Tea Garden Land Case, Shankar Ghosh | চা-বাগানের জমি বিক্রি করে তৃণমূলের কোষাগারে টাকা? শঙ্কর ঘোষের বিস্ফোরক অভিযোগ, তদন্তের দাবিতে চিঠি মুখ্যমন্ত্রীকে

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ শিলিগুড়ি: উত্তরবঙ্গের চা-বাগান ঘিরে ফের উত্তপ্ত রাজ্য রাজনীতি। তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন চা-বাগানের জমি বেআইনি ভাবে হস্তান্তর ও বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুললেন রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ (Shankar Ghosh)। শুধু জমি হস্তান্তরের অভিযোগই নয়, ওই লেনদেন থেকে পাওয়া অর্থ তৃণমূলের দলীয় তহবিলে গিয়েছে এবং নির্বাচনী কাজে তা ব্যবহার করা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। মঙ্গলবার সাংবাদিক বৈঠকে এই অভিযোগ তুলে গোটা বিষয়টির তদন্তের দাবি জানিয়েছেন শিলিগুড়ির বিজেপি বিধায়ক তথা রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী।

আরও পড়ুন : India paddy cultivation 2026, paddy cultivation area decline, ভারতে ধান চাষের জমি কমেছে ৩.৬৫ শতাংশ : তিন রাজ্যে বৃষ্টির ঘাটতিতে ধান চাষে বড় ধাক্কা

চা-বাগানের জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে বিতর্ক রয়েছে। চা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত জমির ব্যবহার, লিজ, জমি হস্তান্তর এবং বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। এবার সেই বিতর্কের সঙ্গে সরাসরি আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ জুড়ে দিলেন শঙ্কর। তাঁর দাবি, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে চা-বাগানের জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যার পিছনে বৃহত্তর আর্থিক স্বার্থ কাজ করেছে। মঙ্গলবার সাংবাদিক বৈঠকে শঙ্করের অভিযোগ, চা-বাগানের জমি বেআইনি ভাবে বিক্রি বা হস্তান্তরের মাধ্যমে যে অর্থ সংগৃহীত হয়েছিল, তা তৃণমূলের দলীয় কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘ওই টাকা তৃণমূলের নির্বাচনী কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।’ যদিও এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই হয়নি এবং তৃণমূলের তরফে এই অভিযোগের বিষয়ে কী বক্তব্য, তা নিয়েই এখন রাজনৈতিক মহলে নজর রয়েছে।

ছবি: সংগৃহীত

পর্যটনমন্ত্রীর বক্তব্য, বিষয়টি কোনও বিচ্ছিন্ন জমি লেনদেনের ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। তাঁর দাবি, তৃণমূল সরকারের আমলে চা-বাগানের জমির ব্যবহার নিয়ে একটি বৃহত্তর ব্যবস্থার মধ্যে অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। তিনি পুরো বিষয়টিকে ‘প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি’ বলে অভিহিত করে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। বর্তমানে রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি ক্ষেত্রে অতীতের দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর (Justice Bishwajit Basu) নেতৃত্বে কমিশন গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শঙ্কর। তাঁর বক্তব্য, চা-বাগানের জমি সংক্রান্ত অভিযোগও ওই কমিশনের তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। এই বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)-কে চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। শঙ্করের দাবি, শুধু জমি বিক্রির নথি পরীক্ষা করলেই হবে না। কোন চা-বাগানের কত জমি হস্তান্তর হয়েছে, কী শর্তে তা দেওয়া হয়েছিল, জমির বর্তমান ব্যবহার কী, কারা সেই জমির সুবিধা পেয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেনের আর্থিক গতিপথ কী, সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। চা-বাগানের জমি লিজ দেওয়ার ক্ষেত্রেও একই ভাবে নথিপত্র যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন পর্যটনমন্ত্রী।

আরও পড়ুন : Lionel Messi flight | ১৩৬ কোটি টাকার আকাশবিলাসে ভারত সফর মেসির: যে প্রাইভেট তাক লাগানো অন্দরমহল

চা-বাগানের অব্যবহৃত জমির বাণিজ্যিক ব্যবহার নিয়েও পূর্ববর্তী সরকারের সঙ্গে বিজেপির মতবিরোধ ছিল বলে জানিয়েছেন শঙ্কর। তাঁর দাবি, তৎকালীন সরকারের তরফে চা-বাগানের অব্যবহৃত জমির ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পর্যটন এবং বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিজেপি তখন তার বিরোধিতা করেছিল। শঙ্করের বক্তব্য, জমির বাণিজ্যিক ব্যবহার নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চা শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ এবং বাগানের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন ছিল। পর্যটনমন্ত্রী জানিয়েছেন, চা-বাগানের জমি সংক্রান্ত যাবতীয় নথি এবং অভিযোগের বিষয় কমিশনের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হবে। কমিশনের কাছে একটি নোটও পাঠানোর কথা জানিয়েছেন তিনি। ফলে উত্তরবঙ্গের চা-বাগানের জমি নিয়ে রাজনৈতিক অভিযোগ এবার প্রশাসনিক তদন্তের স্তরেও পৌঁছতে পারে।

তবে শঙ্করের সাংবাদিক বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল চা-বাগানকে ঘিরে বর্তমান সরকারের পর্যটন পরিকল্পনা। তাঁর বক্তব্য, চা-বাগানের জমিকে শুধুমাত্র বাণিজ্যিক সম্পত্তি হিসেবে দেখলে চলবে না। উত্তরবঙ্গের চা-বাগানের প্রাকৃতিক পরিবেশ, পুরনো বাংলো, পাহাড় ও ডুয়ার্সের পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে টি-ট্যুরিজমের পরিসর বাড়ানো সম্ভব। এই লক্ষ্যে একাধিক চা-বাগানের মালিক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন পর্যটনমন্ত্রী। পুরনো চা-বাগান বাংলোগুলিকে পর্যটকদের থাকার উপযোগী করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। এর পাশাপাশি চা-বাগানের ভিতরে হোম-স্টে তৈরির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শঙ্করের বক্তব্য, পর্যটন শিল্পের বিস্তার ঘটাতে গিয়ে স্থানীয় মানুষকে বাইরে রাখা হবে না। চা-বাগানের শ্রমিক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করে তাঁদের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করাই সরকারের লক্ষ্য। তাঁর কথায়, ‘চা-বাগান এলাকার শ্রমিক এবং বাসিন্দাদের পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করে স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।’

চা-বাগানের পুরনো বাংলোকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার পাশাপাশি হোম-স্টে, স্থানীয় সংস্কৃতি, চা তৈরির প্রক্রিয়া এবং বাগানের দৈনন্দিন জীবনকে পর্যটনের আকর্ষণের অংশ করার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এর ফলে পর্যটকরা শুধু চা-বাগানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখবেন না, সেই এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। পর্যটন সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে জমির ব্যবহার নিয়ে সতর্ক থাকার কথাও বলেছেন শঙ্কর। তাঁর মতে, চা-বাগানের মূল চরিত্র নষ্ট করে পর্যটন বা বাণিজ্যিক প্রকল্প তৈরি করা হলে দীর্ঘমেয়াদে চা শিল্পই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই পর্যটন এবং চা শিল্পের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি। বর্তমান সরকারের তরফে চা-বাগানের মোট জমির ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের প্রস্তাব অনুমোদনের কথা জানিয়েছেন পর্যটনমন্ত্রী। তবে এই অনুমোদনকে আগের সরকারের প্রস্তাবের সঙ্গে এক করে দেখার বিরোধিতা করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, চা-বাগানের জমির বাণিজ্যিক ব্যবহার নির্ধারণের সময় বাগানের অস্তিত্ব এবং চা উৎপাদনের সঙ্গে তার সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

এই প্রসঙ্গেই শঙ্করের মন্তব্য, ‘চা-বাগান না-থাকলে চা-বাগান দেখতে লোক আসবে কী করে।’ অর্থাৎ পর্যটনের জন্য যে চা-বাগানকে আকর্ষণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, সেই বাগানের জমি অতিরিক্ত বাণিজ্যিক ব্যবহারের ফলে যদি চা শিল্পের পরিকাঠামোই দুর্বল হয়ে যায়, তা হলে পর্যটন পরিকল্পনাও দীর্ঘমেয়াদে সমস্যায় পড়তে পারে। উত্তরবঙ্গের অর্থনীতিতে চা শিল্পের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। চা-বাগানকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার জীবিকা নির্বাহ করেন। বাগানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে যুক্ত রয়েছে পরিবহণ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, পর্যটন, হোটেল এবং বিভিন্ন পরিষেবা ক্ষেত্রও। ফলে চা-বাগানের জমি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত শুধু জমির মালিকানা বা বাণিজ্যিক প্রকল্পের বিষয় নয়, এর সঙ্গে বৃহত্তর স্থানীয় অর্থনীতিও যুক্ত। শঙ্করের অভিযোগের পর তাই রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি প্রশাসনিক তদন্তের দাবিটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অতীতে কোন জমি কী ভাবে হস্তান্তর হয়েছে, সংশ্লিষ্ট অনুমোদন কী ছিল এবং সরকারি নিয়ম মেনে সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা যেতে পারে বলে দাবি তাঁর।

অন্যদিকে, চা-বাগানকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গের পর্যটন মানচিত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। ডুয়ার্স, তরাই এবং পাহাড় লাগোয়া চা-বাগানগুলির প্রাকৃতিক পরিবেশ ইতিমধ্যেই পর্যটকদের আকর্ষণ করে। পুরনো বাংলো এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের যুক্ত করে পরিকল্পিত টি-ট্যুরিজম চালু হলে পর্যটনের অর্থ স্থানীয় স্তরে পৌঁছনোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে তার আগে জমি সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্ত এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের নিয়মকানুন নিয়ে প্রশাসনের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। শঙ্কর ঘোষের অভিযোগের ভিত্তিতে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি যাওয়ার পর কমিশন বিষয়টি কী ভাবে বিবেচনা করে, সেটিই এখন দেখার। একই সঙ্গে তৃণমূলের তরফে এই অভিযোগের কোনও জবাব আসে কি না, সেদিকেও নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের। উল্লেখ্য, চা-বাগানের জমি, কথিত বেআইনি হস্তান্তর, দলীয় তহবিলে অর্থ যাওয়ার অভিযোগ এবং ভবিষ্যতের টি-ট্যুরিজম পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে উত্তরবঙ্গের চা-বাগানকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনা শুরু হয়েছে। তদন্ত হলে জমি ব্যবহারের প্রকৃত চিত্র কী উঠে আসে, এখন সেই দিকেই নজর।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : BRICS Summit 2026 India, Modi Pezeshkian meeting | সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে পেজেশকিয়ান, BRICS সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা! নজরে চবাহার-সহ ভারত-ইরান সম্পর্ক

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন