সুজয়নীল দাশগুপ্ত ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলম্বো ২৪ আগস্ট : ২২ গজে শতরান করার পর অনেক ক্রিকেটারই নিজের মতো করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। কেউ আকাশের দিকে তাকান, কেউ মুষ্টি উঁচিয়ে ধরেন, কেউ সতীর্থদের দিকে ছুটে যান। ধ্রুব জুরেল (Dhruv Jurel) বেছে নিলেন অন্যরকম পথ। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় টেস্টে ১১৫ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলার পর জার্সির হাতা গুটিয়ে বাঁ হাতের পেশিতে থাকা ট্যাটু দেখালেন ভারতের তরুণ উইকেটরক্ষক-ব্যাটার। পরে দিনের খেলা শেষে ধ্রুব সেই ট্যাটুর অর্থও জানালেন। ট্যাটুতে লেখা রয়েছে ‘জয় জওয়ান, জয় কিষান’। সেই কয়েকটি শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জুরেলের পরিবার, শিকড় ও তাঁর ক্রিকেটজীবনের আবেগ। প্রসঙ্গত, শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় টেস্টে ভারতের ইনিংস যখন বড় রানের দিকে এগোচ্ছিল, তখন জুরেল এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন। অর্ধশতরান পূর্ণ করার পর স্যালুট করে তিনি উদযাপন করেছিলেন। আর শতরান পূর্ণ করার পরে দেখা গেল তাঁর বাঁ হাতের ট্যাটু। জার্সির হাতা একটু গুটিয়ে ট্যাটুটি দেখিয়ে নিজের উদযাপনকে যেন পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর মুহূর্তে পরিণত করেন ২৫ বছরের এই ক্রিকেটার।
দিনের খেলা শেষে ট্যাটু নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জুরেল জানান, তাঁর পরিবারের ইতিহাসের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে এই লেখা। তাঁর ঠাকুরদা ছিলেন কৃষক ও বাবা সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন। তাই জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দুই গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়কে নিজের শরীরের ওপর তিনি স্থায়ী করে রাখতে চেয়েছেন। জুরেলের কথায়, ‘আমার ঠাকুরদা কৃষক ছিলেন। আর আমার বাবা সেনাবাহিনীতে ছিলেন। আমি নিজের শিকড় ভুলতে চাই না। এই উচ্ছ্বাসটা ওদের জন্যই।’ জুরেলের এই বক্তব্যের পর তাঁর শতরানের উদযাপনের অর্থও আরও গভীর হয়ে ওঠে। ক্রিকেট মাঠে তাঁর ব্যাট থেকে যখন একের পর এক রান আসছিল, তখন গ্যালারির দর্শকদের কাছে সেটি ছিল ভারতের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ইনিংস। কিন্তু জুরেলের কাছে সেই ইনিংসের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল পরিবারের স্মৃতিও। তাই শতরানের পর হাতের ট্যাটু দেখানো নিছক উদযাপন ছিল না, বরং নিজের পারিবারিক পরিচয়ের প্রতি সম্মান জানানোর একটি মুহূর্ত।
শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে জুরেলের ইনিংসের গুরুত্বও নেহাৎ কম নয়। প্রথম দিনের শেষে ভারত ৫ উইকেটে ৩০০ রান করেছিল। তখন জুরেল ও সারাংশ জৈন (Saransh Jain) অপরাজিত ছিলেন। দ্বিতীয় দিনে ভারতীয় ইনিংস এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব অনেকটাই এসে পড়ে জুরেলের উপর। সারাংশ ৬ রান করে ফিরে গেলেও জুরেল নিজের জায়গা ছাড়েননি। এক প্রান্ত ধরে রেখে শেষ পর্যন্ত ১১৫ রানে তিনি অপরাজিত থাকেন। ভারতের ইনিংসের মাঝপথে ঋষভ পন্থ (Rishabh Pant) কব্জিতে চোট নিয়েও ব্যাট করতে নামেন। আগ্রাসী ভঙ্গিতে ব্যাট করে ৬৩ রান করেন ঋষভ। পন্থের সঙ্গে জুরেলের জুটিও ভারতের স্কোর বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। পরে মানব সুতার (Manav Suthar) ১৮ রান করেন। শেষ দিকে মহম্মদ সিরাজ (Mohammed Siraj) ও প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ (Prasidh Krishna) কয়েকটি রান যোগ করেন। শেষ পর্যন্ত ৯ উইকেটে ৫০৩ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করেন অধিনায়ক শুভমন গিল (Shubman Gill)।
জুরেলের শতরান হওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন ভারত হয়ত দ্রুত ইনিংস ঘোষণা করবে। কিন্তু শুভমন গিল আরও কিছু রান তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ৫০০ রান পার হওয়ার পরে জুরেল ও প্রসিদ্ধ কৃষ্ণকে অধিনায়ক শুভমন ডেকে নেন। ভারতের লক্ষ্য ছিল প্রথম ইনিংসেই যতটা সম্ভব বড় রান তুলে শ্রীলঙ্কার উপর চাপ তৈরি করা। কারণ কলম্বোর পিচে দ্বিতীয় দিন থেকেই বল ঘুরতে শুরু করেছিল। অসমান বাউন্সও দেখা যাচ্ছিল। তার উপর বার বার বৃষ্টির কারণে খেলা বিঘ্নিত হচ্ছিল। ভারতের ইনিংসের অন্যতম বড় প্রাপ্তি হয়ে ওঠে জুরেলের ব্যাট। টেস্ট ক্রিকেটে এটি তাঁর দ্বিতীয় শতরান। নিজের ১২তম টেস্টেই তিনি আবার তিন অঙ্কের রান ছুঁলেন। উত্তরপ্রদেশের এই ক্রিকেটার ধীরে ধীরে ভারতের টেস্ট দলে নিজের জায়গা আরও মজবুত করে তুলছেন। উইকেটরক্ষক হিসেবে ঋষভ পন্থের উপস্থিতি থাকলেও ব্যাটার জুরেলের কার্যকর ইনিংস তাঁকে দলের গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। কিন্তু নিজের শতরান নিয়ে বাড়তি উচ্ছ্বাস দেখাতে রাজি নন জুরেল। তাঁর বক্তব্যে ছিল পরের ম্যাচের জন্য নতুন করে শুরু করার মানসিকতাও। তিনি বলেন, ‘সাধারণত আমি উপরের দিকে ব্যাট করি। বড় জুটি তৈরির দিকে নজর থাকে। ভারতের হয়ে খেলতে নামলে পেট গুড়গুড় করে। আজ হয়ত আমি ১০০ করেছি। কাল আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হবে।’ অর্থাৎ শতরান হয়ে গেলেও সেটিকে অতীত হিসেবেই দেখতে চাইছেন জুরেল। পরের ইনিংসে আবার নতুন করে রান করার লক্ষ্যেই মাঠে নামবেন এই তরুণ ক্রিকেটার।
শুধু নিজের ব্যাটিং নয়, ঋষভ পন্থের প্রশংসাতেও মুখর ছিলেন জুরেল। চোটের কারণে পন্থ উইকেটের পিছনে দাঁড়াতে পারেননি। দীর্ঘক্ষণ ব্যাট করার পরও ভারতের দ্বিতীয় ইনিংসের আগে উইকেটকিপিংয়ের দায়িত্ব এসে পড়েছে জুরেলের উপর। এমন পরিস্থিতিতে পন্থের পরামর্শই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। জুরেল বলেন, ‘পন্থ দুর্দান্ত খেলোয়াড়। ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে কীভাবে খেলা উচিত, সে ব্যাপারে ওর কাছেই পরামর্শ নিই।’ মাঠের ছবিটাও ভারতের পক্ষে যথেষ্ট ইতিবাচক। ৯ উইকেটে ৫০৩ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করার পর শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতেই দুই উইকেট তুলে নেয় ভারত। লাহিরু উদারা (Lahiru Udara) মাত্র ১ রান করে প্রসিদ্ধ কৃষ্ণের বলে আউট হন। স্লিপে তাঁর ক্যাচ নেন যশস্বী জয়সওয়াল (Yashasvi Jaiswal)। এরপর মানব সুতারের বলে প্রভাত জয়সূর্য (Prabath Jayasuriya) ২ রান করে এলবিডব্লিউ হন। জয়সূর্য আউটের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিভিউ নেন। তৃতীয় আম্পায়ারের পর্যালোচনার পর ‘আম্পায়ার্স কল’ বহাল থাকে এবং সাজঘরে ফিরতে হয় তাঁকে। সিদ্ধান্তে খুশি না হয়ে মাঠেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন শ্রীলঙ্কার এই ক্রিকেটার। পরে সাজঘরে ফেরার সময়ও তাঁর বিরক্তি ক্যামেরায় ধরা পড়ে।
দিনের শেষে মাত্র ৩ ওভারে ২ উইকেট হারিয়ে শ্রীলঙ্কার রান দাঁড়ায় ৮। অর্থাৎ প্রথম ইনিংসে ভারতের ৫০৩ রানের জবাব দিতে নেমেই চাপের মুখে পড়ে যায় আয়োজক দল। ভারতের হয়ে প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ ও মানব সুতার একটি করে উইকেট নেন। ভারতের ইনিংসে শ্রীলঙ্কার হয়ে সবচেয়ে সফল বোলার ছিলেন অসিথা ফার্নান্ডো (Asitha Fernando)। তিনি ১০৬ রান দিয়ে ৪ উইকেট নেন। প্রভাত জয়সূর্য ১৩২ রান খরচ করে ২ উইকেট পান। কেশারা নুয়ান্থা (Keshara Nuwantha) ১৫৪ রান দিয়ে ২ উইকেট নেন। লাহিরু কুমারা (Lahiru Kumara) পান ১টি উইকেট। কিন্তু, ভারতের জন্য চিন্তার জায়গা হয়ে রয়েছে কলম্বোর আবহাওয়া। বৃষ্টির কারণে ইতিমধ্যেই খেলার সময় নষ্ট হয়েছে। পিচে বল ঘোরা ও অসমান বাউন্সের পাশাপাশি আবহাওয়ার বাধা ম্যাচের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। ভারত তাই প্রথম ইনিংসে যতটা সম্ভব বড় স্কোর তুলে শ্রীলঙ্কাকে চাপে ফেলার পথ নিয়েছে। সেই পরিকল্পনায় জুরেলের ১১৫ রানের অপরাজিত ইনিংস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
উল্লেখ্য যে, সেঞ্চুরির পরে বাঁ হাতের ট্যাটু দেখিয়ে জুরেল যে বার্তা দিয়েছেন, তার সঙ্গে তাঁর ক্রিকেটযাত্রার ছবিটাও যেন মিলে যায়। পরিবার থেকে পাওয়া মূল্যবোধকে সঙ্গে নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের জায়গা তৈরি করছেন ধ্রুব জুরেল। ‘জয় জওয়ান, জয় কিষান’ লেখা সেই ট্যাটু তাঁর বাবা, ঠাকুরদা ও নিজের শিকড়ের স্মারক। আর কলম্বোয় ১১৫ রানের ইনিংসের পর সেই স্মারকই উঠে এল তাঁর উদযাপনের কেন্দ্রে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India vs Sri Lanka first Test, India Galle Test win | গলে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে টেস্টে জয় ভারতের, তবু বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠতে কঠিন অঙ্ক শুভমনদের




