সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন মোড় নিল। বিশেষ নিবিড় সংশোধনী বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়ে রাস্তায় নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। আগামী ৬ মার্চ, শুক্রবার দুপুর ২টো থেকে কলকাতার ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেল চত্বরে অবস্থান-বিক্ষোভে বসবেন তিনি। এই কর্মসূচী ঘোষণা করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। তিনি রবিবার দলীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আন্দোলনের রূপরেখা তুলে ধরেন। প্রসঙ্গত, ভোটার তালিকার প্রথম দফা প্রকাশের পর পরিসংখ্যান ঘিরে জোরাল বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত তথ্যে দেখা গিয়েছে, প্রায় ৬৩ লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। পাশাপাশি, আরও প্রায় ৬০ লক্ষ নাম ‘বিবেচনাধীন’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক নাম বিয়োজন ও অনিশ্চয়তার প্রেক্ষিতে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস সরব হয়েছে।
রবিবার তৃণমূল ভবনে আয়োজিত বৈঠকে অভিষেক বলেন, ‘৬ তারিখ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মেট্রো চ্যানেলে প্রতিবাদ কর্মসূচী নিয়েছেন। অবস্থান বিক্ষোভ ও ধর্নায় বসবেন তিনি।’ তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, ওই দিনই পরবর্তী কর্মপন্থা ঘোষণা করতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজনৈতিক মহলে এই ঘোষণাকে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে, কারণ নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা প্রশ্নে সরাসরি পথে নামছেন রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান। তৃণমূল নেতৃত্বের অভিযোগ, এসআইআর প্রক্রিয়ার নামে বহু বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাদের বক্তব্য, ‘গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় আন্দোলন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।’ বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, পরিযায়ী শ্রমিক এবং সমাজের প্রান্তিক মানুষেরাই বেশি প্রভাবিত হয়েছেন বলে দাবি দলের। অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনিক ত্রুটি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্তের জেরে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রসঙ্গত, এসআইআর প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকেই রাজ্যের শাসকদল এবং ভারতের নির্বাচন কমিশন -এর মধ্যে মতপার্থক্য সামনে এসেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই মতবিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী কয়েক দিন আগেই তাঁর বিধানসভা কেন্দ্রের এক অনুষ্ঠানে ভোটার বিয়োজন নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি তখন উল্লেখ করেছিলেন, ‘এক লক্ষেরও বেশি ভোটার বাদ যেতে পারে।’ কিন্তু প্রকাশিত তালিকার সংখ্যাতত্ত্বে দেখা যায়, বিয়োজনের পরিমাণ তার বহু গুণ বেশি।
শাসকদলের তরফে আরও দাবি করা হয়েছে, কেন্দ্রের শাসকদল ভারতীয় জনতা পার্টি (Bharatiya Janata Party – BJP) -এর প্রভাবেই কমিশনের পদক্ষেপ হয়েছে। অভিষেক অভিযোগ করেন, ‘যাঁরা বিজেপিকে ভোট দেন না, তাঁদের নাম বেছে বেছে বাদ দেওয়া হয়েছে।’ যদিও এই অভিযোগের বিষয়ে কমিশন এখনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি। তৃণমূলের বক্তব্য অনুযায়ী, কেবল সাধারণ মানুষই নন, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নামও ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় রয়েছে। রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী, মন্ত্রী তাজমুল হোসেন এবং আমডাঙার বিধায়ক রফিকুর রহমানের নাম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে দাবি দলের। এ নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা। অন্যদিকে, ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেল চত্বর দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রতিবাদের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ৬ মার্চের কর্মসূচীকে ঘিরে ইতিমধ্যেই সংগঠনের তরফে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। দল জানিয়েছে, কর্মসূচী শান্তিপূর্ণভাবেই হবে এবং ভোটারদের নাম দ্রুত পুনর্বহালের দাবিতে স্মারকলিপি দেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে বৃহত্তর আন্দোলনের পথেও হাঁটার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটার তালিকা নিয়ে এই আন্দোলন আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আবহে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ভোটার বিয়োজন ও সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। তৃণমূল নেতৃত্ব চাইছে এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে জনমত গড়ে তুলতে। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের তরফে আগেই জানানো হয়েছে যে সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ম মেনেই চলছে এবং আপত্তি বা দাবি থাকলে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে আবেদন জানানো যাবে। বিচারবিভাগীয় পর্যবেক্ষণের পরই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে বলেও কমিশন সূত্রে ইঙ্গিত রয়েছে। ফলে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জল্পনা তুঙ্গে।
৬ মার্চের ধর্না কর্মসূচী ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। ভোটার তালিকা প্রশ্নে সরাসরি আন্দোলনে নামার সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়বে। নির্বাচনের আগে এই ইস্যু কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে; তবে আপাতত ধর্মতলা চত্বরে নজর গোটা রাজ্যের।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন :




