সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে বিতর্ক নতুন মাত্রা পেল। সুপ্রিম কোর্টে (Supreme Court of India) এসআইআর (SIR বা Intensive Revision) মামলার শুনানিতে শীর্ষ আদালত জানাল, ‘পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি একটি চ্যালেঞ্জ, তবে আমরা নিশ্চিত করব যাতে ভোটারের অধিকার সুরক্ষিত থাকে।’ এই মন্তব্যের পর রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।।শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত (Surya Kant) এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী (Joymalya Bagchi)। তাঁদের বেঞ্চে এদিন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ উঠে আসে, যা সরাসরি ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে।
এর আগে ১০ মার্চ আদালত নির্দেশ দিয়েছিল, এসআইআর প্রক্রিয়ায় যুক্ত বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের সমস্ত লজিস্টিক সহায়তা দিতে হবে রাজ্য সরকার এবং Election Commission of India-কে। সেই নির্দেশের বাস্তবায়ন কতটা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে এদিন। সূত্রের খবর অনুযায়ী, এসআইআর শুরু হওয়ার আগে পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ। খসড়া তালিকায় বাদ পড়ে যায় প্রায় ৫৮ লক্ষের বেশি নাম। পরে ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রথম দফার চূড়ান্ত তালিকায় আরও প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ নাম বাদ যায়। সব মিলিয়ে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৩ লক্ষেরও বেশি। এই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়া নিয়েই মূল বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এদিকে নির্বাচন কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, প্রায় ২৯ লক্ষ ‘বিবেচনাধীন’ তথ্য নিষ্পত্তি করা হয়েছে। যদিও কতজনের নাম ফের তালিকায় যুক্ত হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট সংখ্যা সামনে আসেনি। আদালতে শুনানির সময়ও এই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আগে প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছিল, নিষ্পত্তির মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ নাম বাদ গিয়েছে। কিন্তু নতুন তালিকা প্রকাশের পর সেই হার কত দাঁড়াল, তা পরিষ্কার নয়।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) তালিকা প্রকাশের সময় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ‘মধ্যরাতে তালিকা প্রকাশ করার প্রয়োজন কী? তা হলে কি তালিকায় স্বচ্ছতা নেই?’ তাঁর অভিযোগ, বিচারকদের কাজ শেষ হওয়ার পরেও তালিকা প্রকাশে বিলম্ব হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। এই মামলায় রাজ্যের হয়ে সওয়াল করেন আইনজীবী তথা রাজ্যসভার সাংসদ মেনকা গুরুস্বামী (Menaka Guruswamy)। মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে আদালতে বক্তব্য রাখেন শ্যাম দিওয়ান। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের হয়ে উপস্থিত ছিলেন ডিএস নাইডু (DS Naidu)। শুনানিতে শ্যাম দিওয়ান জানান, ‘প্রায় ২৬ লক্ষের কাছাকাছি নিষ্পত্তির তালিকা প্রকাশ হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘৬ এপ্রিল মনোনয়নের শেষ দিন। ওই সময়সীমার মধ্যে সব কাজ শেষ করা কঠিন।’ এই যুক্তির ভিত্তিতে সময় বাড়ানোর আবেদনও জানানো হয়। প্রধান বিচারপতি এ বিষয়ে মন্তব্য করেন, ‘রাজনৈতিক দলের নেতারা বিচারকদের কাছে গিয়ে অনুরোধ করতে পারেন যাতে প্রার্থীদের তথ্য দ্রুত নিষ্পত্তি হয়।’ পাশাপাশি তিনি জানান, প্রশাসনিক দিক থেকে কলকাতা হাইকোর্ট -এর প্রধান বিচারপতি নিয়মিত আপডেট পাঠাচ্ছেন।
তালিকা প্রকাশ নিয়ে সমস্যার প্রসঙ্গে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, ‘পূর্ণ তালিকা প্রকাশ হবে, আমরা সেটা নিশ্চিত করব।’ যদিও আদালতে রাজ্যের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, অতিরিক্ত তালিকা পুরোপুরি ডাউনলোড করা যাচ্ছে না, যা স্বচ্ছতার প্রশ্ন তুলছে। নির্বাচন কমিশনের তরফে জানানো হয়, তারা প্রতিদিন অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ করতে প্রস্তুত এবং সেই প্রস্তাব হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে দেওয়া হয়েছে। তবে আদালত জানায়, পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া অন্য রাজ্যে এত বড় ধরনের সমস্যা সামনে আসেনি। যদিও অন্য রাজ্যগুলিতে নাম বাদ যাওয়ার সংখ্যা বেশি হলেও সেখানকার পরিস্থিতি ভিন্ন। শুনানির সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ উঠে আসে। প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘এসআইআরে কেবল নাম বাদ যায়নি, কোথাও ভোটার সংখ্যাও বেড়েছে।’ এর জবাবে রাজ্যের পক্ষ থেকে বলা হয়, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়েই ভোটারের সংখ্যাও বাড়া স্বাভাবিক।
এদিকে সময় বাড়ানোর আবেদন নিয়ে মেনকা গুরুস্বামী জানান, নিয়ম অনুযায়ী মনোনয়নের শেষ দিন পর্যন্ত নাম যুক্ত করা সম্ভব। তবে ফ্রিজ করার সময়সীমা বাড়ানোর জন্য আবেদন করা হবে। আদালত জানিয়েছে, এই আবেদন বিবেচনা করে দেখা হবে। বিচারপতি বাগচী শুনানির শেষে বলেন, ‘আমরা বিচারকদের উপর প্রচুর চাপ দিয়েছি, তাঁরা দিনরাত কাজ করছেন। এটা দোষারোপের সময় নয়।’ তিনি আরও জানান, কমিশনকে ধাপে ধাপে কাজ সম্পূর্ণ করতে বলা হবে এবং প্রয়োজন হলে ওয়েস্ট বেঙ্গল জুডিসিয়াল সার্ভিসের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে আদালত জানিয়ে দিয়েছে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কোনও বিঘ্ন যেন না ঘটে, সে বিষয়ে তারা নজর রাখবে। ভোটারদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে বলেই ইঙ্গিত মিলেছে। উল্লেখ্য, এসআইআর মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়েছে আগামী ১ এপ্রিল। সেই শুনানিতে এই জটিল প্রক্রিয়ার আরও অগ্রগতি এবং নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Supreme Court voter list case | ভোটার তালিকা মামলায় বড় নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের, সিদ্ধান্ত নেবেন হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল




