তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : দক্ষিণ কোরিয়া (South Korea) বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী দেশ হিসেবে পরিচিত। প্রযুক্তি, গাড়ি শিল্প, ইলেকট্রনিক্স, বিনোদন, সব ক্ষেত্রেই তারা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের জায়গা পাকাপোক্ত করেছে। কিন্তু এই দ্রুত উন্নয়নশীল দেশের ভিতরেই নীরবে দানা বাঁধছে এক গভীর সামাজিক সঙ্কট। সেই সঙ্কটের নাম জনসংখ্যা হ্রাস। প্রেম, বিয়ে এবং সন্তানধারণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে সরকার এখন প্রেম করতেও টাকা দিচ্ছে, বিয়ের জন্য দিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকার অনুদান। গত কয়েক বছরে দক্ষিণ কোরিয়ার জন্মহার এমন তলানিতে ঠেকেছে, যা উন্নত বিশ্বে নজিরবিহীন। আন্তর্জাতিক মহলের একাংশ আশঙ্কা করছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী শতাব্দীর শেষে দক্ষিণ কোরিয়ার জনসংখ্যা বর্তমানের এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসতে পারে।

এমনকী কেউ কেউ বলছেন, কোনও যুদ্ধ বা বহিঃশত্রুর আক্রমণ ছাড়াই দেশটি অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়তে পারে। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের বহু উন্নত দেশেই জন্মহার কমছে, তবে দক্ষিণ কোরিয়ার পরিস্থিতি সবচেয়ে চরম। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার মোট প্রজনন হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ০.৭২। অর্থাৎ, একজন মহিলা তাঁর প্রজনন বয়সে গড়ে একটিরও কম সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। ২০২২ সালে এই হার ছিল ০.৮১। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ৮ শতাংশ হারে জন্ম কমে যাওয়াকে বিশেষজ্ঞেরা ‘ভয়াবহ’ বলেই আখ্যা দিচ্ছেন। অথচ কোনও দেশের জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় প্রজনন হার হল ২.১। সেই মান থেকে দক্ষিণ কোরিয়া এখন বহু যোজন দূরে।
এই সঙ্কট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। কয়েক দশক আগেও দক্ষিণ কোরিয়ায় ছবিটা ছিল একেবারে উল্টো। ১৯৬০ সালে নারীদের গড়ে ছ’টি করে সন্তান ছিল। সত্তরের দশকের শুরুতেও গড় ছিল চার। তখন অর্থনীতির ভার সামলাতে সরকার জন্মনিয়ন্ত্রণে জোর দিয়েছিল। ধীরে ধীরে শিল্পায়ন, নগরায়ন ও শিক্ষার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে সন্তানসংখ্যা কমতে শুরু করে। ১৯৮২ সালের মধ্যে প্রজনন হার নেমে আসে ২.৪ -এ। কিন্তু তারপর আর থামেনি সেই পতন। ‘দ্য গার্ডিয়ান’ (The Guardian) সংবাদপত্র-এর একটি পুরনো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, ২০২০ সালেই প্রথমবারের মতো দক্ষিণ কোরিয়ার মোট জনসংখ্যা কমতে শুরু করে। তারপর থেকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ২০২৪ সালের একটি সমীক্ষা জানাচ্ছে, দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মহিলা আদৌ বিয়ে করতে চান না। আরও চমকপ্রদ তথ্য হল, বিবাহে অনিচ্ছুক মহিলাদের ৯৩ শতাংশই আশঙ্কা করেন যে বিয়ের পর তাঁদের কাঁধেই পড়বে গৃহস্থালি ও সন্তান পালনের মূল দায়িত্ব। এই অনীহার পিছনে রয়েছে বহু স্তরের কারণ। দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মসংস্কৃতি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। দীর্ঘ সময় অফিসে কাটানো, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং চাকরি হারানোর ভয় তরুণদের ব্যক্তিগত জীবনের জায়গা সঙ্কুচিত করে দিয়েছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে তরুণী মহিলারা পরিবার পরিকল্পনার তুলনায় নিজের পেশা ও স্বাধীনতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ২০২৩ সালের একটি সরকারি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, চাকুরিরতা মহিলাদের বড় অংশই মনে করেন, সন্তান লালন-পালন তাঁদের কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় বাধা।
এই সামাজিক চাপে যুক্ত হয়েছে লিঙ্গ বৈষম্য। সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ায় লিঙ্গ বিভাজন দিন দিন প্রকট হচ্ছে। পারিবারিক কাজ ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে বিরাট ফারাক রয়েছে। এর ফলেই অনেক তরুণীর মধ্যে বিয়ে ও মাতৃত্বের প্রতি অনীহা বাড়ছে। অন্য দিকে, কিছু অল্পবয়সী পুরুষের মধ্যে নারীবিরোধী মনোভাবও বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে সমাজবিদেরা মনে করছেন। এই দ্বন্দ্ব সম্পর্ক গড়ার প্রক্রিয়াকেই আরও জটিল করে তুলছে। এর প্রভাব পড়ছে গোটা সামাজিক কাঠামোয়। এক দিকে, দ্রুত বাড়ছে প্রবীণ নাগরিকের সংখ্যা। গড় আয়ু বেড়েছে উল্লেখযোগ্য ভাবে। অন্য দিকে, সন্তান না হওয়ায় কমছে পরিবার। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে গেলে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়বে, এই আশঙ্কাই এখন দক্ষিণ কোরিয়ার নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বেশি তাড়া করছে। এই সঙ্কট মোকাবিলায় সরকার যে পথে হাঁটছে, তা বিশ্বে নজিরবিহীন। যুবসমাজকে প্রেম, সম্পর্ক, বিয়ে এবং সন্তানধারণে উৎসাহিত করতে একগুচ্ছ আর্থিক প্রকল্প চালু করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার। এই প্রকল্পগুলির মূল লক্ষ্য, ব্যক্তিগত সম্পর্কের পথে যে আর্থিক ও সামাজিক বাধা রয়েছে, তা যতটা সম্ভব কমিয়ে দেওয়া। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনও পুরুষ বা নারী যদি বিপরীত লিঙ্গের কারও সঙ্গে ডেটে যেতে চান, তবে সেই ডেটের সম্পূর্ণ খরচ বহন করবে সরকার। বাইরে ঘুরতে যাওয়া, রেস্তরাঁয় খাওয়া, সিনেমা দেখা বা একান্তে সময় কাটানো, সব কিছুর জন্য বরাদ্দ রয়েছে সরকারি অর্থ। একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, শুধুমাত্র ডেটের জন্য যুগল পিছু প্রায় ৩৫০ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় আনুমানিক ৩১ হাজার টাকা পর্যন্ত সাহায্য করা হচ্ছে। এখানেই শেষ নয়। যদি সেই সম্পর্কের অগ্রগতির পথে যুগলের বাবা-মায়েরা পরস্পরের সঙ্গে দেখা করেন, তাতেও সরকার খরচ বহন করবে। অর্থাৎ, সম্পর্ককে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিটি ধাপেই রয়েছে রাষ্ট্রের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা।
সবচেয়ে বড় চমক বিয়ের ক্ষেত্রে। দক্ষিণ কোরিয়ায় কোনও যুগল যদি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তা হলে সরকার তাঁদের ২৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত। এই অর্থ দিয়ে বাড়িভাড়া, সংসার শুরু বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সাহায্য নিতে পারেন নবদম্পতিরা।সন্তানধারণের ক্ষেত্রেও রয়েছে আলাদা সুবিধা। সরকারের যুক্তি, মূল্যবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় এতটাই বেড়েছে যে বহু দম্পতি সন্তান নেওয়ার সাহস পাচ্ছেন না। তাই আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে সেই ভয় কাটাতেই এই সিদ্ধান্ত। সন্তান জন্মের পর ভাতা, চিকিৎসা সহায়তা এবং শিশু পরিচর্যার সুবিধাও ধাপে ধাপে বাড়ানো হচ্ছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, শুধু টাকা দিয়ে কি সামাজিক মানসিকতা বদলানো সম্ভব? সমাজবিদদের একাংশ মনে করছেন, এই উদ্যোগ স্বল্পমেয়াদে কিছুটা ফল দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্কৃতি, লিঙ্গসমতা এবং পরিবার কাঠামোর আমূল পরিবর্তন না হলে সমস্যার মূল সমাধান হবে না। তবুও, দক্ষিণ কোরিয়ার এই পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে নজর কেড়েছে। প্রসঙ্গত, অবাক হলেও সত্যি, প্রেম করলে সরকারি অনুদান, বিয়ে করলে লক্ষ লক্ষ টাকা, এই ধারণা এখনও অনেক দেশের কাছে অবিশ্বাস্য শোনালেও, দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে এটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। জনসংখ্যা সঙ্কটের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে দেশটি যে পথে হাঁটছে, তা ভবিষ্যতে অন্য উন্নত দেশগুলির কাছেও দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : China fastest maglev train | মাত্র ২ সেকেন্ডে ৭০০ কিমি গতি, ভবিষ্যতের যাতায়াতে নতুন দিগন্ত খুলে দিল চীনের ম্যাগলেভ ট্রেন




