সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আবারও জমে উঠতে চলেছে মমতা বনাম শুভেন্দু লড়াই। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে বড় রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে রাজ্যের ১৪৪টি বিধানসভা কেন্দ্রে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে দিল ভারতীয় জনতা পার্টি। প্রথম দফার তালিকায় একাধিক পরিচিত মুখের পাশাপাশি রয়েছে বেশ কিছু চমকও। বিশেষ করে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) -এর প্রার্থিতা ঘিরে রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে। বিজেপি সূত্রে জানা গিয়েছে, তিনি এ বার একসঙ্গে দুই কেন্দ্র নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ফলে রাজ্যের রাজনৈতিক লড়াইয়ে আবারও মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) এবং শুভেন্দু অধিকারীর। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভবানীপুর আসনকে ঘিরে এই সিদ্ধান্ত বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ফলে বিজেপির তরফে শুভেন্দুকে এই আসনে প্রার্থী করা নিছক কৌশলগত পদক্ষেপ বলেই মনে করা হচ্ছে। বিজেপির এক নেতার কথায়, ‘রাজ্যে রাজনৈতিক লড়াইকে আরও তীব্র করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
প্রথম দফার প্রার্থী তালিকায় বিজেপি মূলত অভিজ্ঞ এবং পরিচিত মুখগুলোকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় আবারও খড়্গপুর সদর কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করা হয়েছে দলের প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষকে (Dilip Ghosh)। গত নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকেই তিনি জয়ী হয়েছিলেন এবং এবারের লড়াইয়েও তাঁর উপরই ভরসা রাখল দল। অন্যদিকে দক্ষিণ কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ রাসবিহারী কেন্দ্রে প্রার্থী করা হয়েছে প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ স্বপন দাশগুপ্তকে (Swapan Dasgupta)। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কলকাতার শহুরে ভোটারদের লক্ষ্য করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজেপি। হাওড়ার শিবপুর কেন্দ্রেও চমক দিয়েছে বিজেপি। এই কেন্দ্রে প্রার্থী করা হয়েছে অভিনেতা-রাজনীতিক রুদ্রনীল ঘোষকে (Rudranil Ghosh)। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি বিজেপির সক্রিয় মুখ হিসেবে পরিচিত। বরাহনগর কেন্দ্রে প্রার্থী হয়েছেন সজল ঘোষ (Sajal Ghosh) এবং হাওড়া উত্তরে প্রার্থী করা হয়েছে উমেশ রাইকে (Umesh Rai)।
বিজেপি সূত্রে আগেই জানা গিয়েছিল যে, বর্তমান বিধায়কদের অধিকাংশকেই এবার টিকিট দেওয়া হবে। সেই পূর্বাভাসই সত্যি হয়েছে প্রথম দফার তালিকায়। অনেক পরিচিত বিজেপি বিধায়কই আবারও প্রার্থী হিসেবে জায়গা পেয়েছেন। তবে কয়েকটি কেন্দ্রে দল পরিবর্তনের সিদ্ধান্তও নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট কেন্দ্রে বর্তমান বিধায়ক অশোক লাহিড়ীকে (Ashok Lahiri) এবার টিকিট দেয়নি বিজেপি। তাঁর পরিবর্তে প্রার্থী করা হয়েছে বিদ্যুৎ রায়কে (Bidyut Roy)। একইভাবে গোঘাট কেন্দ্রের বর্তমান বিধায়ক বিশ্বনাথ কারক (Biswanath Karak) এবং আরামবাগের বিধায়ক মধুসূদন বাগ (Madhusudan Bag) টিকিট পাননি। এই দুই কেন্দ্রে যথাক্রমে প্রশান্ত দিগর (Prashanta Digar) এবং হেমন্ত বাগকে (Hemanta Bag) প্রার্থী করা হয়েছে। বর্তমান বিধায়কদের মধ্যে আবারও প্রার্থী করা হয়েছে আসানসোল দক্ষিণের অগ্নিমিত্রা পালকে (Agnimitra Paul)। বাঁকুড়ার শালতোড়া কেন্দ্র থেকে এবারও লড়ছেন চন্দনা বাউড়ি (Chandana Bauri)। উত্তরবঙ্গেও বেশ কয়েকটি পরিচিত মুখকে ধরে রেখেছে বিজেপি। জলপাইগুড়ির ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি কেন্দ্রে আবারও প্রার্থী করা হয়েছে শিখা চট্টোপাধ্যায়কে (Shikha Chatterjee) এবং কোচবিহারের তুফানগঞ্জে ফের প্রার্থী হয়েছেন মালতী রাভা রায় (Malati Rava Roy)। শিলিগুড়ি কেন্দ্র থেকেও পুরনো মুখই বজায় রেখেছে দল। বিধানসভায় বিজেপির মুখ্য সচেতক শঙ্কর ঘোষ (Shankar Ghosh) এবারও এই কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভাটপাড়া কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী হয়েছেন পবন সিংহ (Pawan Singh), তিনি প্রাক্তন সাংসদ অর্জুন সিংহ (Arjun Singh) -এর পুত্র।
উত্তরবঙ্গের একাধিক কেন্দ্রে বর্তমান বিধায়কদের উপরেই ভরসা রেখেছে বিজেপি। কোচবিহার উত্তর থেকে সুকুমার রায় (Sukumar Roy), কুমারগ্রাম থেকে মনোজ ওঁরাও (Manoj Oraon), কালচিনি থেকে বিশাল লামা (Bishal Lama), ফালাকাটা থেকে দীপক বর্মণ (Dipak Barman) এবং নাগরাকাটা থেকে পুনা ভেংরা (Puna Bhengra) এ বারও টিকিট পেয়েছেন। এছাড়া মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি থেকে আনন্দময় বর্মণ (Anandamay Barman), ফাঁসিদেওয়া থেকে দুর্গা মুর্মু (Durga Murmu), তপন থেকে বুধরাই টুডু (Budhrai Tudu), গঙ্গারামপুর থেকে সত্যেন্দ্রনাথ রায় (Satyendranath Roy), হবিবপুর থেকে জুয়েল মুর্মু (Jewel Murmu), গাজোল থেকে চিন্ময় দেববর্মণ (Chinmoy Debbarma) এবং দুর্গাপুর পশ্চিম থেকে লক্ষ্মণ ঘোড়ুই (Laxman Ghorui) এ বারও বিজেপির প্রার্থী হয়েছেন। দক্ষিণ দিনাজপুরের কুমারগঞ্জ কেন্দ্রে প্রার্থী করা হয়েছে বিজেপির রাজ্য ওবিসি মোর্চার সভাপতি শুভেন্দু সরকারকে (Subhendu Sarkar)। অন্যদিকে উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জ কেন্দ্রে প্রার্থী বদল করেছে দল। বর্তমান বিধায়ক সৌমেন রায় (Soumen Roy) -এর বদলে টিকিট দেওয়া হয়েছে উৎপল মহারাজকে (Utpal Maharaj)। বীরভূমের সিউড়ি কেন্দ্র থেকে দ্বিতীয় বারের জন্য বিজেপির প্রার্থী হচ্ছেন রাজ্য সহ-সভাপতি জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় (Jagannath Chattopadhyay)। মুর্শিদাবাদ জেলাতেও পুরনো জয়ী মুখগুলোকেই বজায় রেখেছে দল। বহরমপুর কেন্দ্রে আবারও প্রার্থী হয়েছেন সুব্রত মৈত্র (Subrata Maitra) এবং মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রে গৌরীশঙ্কর ঘোষ (Gourishankar Ghosh)। এছাড়া বেলডাঙা কেন্দ্রে প্রার্থী করা হয়েছে প্রাক্তন পুরপ্রধান ভরত ঝাওয়ারকে (Bharat Jhawar), তিনি এক সময় কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরীর (Adhir Ranjan Chowdhury) ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
নদীয়ার রানাঘাট অঞ্চলেও পুরনো বিধায়কদের উপরেই আস্থা রেখেছে বিজেপি। রানাঘাট উত্তর-পূর্ব এবং রানাঘাট দক্ষিণ কেন্দ্রে যথাক্রমে পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায় (Parthasarathi Chatterjee) এবং অসীম বিশ্বাস (Asim Biswas) এবারও টিকিট পেয়েছেন। ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী করা হয়েছে প্রাক্তন বিধায়ক দীপককুমার হালদারকে (Dipakkumar Haldar)। হুগলির পুরশুড়া এবং খানাকুল কেন্দ্রে যথাক্রমে বিমান ঘোষ (Biman Ghosh) এবং সুশান্ত ঘোষ (Sushanta Ghosh) আবারও বিজেপির প্রার্থী হিসেবে লড়াইয়ে নামছেন। পূর্ব বর্ধমানের জামালপুর কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী করা হয়েছে জাতীয় তফসিলি জাতি কমিশনের প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অরুণ হালদারকে (Arun Haldar)। রাজনৈতিক মহলের মতে, বিজেপির এই প্রথম দফার প্রার্থী তালিকা রাজ্যের নির্বাচনী লড়াইকে আরও উত্তপ্ত করে তুলবে। বিশেষ করে নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর কেন্দ্র ঘিরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শুভেন্দু অধিকারীর সম্ভাব্য মুখোমুখি লড়াই ইতিমধ্যেই রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Assembly Election Observer | পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে কড়া নজরদারি! প্রতিটি কেন্দ্রে থাকতে পারেন আলাদা পর্যবেক্ষক, বড় সিদ্ধান্তের পথে নির্বাচন কমিশন




