সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কুয়ালালামপুর: ঝাঁ-চকচকে রাজপ্রাসাদ, রাজকীয় আড়ম্বর আর ক্ষমতার মোড়কে ঢাকা এক ভয়াবহ বাস্তবতা-এ বার সেই পর্দা সরালেন ইন্দোনেশিয়ান-আমেরিকান মডেল মনোহারা ওডেলিয়া (Manohara Odelia), মালয়েশিয়ার রাজপরিবারের বিরুদ্ধে সরাসরি মুখ খুলে তিনি এমন অভিযোগ তুলেছেন, যা ঘিরে আন্তর্জাতিক স্তরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। মনোহারার দাবি, সাবালক হওয়ার আগেই তাঁকে জোর করে মালয়েশিয়ার যুবরাজ টেংকু মুহাম্মদ ফাখরি পেত্রার (Tengku Muhammad Fakhry Petra) সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই বিয়েতে তাঁর সম্মতি ছিল না, এমনকি আইনি ভাবে সম্মতি দেওয়ার মতো তাঁর বয়সও ছিল না বলে উল্লেখ।
সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে একাধিক পোস্টে নিজের জীবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে এনেছেন মনোহারা। বর্তমানে ৩৩ বছর বয়সী এই মডেল জানিয়েছেন, রাজপরিবারের প্রভাব এবং ক্ষমতার জোরে তাঁর শৈশব ও কৈশোর কার্যত ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তাঁর কথায়, ‘যা ঘটেছিল, তাকে কোনও ভাবেই প্রেম বা স্বেচ্ছার সম্পর্ক বলা যায় না। এটি ছিল জোর করে চাপিয়ে দেওয়া এক সম্পর্ক, যেখানে আমার ইচ্ছা বা মতামতের কোনও মূল্যই ছিল না।’ মনোহারার বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি যখন নাবালিকা, তখনই তাঁকে যুবরাজের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করা হয়। সমাজমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে তিনি স্পষ্ট করে লেখেন, ‘এটি কোনও আইনি বিবাহ ছিল না। আমি স্বেচ্ছায় এতে জড়াইনি। সেই সময় আমার বয়সই ছিল না সম্মতি দেওয়ার মতো। সবটাই হয়েছিল আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে।’ তাঁর এই বক্তব্য সামনে আসতেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, ক্ষমতার আড়ালে শিশু অধিকার ও মানবাধিকার কী ভাবে লঙ্ঘিত হয়, তা নিয়ে। এই প্রসঙ্গে মনোহারা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আবেদন জানিয়েছেন। তিনি অনুরোধ করেছেন, সংবাদমাধ্যম এবং সমাজমাধ্যমে যেন তাঁকে ‘মান্তান ইস্ত্রি’ অর্থাৎ যুবরাজের প্রাক্তন স্ত্রী বলে সম্বোধন না করা হয়। তাঁর যুক্তি, ‘প্রাক্তন স্ত্রী’ শব্দ-বন্ধটি তখনই প্রযোজ্য, যখন দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে আইনি ও স্বেচ্ছাসম্মত বৈবাহিক সম্পর্ক থাকে। তাঁর ক্ষেত্রে তা হয়নি। তাঁকে এই নামে ডাকলে তাঁর উপর হওয়া অন্যায় ও নির্যাতনকে অস্বীকার করা হয়।
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে মালয়েশিয়ার কেলান্তান (Kelantan) রাজ্যের সুলতানের পুত্র টেংকু মুহাম্মদ ফাখরি পেত্রার সঙ্গে মনোহারার বিয়ের খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোড়ন ফেলেছিল। সেই সময় রাজকীয় বিয়ে হিসেবে প্রচারিত হলেও, নেপথ্যে যে ভয়ংকর বাস্তবতা লুকিয়ে ছিল, তা এত দিন প্রকাশ্যে আসেনি। মনোহারার সাম্প্রতিক দাবি অনুযায়ী, বিয়ের পর থেকেই তাঁর জীবনে শুরু হয় নির্যাতনের অধ্যায়। মনোহারা জানিয়েছেন, রাজপ্রাসাদের ভিতরে তাঁকে বন্দী করে রাখা হত। স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার অধিকার তো দূরের কথা, নিজের বাবা-মা বা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করারও অনুমতি ছিল না। তাঁর অভিযোগ, ‘আমি ক্রমাগত শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছি। আমাকে এমন ভাবে আটকে রাখা হয়েছিল, যেন আমি কোনও মানুষ নই, বরং একটি সম্পত্তি।’ এই বক্তব্য সামনে আসতেই মানবাধিকার সংগঠনগুলির একাংশ নতুন করে তদন্তের দাবি তুলেছে।
নাটকীয় ঘটনা ঘটে ২০০৯ সালে। একটি রাজকীয় সফরের সময় সিঙ্গাপুরে (Singapore) অবস্থান করছিলেন মনোহারা। সেই সময় একটি হোটেল থেকে তিনি কৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। নিজের কথায়, ‘ওটাই ছিল আমার জীবনের একমাত্র সুযোগ। জানতাম, পালাতে না পারলে হয়তো আর কোনও দিন মুক্তি পাব না।’ স্থানীয় প্রশাসন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের (US Embassy) সহায়তায় শেষ পর্যন্ত তিনি ইন্দোনেশিয়ায় (Indonesia) নিজের পরিবারের কাছে ফিরে যেতে সক্ষম হন। এই ঘটনার পর দীর্ঘ সময় নীরব থাকলেও, অবশেষে সমাজমাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে আনলেন মনোহারা। বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযোগ শুধু একটি ব্যক্তিগত কাহিনি নয়, বরং ক্ষমতা, রাজতন্ত্র এবং নারী ও শিশুর অধিকার লঙ্ঘনের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজপরিবারগুলির অন্দরমহলে কী ধরনের সামাজিক বাস্তবতা লুকিয়ে থাকতে পারে, তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
যদিও মালয়েশিয়ার রাজপরিবারের তরফে এখনও পর্যন্ত এই অভিযোগ নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে মনোহারার বক্তব্য ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এই অভিযোগের নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক তদন্ত হওয়া জরুরি। কারণ, নাবালিকার সঙ্গে জোরপূর্বক বিবাহ এবং পরবর্তী নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। উল্লেখ্য, মনোহারা ওডেলিয়ার মুখ খোলা বিশ্বজুড়ে বহু নীরব কণ্ঠের প্রতিধ্বনি। রাজকীয় পরিচয়, ক্ষমতা বা প্রভাব, কোনও কিছুর আড়ালেই যে মানবাধিকার লঙ্ঘন চাপা দেওয়া যায় না, তাঁর এই সাহসী বক্তব্য সেটাই নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Rajasthan mobile ban, camera phone ban for women | প্রজাতন্ত্র দিবস থেকে ক্যামেরাযুক্ত মোবাইল নিষিদ্ধ! রাজস্থানের গ্রাম পঞ্চায়েতের ফরমান ঘিরে তীব্র বিতর্ক




