তার ফল মাঠে দেখা যাচ্ছে। মেসিকে দেখে বয়স বোঝা যায় না, ও এখনও একইভাবে উপভোগ করে খেলছে।’ আবার মেসির মানসিক শক্তির কথাও বারবার উঠে আসছে। স্পেনের টেনিস কিংবদন্তি রাফায়েল নাদাল (Rafael Nadal)-এর জীবন নিয়ে তৈরি একটি সিরিজ থেকে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন বলে জানান। তাঁর কথায়, ‘যত দিন মনে হবে খেলতে পারব, তত দিন খেলে যাব।’ এই মানসিকতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন, বরং একটি চলমান শক্তি, যার উপর নির্ভর করছে গোটা আর্জেন্টিনা দল। তাঁর নেতৃত্বে দল যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে আবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে সমর্থকরা। মাঠে তাঁর প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি গোল যেন নতুন করে বিশ্বাস জাগাচ্ছে, লিয়োনেল মেসি (Lionel Messi) থাকলে অসম্ভব বলে কিছু নেই। আর সেই বিশ্বাসকেই সঙ্গী করে আর্জেন্টিনা এগিয়ে চলেছে আরও একবার বিশ্বজয়ের লক্ষ্যে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Lionel Messi best player | ‘মেসি এই গ্রহের নন!’ বিশ্বকাপের মাঝেই জাভির প্রশংসায় ঝড়, এমবাপেও মানলেন ‘সবার উপরে লিয়ো’



