পার্বতী কাশ্যপ, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : ভারতীয় বিবাহ (Indian Wedding) শুধু একটি সামাজিক অনুষ্ঠান নয়, এটি দু’টি আত্মার মিলন, দু’টি পরিবারের বন্ধন এবং এক নতুন জীবনের সূচনা। তার মধ্যেও সবচেয়ে আবেগময়, গভীর এবং বিশেষ মুহূর্ত হল সিঁদুরদান (Sindoor Ceremony)। কনের সিঁথিতে বর সিঁদুর পরাচ্ছেন, এই দৃশ্যেই যেন সৃষ্টি হয় নতুন সম্পর্কের ভিত্তি। আশ্চর্যজনকভাবে, বর একবার নয়, পরপর তিনবার সিঁদুর পরান কনেকে। যুগযুগ ধরে চলে আসা এই রীতির ভিতর লুকিয়ে আছে ধর্মীয় তাৎপর্য, শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা এবং দেবীশক্তির (Divine Feminine Energy) প্রতি বিশ্বাস। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, বিবাহ মানে শুধু দুই মানুষের একত্রে থাকা নয়, বরং তাঁদের জীবনযাত্রায় সঠিক শক্তি, জ্ঞান ও আনন্দ স্থায়ী করা। সেই কারণেই তিনবার সিঁদুরদানকে প্রথা নয়, বরং আধ্যাত্মিক আহ্বান হিসেবে দেখা হয়। বহু পণ্ডিত (Pandit) ও শাস্ত্রবিশারদ (Scholar) বলেছেন, তিনবার সিঁদুর দেওয়া মানে তিন দেবীর আশীর্বাদ প্রার্থনা করে দাম্পত্যের ভিত্তি মজবুত করা।

বিবাহমণ্ডপে যখন বর প্রথমবার কনের সিঁথিতে সিঁদুর ছোঁয়ান, চারদিকে শোনা যায় শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, সেই মুহূর্তটিই বিবাহিত জীবন শুরুর প্রথম পদক্ষেপ। সবাই জানেন, সিঁদুর বিবাহিত নারীর সর্বাধিক পবিত্র প্রতীক, স্বামীর দীর্ঘায়ু, দাম্পত্যের সুখ এবং সম্পর্কের অটুটতার প্রতীক। কিন্তু তিনবার সিঁদুর পরানোর রীতি যে এত গভীর অর্থ বহন করে, তা অনেকেই জানেন না। হিন্দু শাস্ত্র মতে তিন দেবীর তিন শক্তিকেই আহ্বান করা হয় তিনবার সিঁদুরদান করার মাধ্যমে।
প্রথমবার সিঁদুর: দেবী লক্ষ্মীর (Lakshmi) আশীর্বাদ। শাস্ত্রজ্ঞদের মতে, প্রথমবার সিঁদুর পরানোর সময় বর মূলত দেবী লক্ষ্মীর করুণা আহ্বান করেন। লক্ষ্মী হলেন সমৃদ্ধি, সম্পদ ও সৌভাগ্যের দেবী। বিবাহিত দম্পতির জীবনে যেন সুখ, সম্পদ, প্রাচুর্য এবং সৌহার্দ্য বজায় থাকে, এই বিশ্বাসেই প্রথমবার সিঁদুর ছোঁয়ানো হয়। পণ্ডিতদের কথায়, “লক্ষ্মীর আশীর্বাদ ছাড়া গৃহস্থ জীবন পূর্ণতা পায় না।”

দ্বিতীয়বার সিঁদুর: দেবী সরস্বতীর (Saraswati) জ্ঞান ও প্রজ্ঞা। দ্বিতীয়বার সিঁদুর দেওয়ার মুহূর্তটি জ্ঞান, শিক্ষা ও প্রজ্ঞার প্রতীক। দেবী সরস্বতী দাম্পত্য জীবনে বুদ্ধি, ভারসাম্য ও বোঝাপড়া বজায় রাখতে সাহায্য করেন। কারণ শুধুমাত্র ভালবাসা দিয়ে সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয় না- প্রয়োজন সম্মান, যুক্তিবোধ এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। শাস্ত্রবিশারদদের মতে, “সরস্বতীর আশীর্বাদ থাকলে দাম্পত্যে ভুল বোঝাবুঝি কমে এবং সিদ্ধান্তগুলি শুভ হয়।”
তৃতীয়বার সিঁদুর: দেবী পার্বতীর (Parvati) শক্তি ও সুরক্ষা। তৃতীয়বার সিঁদুর পরানোর মাধ্যমে আহ্বান করা হয় দেবী পার্বতীর শক্তি। তিনি শক্তি, সাহস এবং রক্ষার প্রতীক। জীবনে বাধা-বিপত্তি, অসুখ-বিসুখ, অশুভ শক্তি বা দুঃসময়-দম্পতি যাতে একসঙ্গে লড়াই করতে পারে, সেই শক্তিই দেন পার্বতী। পুরোহিতদের মতে, “এই তৃতীয় সিঁদুরই দাম্পত্যের আসল রক্ষাকবচ।”
সিঁদুর যদি নাকে পড়ে? কেন বলা হয় অত্যন্ত শুভ?
বিবাহ মণ্ডপে অনেক সময় দেখা যায় সিঁদুর পরানোর সময় কিছু সিঁদুর কনের নাকের ওপর পড়ে যায়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এটি অত্যন্ত শুভ লক্ষণ। বলা হয়, এটি সৌভাগ্য, সমৃদ্ধি এবং দাম্পত্যে আনন্দ বৃদ্ধির সংকেত। অনেকে বিশ্বাস করেন, এতে দাম্পত্যে ভালবাসা আরও গভীর হয়।
এক বছর ধরে একই সিঁদুর ব্যবহার, কেন এমন রীতি? প্রচলিত মতে, কনেকে অন্তত এক বছর সেই সিঁদুরই ব্যবহার করতে বলা হয়, যা তাঁর বিবাহের দিনে পরানো হয়েছিল। এটি দাম্পত্যের স্থায়িত্ব ও প্রেমের শুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। অনেকে বলেন, এতে দম্পতির জীবনে স্থায়িত্ব, নিবিড়তা এবং মনোযোগ বাড়ে। উল্লেখ্য, সিঁদুরদান রীতিটি তাই শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক সংযোগ। এই রীতি যুগ যুগ ধরে ভারতীয় বিবাহের অন্যতম ভিত্তি হয়ে আছে। বিবাহের মতো পবিত্র বন্ধনে দেবীশক্তির আহ্বান, এক কথায় এটিই তিনবার সিঁদুর দেওয়ার সবচেয়ে বড় রহস্য।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Arjun Tendulkar wedding | আইপিএলের আগেই জীবনের নতুন ইনিংস, ৫ ফেব্রুয়ারি বিয়ের পিঁড়িতে বসছেন অর্জুন, সুখবর শোনালেন সচিন




