সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : দেশজুড়ে ধর্ষণ মামলায় নির্যাতিতার নাম-পরিচয় গোপন রাখার বিষয়টি নিয়ে আবারও কড়া অবস্থান নিল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India)। শীর্ষ আদালত পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, এই সংক্রান্ত পূর্ববর্তী নির্দেশ যেন কঠোরভাবে মানা হয় এবং তা নিশ্চিত করতে দেশের প্রতিটি হাই কোর্টের (High Court) রেজিস্ট্রার জেনারেলকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। সাম্প্রতিক এক রায়ে এই নির্দেশ পুনর্ব্যক্ত করে আদালত জানিয়ে দিল, আইনগত বিধান থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে তা সব ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়নি। বিচারপতি সঞ্জয় কারোল (Justice Sanjay Karol) এবং বিচারপতি এন কোটিশ্বর সিংহ (Justice N. Kotiswar Singh) -এর বেঞ্চে একটি নাবালিকা ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলার শুনানির সময় এই বিষয়টি সামনে আসে। মামলার রায় ঘোষণার পাশাপাশি বিচারপতিরা রায়ের শেষাংশে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন নির্যাতিতার পরিচয় গোপন রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। আদালত জানায়, ‘আইন অনুযায়ী বহু দিন ধরেই নির্যাতিতার নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার নিয়ম রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তা ধারাবাহিকভাবে মানা হয়নি।’
এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, ‘এই রায়ের প্রতিলিপি দেশের সমস্ত হাই কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে পাঠানো হোক, যাতে সংশ্লিষ্ট আদালতগুলি বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।’ এর ফলে রাজ্য স্তরের বিচারব্যবস্থায় এই নির্দেশ কার্যকর করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য,এই নির্দেশের পেছনে রয়েছে অতীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়, নিপুণ সাক্সেনা বনাম ভারত সরকার (Nipun Saxena vs Union of India) মামলা। সেই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট নির্যাতিতার পরিচয় গোপন রাখার বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশিকা দিয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, কোনওভাবেই নির্যাতিতার নাম, ঠিকানা, ছবি বা এমন কোনও তথ্য প্রকাশ করা যাবে না, যা থেকে তাঁর পরিচয় প্রকাশ পেতে পারে। বর্তমান রায়ে বিচারপতিরা সেই নির্দেশের প্রসঙ্গ টেনে আবারও জানিয়েছেন, ‘এই ধরনের মামলায় নির্যাতিতার পরিচয় গোপন রাখা শুধু আইনগত বাধ্যবাধকতা নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্বও।’ আদালতের মতে, এই নিয়ম লঙ্ঘিত হলে নির্যাতিতাকে দ্বিতীয়বার মানসিকভাবে আঘাতের মুখে পড়তে হয়।
রায়ে আরও বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে নিম্ন আদালত বা তদন্তকারী সংস্থার স্তরে এই নির্দেশ যথাযথভাবে মানা হয়নি। আদালতের পর্যবেক্ষণ, ‘নিম্ন আদালতগুলিতে এই বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে এবং অনেক সময় ঔদাসীন্যের কারণেও নিয়ম ভঙ্গ হচ্ছে।’ এর ফলে নির্যাতিতাদের উপর সামাজিক চাপ আরও বেড়ে যায়। এই প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, দেশের বিচারব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তর থেকে যখন এই ধরনের নির্দেশ জারি করা হয়, তখন তা নীচু স্তর পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে, হাই কোর্টগুলির মাধ্যমে জেলা ও অধস্তন আদালতগুলিতে এই নির্দেশ পৌঁছনো সহজ হবে।
আইন অনুযায়ী, ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে ভারতীয় দণ্ডবিধির ২২৮এ ধারায় নির্যাতিতার পরিচয় প্রকাশ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবুও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম বা আইনি নথিতে অসাবধানতাবশত এমন তথ্য প্রকাশ পেয়ে যায়, যা থেকে নির্যাতিতার পরিচয় আন্দাজ করা সম্ভব হয়। এই বিষয়টি নিয়েই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের মতে, এই ধরনের তথ্য ফাঁস হওয়া শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়, এটি নির্যাতিতার প্রতি অন্যায় আচরণ। তাই এই বিষয়ে কঠোর নজরদারি এবং নিয়ম মেনে চলার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক এই নির্দেশের ফলে দেশের বিচারব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছল, ধর্ষণ মামলায় নির্যাতিতার মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষা সর্বাগ্রে গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের এই অবস্থান ভবিষ্যতে এই ধরনের মামলায় আরও সতর্কতা আনতে সাহায্য করবে বলে মনে করা হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর এখন নজর থাকবে, হাই কোর্ট এবং নিম্ন আদালতগুলি কীভাবে এই নির্দেশ কার্যকর করে এবং বাস্তবে তার প্রতিফলন কতটা দেখা যায়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics2026: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস? (আজ তৃতীয় কিস্তি)




