সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: দুর্গাপুজোর আগে রাজ্যের শিল্পক্ষেত্রে একাধিক বড় প্রকল্পের ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (CM Suvendu Adhikari)। সোমবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে তিনি লারসেন অ্যান্ড টুব্রো (Larsen & Toubro) বা এলঅ্যান্ডটি (L&T) -এর দু’টি প্রকল্পের উদ্বোধনের কথা জানান। এর মধ্যে একটি প্রকল্প নিউটাউনের সিলিকন ভ্যালি এলাকায় পরিকাঠামো ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত। অন্যটি হলদিয়ায় (Haldia) বড় অঙ্কের বিনিয়োগে গড়ে ওঠা শিল্প প্রকল্প। পুজোর মরসুমে হলদিয়ায় প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের উদ্বোধন ঘিরে ইতিমধ্যেই শিল্পমহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে নিউটাউনে (New Town) আদানি গোষ্ঠীর উদ্যোগে ২ হাজার শয্যার আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল তৈরির প্রস্তাবেও রাজ্য সরকারের সম্মতির কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী জানান, চলতি মাসের ২৭ তারিখ সকাল সাড়ে ১১টায় নিউটাউনের সিলিকন ভ্যালিতে এলঅ্যান্ডটির একটি পরিকাঠামো প্রকল্পের উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে। সেই অনুষ্ঠানের পরেই নজর থাকবে হলদিয়ার দিকে। দুর্গাপুজোর সময় ওই শিল্পাঞ্চলে আরও একটি বড় প্রকল্পের উদ্বোধনের প্রস্তুতি চলছে বলে তিনি জানিয়েছেন। সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১৪ অক্টোবর হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস (Haldia Petrochemicals) এলাকায় প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে তৈরি একটি প্ল্যান্ট উদ্বোধনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রকল্পটির কাজ দ্রুত শেষ করে উদ্বোধনের উপযোগী করে তোলার উদ্যোগ চলছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানানো হয়েছে। শিল্পপতি পূর্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায় (Purnendu Chatterjee) রাজ্যে এসে প্রকল্পটির উদ্বোধনের সম্ভাব্য দিনক্ষণ নিয়ে আলোচনা করেছেন বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
দুর্গাপুজোর আগে এত বড় অঙ্কের বিনিয়োগে প্রকল্পের উদ্বোধনকে রাজ্যের শিল্পক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরেই হলদিয়া রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। পেট্রোকেমিক্যালস, রাসায়নিক শিল্প ও বিভিন্ন সহযোগী শিল্পকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলে বড় শিল্প পরিকাঠামো তৈরি হয়েছে। নতুন বিনিয়োগের প্রকল্প চালু হলে সেই শিল্পভিত্তির সঙ্গে আরও কর্মকাণ্ড যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এলঅ্যান্ডটির নিউটাউন প্রকল্প ও হলদিয়ার ৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, দু’টি ক্ষেত্রের প্রকৃতি আলাদা হলেও রাজ্যের শিল্পনীতির ক্ষেত্রে দু’টিরই গুরুত্ব রয়েছে বলে মনে করছে প্রশাসন। একদিকে কলকাতার উপকণ্ঠে আধুনিক পরিকাঠামো নির্মাণের কাজ এগোবে, অন্যদিকে হলদিয়ার মতো শিল্পাঞ্চলে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদনভিত্তিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
শিল্প প্রকল্পের পাশাপাশি স্বাস্থ্য পরিকাঠামোতেও বড় বিনিয়োগের প্রস্তাব সামনে এনেছেন মুখ্যমন্ত্রী। নিউটাউনে আদানি গোষ্ঠী (Adani Group) ২ হাজার শয্যার একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল তৈরি করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানান তিনি। প্রস্তাবিত হাসপাতালের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, মোট শয্যার অর্ধেক আর্থিক ভাবে দুর্বল ও দরিদ্র মানুষের জন্য বিনামূল্যে পরিষেবার ক্ষেত্রে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। বাকি ১ হাজার শয্যা বাণিজ্যিক পরিষেবার জন্য রাখা হবে।।মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, আদানি গোষ্ঠীর কর্ণধার করণ আদানি (Karan Adani) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে হাসপাতাল তৈরির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। ওই প্রকল্পের জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে লিখিত সম্মতিও দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। ফলে প্রস্তাবিত হাসপাতাল তৈরির ক্ষেত্রে প্রাথমিক সরকারি অনুমোদনের প্রক্রিয়া এগিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী শশুভেন্দু অধিকারী (CM Suvendu Adhikari) জানান, গৌতম আদানিও (Gautam Adani) প্রকল্পটি নিয়ে প্রতিশ্রুতিপত্র দিয়েছেন। দ্রুত হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরু করার বিষয়ে আদানি গোষ্ঠী আগ্রহী বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। হাসপাতাল নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় পুরো বিনিয়োগই আদানি গোষ্ঠী করবে বলে তাঁর দাবি। ফলে রাজ্যের কোষাগার থেকে ওই প্রকল্পে মূলধনী বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না বলেই সরকারের বক্তব্য। উল্লেখ্য যে, নিউটাউনে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল তৈরির প্রস্তাব সামনে আসায় শহর ও সংলগ্ন এলাকার স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। ২ হাজার শয্যার হাসপাতাল হলে একদিকে যেমন চিকিৎসা পরিষেবার পরিসর বাড়বে, তেমনই বিপুল সংখ্যক রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার পরিকাঠামো তৈরি হবে। তার মধ্যে ১ হাজার শয্যা আর্থিক ভাবে দুর্বল মানুষের জন্য বিনামূল্যে ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকায় প্রকল্পটির সামাজিক গুরুত্বও রয়েছে বলে মনে করছে সরকার।
শিল্পায়নকে কেন্দ্র করে গত কয়েক বছর ধরেই রাজ্যে একাধিক প্রকল্পের কথা সামনে এসেছে। ডানকুনি (Dankuni) থেকে পুরুলিয়া (Purulia) বিভিন্ন এলাকায় বিনিয়োগের প্রস্তাব ও শিল্প প্রকল্পের কাজ এগোনোর কথা প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। উৎপাদন শিল্পের পাশাপাশি পরিকাঠামো, প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও বেসরকারি বিনিয়োগ আনার চেষ্টা চলছে বলে সরকারের তরফে দাবি করা হয়েছে। এরই মধ্যে রবিবার গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স (Garden Reach Shipbuilders & Engineers) এলাকায় প্রতিরক্ষা উৎপাদন সংক্রান্ত প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্পের ঘোষণা হয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং (Rajnath Singh) -এর উপস্থিতিতে ওই প্রকল্প ঘিরে নতুন উদ্যোগের কথা সামনে আসে। ফলে পুজোর আগে পরপর একাধিক বড় বিনিয়োগ ও প্রকল্পের ঘোষণা রাজ্যের শিল্পক্ষেত্রকে ঘিরে আলোচনাকে আরও বাড়িয়েছে।
রাজ্য সরকারের বক্তব্য, শুধু বড় অঙ্কের বিনিয়োগ এলেই শিল্পায়নের সাফল্য মাপা যায় না। তার সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান, স্থানীয় ব্যবসার প্রসার, পরিকাঠামোর উন্নয়ন ও সহযোগী শিল্পের বিকাশও জরুরি। সেই দিক থেকে হলদিয়ার মতো শিল্পাঞ্চলে নতুন প্রকল্প চালু হলে তার প্রভাব আশপাশের এলাকাতেও পড়তে পারে। একই ভাবে নিউটাউনে পরিকাঠামো প্রকল্প ও বড় হাসপাতাল তৈরি হলে শহরের দ্রুত প্রসারমান অংশে নতুন পরিষেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। হলদিয়ার ৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের উদ্বোধনের সম্ভাব্য সময়ও তাৎপর্যপূর্ণ। দুর্গাপুজোর আগে এই ধরনের বড় প্রকল্প চালু হলে রাজ্যের শিল্প বিনিয়োগ নিয়ে সরকারের পরিকল্পনাকে সামনে আনার সুযোগ তৈরি হবে। পুজোর মরসুমে যখন রাজ্যের অর্থনীতিতে কেনাকাটা, পরিষেবা এবং পর্যটনকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড বাড়ে, তখন শিল্পক্ষেত্রে নতুন বিনিয়োগের ঘোষণা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্য একটি দিকও সামনে আনছে।
এলঅ্যান্ডটির নিউটাউন প্রকল্প, হলদিয়ার বড় শিল্প প্রকল্প ও আদানি গোষ্ঠীর প্রস্তাবিত হাসপাতাল তিনটি উদ্যোগের ক্ষেত্র আলাদা। কিন্তু রাজ্যের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রত্যেকটির সম্ভাব্য প্রভাব রয়েছে। শিল্প প্রকল্প উৎপাদন ও পরিকাঠামো বাড়াতে পারে, আর হাসপাতাল স্বাস্থ্য পরিষেবার পাশাপাশি চিকিৎসা ক্ষেত্রে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে।মুখ্যমন্ত্রীর সোমবারের ঘোষণায় তাই পুজোর আগে রাজ্যে বিনিয়োগের একাধিক সম্ভাবনা সামনে এল। ২৭ তারিখ নিউটাউনে এলঅ্যান্ডটির প্রকল্পের উদ্বোধন আর ১৪ অক্টোবর হলদিয়ায় প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের সম্ভাব্য উদ্বোধন ঘিরে এখন নজর থাকবে শিল্পমহলের। একই সঙ্গে ২ হাজার শয্যার হাসপাতাল প্রকল্প বাস্তবে কত দ্রুত রূপ নেয়, সেদিকেও নজর রয়েছে। সরকারি ঘোষণা থেকে প্রকল্পের বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপই এখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিনিয়োগের অঙ্কের পাশাপাশি প্রকল্পগুলি কবে উৎপাদন বা পরিষেবা শুরু করে ও কত মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়, তার উপরই শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগগুলির সাফল্য নির্ভর করবে।




