সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অসামঞ্জস্য দূর করতে উদ্যোগী হল স্কুল শিক্ষা দফতর (School Education Department)। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ‘উদ্বৃত্ত’ বা সারপ্লাস শিক্ষকদের তালিকা চেয়ে পাঠানো হয়েছে প্রশাসনের তরফে। লক্ষ্য, যেখানে শিক্ষক কম সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী বদলি করে পঠনপাঠন স্বাভাবিক রাখা। নতুন শিক্ষা মন্ত্রী দীপক বর্মন (Dipak Barman) দায়িত্ব নেওয়ার পরই এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তার পরপরই প্রশাসনিক স্তরে এই কার্যক্রম গতি পেয়েছে। দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, কয়েক দিন আগেই সমস্ত জেলায় প্রাথমিক স্তরের স্কুলগুলিতে কতজন শিক্ষক প্রয়োজন এবং কোথায় অতিরিক্ত রয়েছেন, তার বিস্তারিত তথ্য পাঠাতে বলা হয়েছে। এক কর্তার কথায়, ‘পড়ুয়া-শিক্ষক অনুপাত ঠিক রাখার জন্যই এই তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।’ বহু জায়গায় দেখা যাচ্ছে, স্কুলে পড়ুয়া রয়েছে অথচ শিক্ষক নেই, আবার কোথাও শিক্ষক থাকলেও পড়ুয়ার সংখ্যা অত্যন্ত কম। এই বৈষম্য দূর করাই প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।
প্রসঙ্গত, এই উদ্যোগ একেবারে নতুন নয় বলেই জানিয়েছেন উত্তরবঙ্গের (North Bengal) এক জেলা স্কুল পরিদর্শক। তাঁর দাবি, ‘গত বছরের নভেম্বর থেকেই এই কাজ শুরু হয়েছিল। পরে কিছু কারণে থেমে যায়। তখন মূলত কোন কোন স্কুলে শিক্ষক নেই বা খুব কম রয়েছেন, সেই তালিকা তৈরি করতে বলা হয়েছিল।’ তিনি জানান, সেই তালিকা ইতিমধ্যেই প্রস্তুত। এবার নতুন করে চাওয়া হয়েছে, কোথায় শিক্ষক সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি রয়েছে। এই তালিকার ভিত্তিতেই আগামী দিনে বদলি প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। দফতরের এক আধিকারিক জানান, ‘প্রাথমিক ভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে, একই জেলার মধ্যেই উদ্বৃত্ত শিক্ষকদের সেই সব স্কুলে পাঠানো হবে যেখানে শিক্ষক ঘাটতি রয়েছে।’ এতে প্রশাসনিক দিক থেকে দ্রুত সমাধান সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার। কিন্তু এই পদক্ষেপ ঘিরে ইতিমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষকদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, কেবল মোট পড়ুয়া-শিক্ষক অনুপাত দেখলেই বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা যায় না। একটি স্কুলে একাধিক শ্রেণি থাকলে একজন শিক্ষকের পক্ষে সব ক্লাস সামলানো কার্যত অসম্ভব। এক শিক্ষক বলেন, ‘একটি স্কুলে মোট ৩০ জন পড়ুয়া থাকলেও যদি তারা আলাদা আলাদা শ্রেণির হয়, তাহলে একজনের পক্ষে পড়ানো সম্ভব নয়।’
দক্ষিণবঙ্গের (South Bengal) এক জেলা স্কুল পরিদর্শক এই প্রসঙ্গে জানান, ‘কলকাতা (Kolkata) ও অন্যান্য জেলার পরিস্থিতি এক নয়। তাই তালিকা তৈরি করার সময় পড়ুয়ার সংখ্যা, শ্রেণি বিন্যাস এবং স্থানীয় বাস্তবতা সবই বিবেচনায় নেওয়া হবে।’ প্রশাসনও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক বলে জানা গিয়েছে। শিক্ষক সংগঠনগুলিও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সরব হয়েছে। নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি (Nikhil Banga Prathamik Shikshak Samiti) -এর সাধারণ সম্পাদক ধ্রুবশেখর মণ্ডল (Dhrubashekhar Mondal) বলেন, ‘নীতিমতে ৩০:১ অনুপাত ঠিক থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা কঠিন। সব শ্রেণি মিলিয়ে ৩০ জন পড়ুয়া থাকলে একজন শিক্ষক দিয়ে স্কুল চালানো যায় না।’ তাঁর দাবি, প্রতিটি প্রাথমিক স্কুলে অন্তত তিনজন শিক্ষক থাকা বাধ্যতামূলক করা উচিত। তিনি আরও বলেন, ‘উদ্বৃত্ত শিক্ষক চিহ্নিত করার আগে তাঁদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন। বদলির ক্ষেত্রে শিক্ষককে পছন্দমতো স্কুল বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত।’ পাশাপাশি, যাঁরা সর্বশেষ যোগ দিয়েছেন তাঁদের মধ্য থেকেই উদ্বৃত্ত হিসেবে বেছে নেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন সংগঠনের পক্ষ থেকে।
অন্য দিকে, বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতি (Bengiya Shikshak O Shikshakarmi Samiti)-র সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল (Swapan Mondal) বলেন, ‘শুধু শিক্ষক বদলি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কেন সরকারি স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা কমছে, সেটাও খতিয়ে দেখা দরকার।’ তাঁর মতে, পড়ুয়া সংখ্যা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় এই সমস্যা নতুন নয়। বহু বছর ধরেই কোথাও শিক্ষক স্বল্পতা, কোথাও অতিরিক্ত শিক্ষক এই দুই বিপরীত পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই পঠনপাঠন ব্যাহত হচ্ছে। সরকার এবার সেই অসামঞ্জস্য দূর করতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রশাসনের এই পদক্ষেপ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে তালিকা তৈরির কাজ শুরু হওয়ায় পরিষ্কার, সরকার দ্রুত এই সমস্যার সমাধানে এগোতে চাইছে। আগামী দিনে বদলি প্রক্রিয়া কীভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং তা শিক্ষাব্যবস্থায় কী প্রভাব ফেলে, সেদিকেই নজর থাকবে শিক্ষক মহল থেকে অভিভাবকদের।
পশ্চিমবঙ্গের প্রাথমিক শিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একদিকে পড়ুয়া-শিক্ষক অনুপাত বজায় রাখা, অন্যদিকে শিক্ষার মান অক্ষুণ্ণ রাখা, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Jangipur Human Education Research and Training Institute Convocation 2026- Coffee Houser charpashe Magazine Launch Event | বিশ্বমানব শিক্ষা বারিধি সম্মান ও কফিহাউস পত্রিকা ঘিরে বই-উৎসব-সঙ্গীতের অনন্য সন্ধ্যা



