কৌশিক রায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক★ কলকাতা : বাংলা সিনেমার অমর নায়ক উত্তম কুমার (Uttam Kumar) শুধু পর্দায় নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও ছিলেন সহজ-সরল, পারিবারিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী একজন মানুষ। মহানায়ক হওয়ার বহু আগেই পরিবার ও সমাজের নিয়ম মেনে গৌরী দেবীকে তিনি (Gauri Devi) বিয়ে করেছিলেন। বিয়েটা ছিল অত্যন্ত ঘরোয়া, কিন্তু সেই আয়োজনের জাঁকজমক ছিল চোখে পড়ার মতো। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবাই যেন নিজেদের দায়িত্ব নিজের মতো করে পালন করেছিলেন। উত্তমের ভাই তরুণ কুমার (Tarun Kumar) তো দাদার বিয়ের প্রায় সব দায়িত্বই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। বিদেশি গাড়ি ভাড়া করা থেকে শুরু করে বৌভাতে বন্ধুদের দিয়ে খাবার পরিবেশন পর্যন্ত।

তাঁর লেখা ‘আমার দাদা উত্তম’ কুমারবইতে বিয়ের সেই সমস্ত স্মৃতি তুলে ধরেছিলেন তিনি। আর সেই বইতেই ফাঁস হয় মহানায়কের ফুলশয্যার রাতের একটি চাঞ্চল্যকর, কিন্তু মধুর অন্দরকাহিনি।
আরও পড়ুন : Suchitra Sen : মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের জীবনের মোড় ঘোরানো গল্প : একটি ইতিহাস
তরুণ কুমারের সঙ্গে গৌরী দেবীর সম্পর্ক ছিল একেবারেই আন্তরিক। স্নেহ ও বন্ধুত্বের জায়গা থেকেই গৌরী দেবী প্রায়ই শ্বশুরবাড়ির নানা ঘটনার কথা শেয়ার করতেন তাঁর সঙ্গে। একদিন আড্ডার ছলে তিনি জানিয়ে দেন, ফুলশয্যার রাতে উত্তম তাঁকে কী উপহার দিয়েছিলেন, যে উপহার আজও ভক্তদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করে। সেই রাতে যে ঘরটি সাজানো হয়েছিল উত্তম-গৌরীর ফুলশয্যার জন্য, সেই ঘরেই লুকিয়ে ছিলেন পরিবারের দুই আত্মীয়া উত্তমের বউদি এবং এক তুতো বোন। উদ্দেশ্য, নবদম্পতিকে চমকে দেওয়া। গৌরী দেবী বিষয়টি খেয়াল করেছিলেন আগেই, কিন্তু উত্তমকে কিছু বলেননি। ঘরে ঢুকতেই তিনি ইশারায় জানিয়ে দেন লুকিয়ে থাকা অতিথিদের কথা। এরপরই উত্তমের চিরচেনা রসিকতা। ট্রাঙ্কের কাছে গিয়ে হো হো করে হেসে উঠলেন উত্তম। তারপর বউদি ও বোনকে বের করে বললেন, “তোমরা আমার ফুলশয্যা দেখতে এসেছ? ঠিক আছে, জানলা-দরজা সব খুলে রাখছি আজ।” এই কথা শোনার পর লজ্জায় লাল হয়ে দৌড় লাগান দুই আত্মীয়া। সেদিনই বুঝেছিলেন গৌরী দেবী যে, উত্তম কুমার শুধু সুন্দর মানুষই নন, অসাধারণ রসবোধের অধিকারীও। ঘরোয়া পরিবেশকে নিজের বুদ্ধিদীপ্ত কথায় মুহূর্তে সহজ করে দিতে পারতেন তিনি। কিন্তু, ফুলশয্যার রাতের আসল চমক ছিল অন্য জায়গায়। বিয়ের আগে গৌরী দেবী একটি ছোট আবদার করেছিলেন। উত্তম তখন কোনও প্রতিক্রিয়া দেননি, না হ্যাঁ, না না। ফলে গৌরীদেবী ধরে নিয়েছিলেন, হয়ত সেই অনুরোধটি আর পূরণ হবে না। কিন্তু উত্তম যে কতটা মনোযোগ দিয়ে আগলে রাখতেন স্ত্রীকে, তার প্রমাণ মিলল সেই রাতে।ফুলশয্যার বিছানায় বসে উত্তম একটি ছোট বাক্স তুলে দেন গৌরীর হাতে। খুলতেই গৌরীদেবী অবাক, রূপোর তৈরি বানেশ্বর শিবলিঙ্গসহ ‘গৌরীপট্ট’ যা তিনি বিয়ের আগে চেয়েছিলেন।
শাস্ত্র অনুযায়ী গৌরীপট্ট প্রতীকটি নির্দেশ করে শিব-পার্বতীর মিলন, সৃষ্টি ও চিরবন্ধনের শক্তিকে। গৌরীদেবীর কথা শুনেই উত্তম সেই উপহার সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন তাঁদের সম্পর্কও হোক সেই চিরন্তন ঐশ্বরিক বন্ধনের মতোই গভীর, অবিচ্ছেদ্য। আর তাই প্রথম রাতেই সেই উপহার দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি শুধু প্রেমিক নন, একজন দায়িত্বশীল জীবনসঙ্গীও। তরুণ কুমার তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছিলেন, গৌরী দেবী প্রথম রাতের সেই মুহূর্তকে জীবনের অন্যতম সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি হিসেবে দেখতেন। উত্তমের মতো একজন মহানায়ক বাহ্যিক জাঁকজমক দিয়ে নয়, ছোট ছোট মুহূর্তের মাধ্যমেই ভালবাসাকে সুন্দর করে তুলেছিলেন।
বাঙালি দর্শকের কাছে উত্তম কুমারের জীবন রহস্যময় আকর্ষণ। তাঁর অভিনয়, তাঁর ব্যক্তিত্ব, তাঁর লাজুক অথচ মনমোহক হাসি, সব কিছুর মতোই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের ছোট ছোট গল্পও আজও মানুষকে রোমাঞ্চিত করে। ফুলশয্যার এই উপহারের গল্পটি আবারও প্রমাণ করে, মহানায়ক শুধু সিনেমার নায়ক নন, বাস্তব জীবনেও তিনি ছিলেন একজন পরিণত, সংবেদনশীল এবং রসিক জীবনসঙ্গী।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suchitra Sen, Suchitra Sen Controversy | মহানায়িকা সুচিত্রা সেনকে বিয়ের প্রস্তাব, নাকচ করতেই পরিচালকের হুমকি!




